জহিরুল ইসরাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন উন্নয়ন বঞ্চিত রায়পুরবাসী। সোমবার সংসদ সচিবালয় পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে তারা এই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। মানব ও অর্থপাচারের দায়ে কুয়েতের আদালতের রায়ে দন্ডিত হওয়ায় সংসদ সদস্য পদ হারান পাপুল। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি প্রথম এমপি যিনি বিদেশে আটক ও ফৌজদারি অপরাধে দন্ডিত হওয়ার পর পদ হারালেন।

স্বতন্ত্র এ এমপির এমন সাজাকে সরকারের সংশ্লিষ্টরা যেমন বলছেন লজ্জাজনক, তেমনি পাপুলের নির্বাচনী এলাকা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের বাসিন্দারাও বিষয়টি নিয়ে বিব্রত এবং লজ্জিত। যদিও তার কর্মকান্ডে আগে থেকেই বিক্ষুব্ধ ছিলেন এলাকাবাসী। কারণ, পাপুল তাদের অনেক আশ্বাস দিলেও কোনোটাই পূরণ করেননি।

এদিকে বিদেশে অপরাধের কারণে পাপুলের সাজা ও পরবর্তীতে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হলেও এখনো ধরা ছোয়ার বাহিরে রয়ে গেছেন পাপুলের পৃষ্ঠপোষকরা। টাকার বিনিময় যারা রাজনীতিতে পাপুলের অবস্থান তৈরী করে দিয়েছেন পাপুলের সাথে তাদেরও গ্রেফতারের দাবি করেছেন স্থানীয়রা। বিদেশের মাটিতে অপরাধের কারণে কারাদন্ডিত হয়ে দেশ ও জাতির ভাবমূর্তি বিনষ্ট করায় পাপুলের সংসদ সদস্য পদ যাওয়ায় এবার তার সহায়তাকারীদের বিচার চান উন্নয়নবঞ্চিত এলাকাবাসী।
জানা যায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা পাপুল ২০১৬ সালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে আসেন। ওই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে সংবাদকর্মীদের নিয়ে মতবিনিমিয় করেন। ‘জন্মের পর তখনই প্রথম এসেছেন’ জানিয়ে রায়পুরকে জেলায় রূপান্তর করাসহ একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেন পাপুল। এরপর রায়পুর পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কাজী জামশেদ কবির বাক্কি বিল্লাহর হাত ধরে তিনি কিছু দান-খয়রাত করেন। অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে ‘দানবীর’ ও ‘মানবতার সেবক’ হিসেবে প্রচার চালান তিনি। অল্প সময়ের মধ্যে ‘টাকার সাগর’ হিসেবে রায়পুরে পরিচিতি পেয়েছিলেন পাপুল। তার ভাই বিএনপি নেতা কাজী মঞ্জুরুল আলম। কুয়েতে গিয়েও রাজনীতি ছাড়েননি তিনি। তার হাত ধরে ১৯৯২ সালে কুয়েত যান পাপুল। চতুরতা দিয়ে সেখানে তিনি ‘টাকার সাগর’ বনে যান।
২০১৭ সালের ১৪ মার্চ লক্ষ্মীপুর জেলা স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ সভাপতির জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন অভিযোগ ওঠে, ৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে নেতাদের মন জয় করে জনসভা মঞ্চে উঠেছেন পাপুল। যদিও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা এম আলাউদ্দিন মঞ্চে স্থান পাননি। তাকে রোদের মধ্যে সামনের মাঠে বসে থাকতে দেখা গেছে। অবশ্য শুরু থেকেই এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নের দাবি ছিল, জনসভার খরচের জন্য পাপুল ২০ লাখ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। শহিদ ইসলাম পাপুল টাকার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ২-৩ জনের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদ নেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রায়পুরে আওয়ামী লীগের একাধিক সভায় তাকে প্রধান অতিথিও করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দলের ত্যাগী একাংশের নেতাকর্মীরা।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোটগত কারণে জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি মোহাম্মদ নোমানকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ছেয়ে ব্যর্থ হয়ে তখন শহীদ ইসলাম পাপুল স্বতন্ত্র (আপেল) প্রার্থী হন। নির্বাচনের এক সপ্তাহে আগে মোহাম্মদ নোমান নাটকীয়ভাবে গা ঢাকা দেন। তখন অভিযোগ ওঠে, ১২ কোটি টাকার বিনিময়ে নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়েছেন পাপুল। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে রায়পুর তাজমহল সিনেমা হলের সামনে দলের জরুরি সভায় আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নোমান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
তার এই বক্তব্য নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সভায় নেতাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা ও হাতাহাতিও হয়েছিল। এরপর এমপি নির্বাচিত হন পাপুল। পরে নিজের স্ত্রী সেলিমা ইসলামের জন্যও বাগিয়ে নেন কুমিল্লার সংরক্ষিত আসনের এমপির পদ। সেলিমা ইসলাম কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বাসিন্দা। রাজনীতির বাইরে থাকা ‘ভাগ্যবান’ এ দম্পতি টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্র ও জেলার দলীয় কিছু সংখ্যক নেতাকর্মীকে নিজেদের পক্ষে ভাগিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় পাপুলকে ‘নব্য-হাইব্রিড’ আখ্যা দিয়ে একাধিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিমাসেই এলাকায় আসতেন শহীদ ইসলাম পাপুল। মাঝে মাঝে দুই-এক রাত তার রায়পুর পৌরসভার কেরোয়ার কাজী বাড়িতেই অবস্থান করতেন। প্রশাসনের সভা ও সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে সকাল-দুপুর হেলিকপ্টারে এসে কাজ সেরে আবার বিকেলেই ঢাকায় ফিরে যেতেন তিনি। পাপুল হেলিকপ্টারে এসে কয়েকটি স্থানে কম্বল বিতরণও করেছিলেন।

২০২০ সালের শুরুতে কুয়েতে মানবপাচারসহ পাপুলের দুর্নীতির বিষয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পায়। তখন বাংলাদেশে ‘শ্রমিক থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক এমপি পাপুল’সহ বিভিন্ন শিরোনামে ছবিসহ একটি তথ্যবহুল খবর প্রকাশ হয়।

পরে অর্থ ও মানবপাচারের অভিযোগে ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে গ্রেফতার হন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল। গ্রেফতার হওয়ার পর পাপুলের কতিপয় অনুসারী তাকে নির্দোষ প্রমাণে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সপ্তাহব্যাপী মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা ও সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। যদিও মানবপাচার ও ভিসা জালিয়াতির অভিযোগের মামলায় গত ২৮ জানুয়ারি পাপুলের চার বছর কারাদন্ড এবং ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার (প্রায় ৫৩ কোটি ২১ লাখ টাকা) জরিমানা করা হয়। বর্তমানে তিনি কুয়েতের কারাগারেই আছেন। গ্রেফতার হওয়ার আগে পাপুল মারাফী কুয়েতিয়া গ্রুপ অব কোম্পানিজের (কুয়েত, ওমান ও জর্ডান) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মামলার অভিযোগ অনুসারে, কুয়েতে প্রতারণার মাধ্যমে ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিকের কাছ থেকে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে ‘রেসিডেন্সি পারমিট’র জন্য দুই হাজার কুয়েতি দিনার বা সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি টাকা নিতেন পাপুল। বাংলাদেশেও কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল, তার স্ত্রীর, মেয়ে ও শ্যালিকার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের) আসনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা পাপুলকান্ডে হতাশ। তাদের মতে, নির্বাচনের আগে পাপুল উন্নয়নের অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারেননি। পাপুল সভা-সমাবেশে প্রকাশ্যে হাজারো নেতাকর্মীর সামনে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, আমি টাকার সাগর। সাগর থেকে যেমন বালতি কেটে পানি নিলে শেষ হয় না, তেমনি আমার কাছ থেকে আপনারা টাকা নিলেও তা শেষ হবে না। সরকার যদি এ আসনের উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়, তাহলে আমিও ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আরো ১০০ কোটি টাকা দিয়ে কাজ করাবো। বাস্তবে তার এসব কথার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয় আনোয়ার, কাদের, হেলালসহ কয়েক জন বলেন, পাপুল আমাদেকে উন্নয়নের অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এসব ছিল তার নাটক। এমপি পদ ব্যবহার করে অপকর্ম করার জন্য তিনি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। লক্ষ্মীপুর তথা বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে ছোট করেছেন তিনি। এ ক্ষতি অপূরণীয়।

কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শামছুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, পাপুল হঠাৎ লক্ষ্মীপুর এসে টাকার বিনিময়ে শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতার ওপর ভর করেছিলেন। পরে নাটকীয়ভাবে স্বামী-স্ত্রী এমপি হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যও নন। তার কারণে আর্ন্তজাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুর্ণ হয়েছে। যারা পাপুলদের অপকর্মে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরও বিচার হওয়া প্রয়োজন।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এম আলাউদ্দিন বলেন, অবৈধ টাকার বিনিময়ে আমাদের কিছু সুবিধাবাদী নেতা পাপুলকে এমপি বানিয়েছেন। অপরাধ করে শেষ পর্যন্ত কেউ পার পায় না। টাকার মালিকরা হঠাৎ এসে নেতা এবং এমপি বনে যাচ্ছে, এর চেয়ে আমাদের লজ্জার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতারা এসব পাপুলদের আবিষ্কার করেছেন। যারা তাকে সহযোগিতা করেছিল, জনসম্মুখে তাদের মুখোশ উন্মোচন হওয়া উচিত।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here