নূর কামরুন নাহারের গল্প ‘এ পেয়ার অফ ইটালিয়ান সু’

নূর কামরুন নাহার

নূর কামরুন নাহার :: মেঝের ওপর সব সারি করে রাখা। দুটো চৌকোণা প্যাকেট খাকি কাগজে বাঁধা, একটা লম্বা রোল করা প্যাকেট, দুটো ছোট বক্স, কিছু সুভ্যেনির, একটা চারকোণা ক্রিস্টাল তার ভেতর নগর, তিনটে কলমের বাক্স, দুটো সোনালী ফিতায় বাঁধা। কাগজের মোটা বোর্ডের দুটো লম্বা প্যাকেট। একটা সুন্দর স্বচ্ছ প্যাকেট, ভেতরে ভায়োলেট কালালের টাই। দুটো ছোট কাপড়ের সুদৃশ্য বাক্স, বোতাম আটা। শৌখিন বোতামের বক্স, দুটো লাইটার একটা মেরুন, একটা ইনডিগো, একটা সোনালি ফ্রেমের কাচি।

হাতিলের ওয়াডড্রব। ফোর ড্রয়ার। কমলা রং শাড়ি প্রয়োজন। আউটিং এর রং। পরশু যাবে সবাই শালবনের নির্জনে। শহর বিষিয়ে উঠেছে, যেমন নিরুর কাছে তেমনি বোধহয় সবার কাছেই। এখানে নিশ্বাস নেয়া যাচ্ছে না। অদৃশ্য শত্রু ওত পেতে পেতে আছে প্রতি নিশ্বাসে। মুখোশ পরে আছে সব মানুষ। মুখোশের ভেতরেও প্রবেশ করছে শত্রু। এখানে এখন দরজা খোলাও নিষেধ। যার যার দরজা এঁটে সবাই ঘরে (গুহায়) সেটে আছে। কিন্তু কত আর! তাই দল বেঁধে সব বনবিলাসী। গাছ কেটে, বন ধ্বংস করে এখন আবার সবাই গাছ প্রেমিক, প্রকৃতি প্রেমিক! পালের সাথে নিরুও যাচ্ছে। তবে বনের নেশা, গাছের নেশায় নয়।

স্থিরতায় আশায়। তার কোনো কিছু স্থির নেই। সব শূন্য। বিরান ভুমি। কিছু নেই। কোথাও কিছু নেই। এই যে কমলা রং কোথায় আছে স্থির জানে না সে। কোথায় গেলে স্থির হবে তাও জানে না। সে শুধু চরকির মতো ঘুরছে। আরও আরও ঘুরতে চায়। ঘুরতে গেলে কিছুক্ষণ ভালো লাগা। তারপর আবার মন অশান্ত, অস্থির। ফিরে আসা, আবার খাঁচা। আবার অস্থিরতা।
কমলা রং কোথায়? কোথায় রেখেছে ? হ্যাঁ হাতিলের এই ফোরড্রয়ার ওয়াডড্রবেই। আবার হাত লাগায় ।

একটার পর একটা বের হচ্ছে, মেঝেতে সারি বেঁধে রাখা হচ্ছে। এইসব কিছু জামানের। সে খুব শৌখিন। ভালো বড় চাকরি। বহু বার বিদেশ ভ্রমণ। যতবার যাওয়া। ততবার দামি ঘড়ি, কলম আর পারফিউমের বান্ডিল। এমন আরো বহু সারি করে গুছিয়ে রাখা আছে আলমারিতে। রেয়ার ঘড়ি, কলম পেলে কেমন চকচকে হয়ে যায় চোখ। যেমন শৌখিন তেমন ধরে রাখা। হাজারো জিনিস গুছিয়ে গুঁজে রাখা, পুরনো জিনিসও চকচকে করে রাখা। নীরুর কাছে এসবের অনেক কিছুই হাস্যকর। মাঝে মাঝে না বলে কিছু জিনিস ফেলেও দেয়। ঘরের ভেতর কত আর গুদাম করা!

নিচের ড্রয়ারে কিছুর উঁকিঝুকি। হ্যাঁ ঐ তো কমলা। টেনে বের করে। শৌখিন কমলা শপিং ব্যাগে নিপাট করে কিছু মুড়িয়ে রাখা। সবকিছুর খুব যত্ন জানে জামান। বের করে চোখের সামনে রাখে। উল্টে পাল্টে দেখে। সুন্দর বাদামী রং, পিওর চামড়ার, নতুন গন্ধ। চামড়া আর শপিংব্যাগের হালকা সুগন্ধ। জুতো জোড়া দেখে নীরু। সোনালী অক্ষরে লেখা ‘মেড ইন ইটালি’।

একবার ইটালি গিয়েছিলো জামান। সেখান থেকেই এনেছিলো একজোড়া ইটালিয়ান সু। ওর বেশ পছন্দের। পুরনো হলেও ফেলে না। বহুদিন পরে না, মাঝে মাঝেই কালি করে, সাজিয়ে রাখে। কয়েক বছর আগে ঘর গুছাতে গিয়ে নীরু ফেলে দেয়। পুরনো জুতা। শুধু শুধু! বেশ অনেকদিন পর খোঁজ পড়ে। বেশ কয়েকদিন খুব মনখারাপ, গালফুলানো। অনুতাপ বুকের ভেতর খামচে থাকে নীরুর, চোখ খুঁজে চলে ইটালিয়ান সু।

গতবছর সুযোগ হলো দুজনের একসাথে মালয়েশিয়া বেড়ানোর। কেনাকাটায় হঠাৎ চোখে পড়লো, মাত্র এক জোড়াই। ইটালিয়ান সু। একবারে সঠিক মাপের, বেশ এক্সসপেনসিভ। জামান বাঁধা দিয়েছিলো। নীরু শুনেনি। অনুতাপটা গলিয়ে নিয়েছিলো ডলারে।
সু, শখের বাডাবাড়ি, কমলা রং প্যাকেট। সব যথাস্থানে। শুধু হঠাৎ উঠা ঝড়, একটা জীবাণু নিয়ে গেলো জামানকে। গত একবছরে জুতো জোড়া একদিনও পড়া হয়নি জামানের। খুব শখের, যত্নের ইটালিয়ান সু।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘সাইমন জাকারিয়া নিরপেক্ষ গবেষক নন’

ডেস্ক রিপোর্ট ::  সরলপুর ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটি নিয়ে সম্প্রতি বাংলা একাডেমির ...