নারীর মুক্তি বিনা নরের মুক্তি সম্ভব?

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা :: ইংরেজী ‘ম্যান’ শব্দের বাংলা অনুবাদে ‘নর’ বলতে যা বোঝায় ‘পুরুষ’ বলতে ঠিক তা নয়। ক্রমে ক্রমে ‘পুরুষ’ হয়ে উঠতে হয়। ঠিক যেভাবে ক্রমে ক্রমে নারী হয়ে উঠে কমনীয় রমনীয় ‘মেয়ে মানুষ’ অথবা ‘রমনী’।

‘পৌরুষ’, ‘ব্যাটামি’, ‘মর্দামি’, ‘কর্তৃত্বপরায়নতা’, ‘নিয়ন্ত্রনবাদীতা’, ‘ঔদ্ধত্ব’– ইত্যাদির মিশ্রনে সংস্কৃতিভেদে ‘পুরুষ’-এর পুরুষ চরিত্র নির্মিত হয়।

এই সমস্ত পুরুষবাচক বৈশিষ্টাবলী যে পুরুষের মধ্যে তুলনামূলক কম বা অনুপস্থিত সেইসব পুরুষ-এর ‘হীনতা’ বোঝাতেই তৈরি হয়েছে ‘কাপুরুষ’, ‘নপংসুক’ শব্দাবলী।

পুরুষ যতদিন তার হাত থেকে না ফেলবে নারীকে নিয়ন্ত্রনের চাবুক ততদিন তার কাঁধ থেকে নামবে না সংসারের ভার টানার জোয়াল।

পুরুষ যতদিন নারীর পায়ে পড়িয়ে রাখবে বেড়ি, ততদিন সেও থাকবে একই জিজ্ঞিরে বাঁধা।

নারীর মুক্তি বিনে নরের মুক্তি নাই। এই সত্য যত দ্রুত ‘পুরুষ’ আদমীরা অনুধাবন করবে ততই দ্রুত সুগম হবে পুরুষের স্বাধীনতা।

আচার্য শুক্রদেবের কথা মনে আছে তো? বৃহস্পতির পুত্র কচকে শুক্র শিখিয়েছেন মৃত সঞ্জীবনী মন্ত্র। কিন্তু নিজের কন্যা দেবযানীকে শেখাননি। শেখাবেনই বা কেন! শেখানোর কথা তো পিতা শুক্রের কল্পনাতেও আসেনি।

সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনী আজও লোকে বলে। কিন্তু সাবিত্রীর গল্প বলতে গিয়ে লোকে শুধু ‘পতিঅন্তপ্রাণ’ এক স্ত্রী’র গল্পই স্মরণে আনে শুধু।

সাবিত্রীর এই চিত্রায়ন বড়ই খণ্ডিত। শুধু খণ্ডিতই নয়, খুব উল্টো চিত্রও বটে।

স্বাধীনচেতা সাবিত্রী ছিলেন তেজস্বী, লড়াকু, বিদ্বান ও সুপণ্ডিত। তাঁর পাণ্ডিত্য ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বের সামনে সেকালের রাজ’পুরুষেরা’ দাঁড়াতে সাহস করেনি।

‘ঘরের সুন্দরী বঁধূ’ হিসেবে নারীর যে চরিত্র তার সাথে সাবিত্রী ছিল শতভাগ উল্টো। আশৈশব পিতার ‘আস্কারা’ বা ভালোবাসা এবং অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে বড় হয়েছিলেন সাবিত্রী। কন্যা বিবাহ উপযুক্ত হয়েছে। অথচ কোনো রাজপুত্র রাজকুমারীকে পাবার বাসনা ব্যাক্ত করছে না। বিষয়টি সাবিত্রীর পিতা অশ্বপতিকে ভাবিয়েছিল। অবশেষে তিনিই একদিন সাবিত্রীকে পাঠান পাত্র সন্ধানের অভিযানে।

পাত্র সন্ধানে গিয়ে বনের মধ্যে সাবিত্রীর সাথে সত্যবানের দেখা। সেই দর্শনের পর সত্যবানকেই মনে-মনে পতি রূপে গ্রহণ করেন তিনি। এমনকি আর মাত্র এক বছর সত্যবানের আয়ু আছে জেনেও তাকেই করেছে মাল্যদান। এর পরের গল্প আপনারা জানেন। যমের কাছ থেকে নিজের প্রেম দিয়ে কী রূপে সাবিত্রী সত্যবানকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

এই ভূভারতে আজও স্বাধীনচেতা পণ্ডিত সাবিত্রীদের জীবন মহাভারতের বিধৃত সাবিত্রীদের চেয়ে খুব আলাদা নয়। তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের সঙ্গে না পারলে তাদেরকে পরিত্যাগ করা বা এড়িয়ে চলাই এই ভূভারতের অব্যার্থ নীতি। এমনকি খনার মতন জিভ কেটে নিতেও দ্বিধা করে না পৌরুষের তীব্র অহং-এ তাড়িত ভূ-ভারতের ‘পুরুষ’।

একবিংশ শতকের পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি পাল্টে গেছে। মানুষ চাঁদে নেমেছে। মানুষ মঙ্গলে যাবার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। অথচ এই একবিংশ শতকেও বাংলাদেশে নারীর জন্য রাখা হয়েছে সতী-সাবিত্রী-সীতার মানদণ্ড।

পৃথিবীতে পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন এসেছে পৃথিবীর উন্নত দেশের নারী-পুরুষের মনোজগতেও। এই বাংলা তথা ভূভারতের ‘পুরুষ’প্রজাতির হার্ডওয়্যার তথা তাদের জীবন-যাপন-পোশাক-আশাক-আর্টিফ্যাক্টস ব্যাবহারের ধরণ-ধারণেও আমূল বদল এসেছে। কিন্তু নারীপ্রশ্নে ভূভারতের পুরুষগোত্রের ‘সফটওয়্যার’ আজও আপডেট করা হয় নাই। নারী প্রশ্নে তাদের মগজ আজও পাঁচ হাজার বছরের পুরনো সফটওয়্যারেই চলছে।

কে না জানে! যত ভালো ল্যাপটপই আপনার থাকুক, সফটওয়্যার আপডেট না দিলে বারবার হ্যাং করবে, কাজে বিড়ম্বনা হবে। বাংলা তথা ভূভারতে অধিকার প্রশ্নে নারীরা উচ্চকিত থেকে উচ্চকিততর হচ্ছেন। আরো হবেন। হওয়াটাই নিয়তি। কারণ নারী প্রশ্নে পুরুষের মনোজত আপডেট করা হয় নাই। তাই, বাধা দিতে গেলেই বাঁধছে লড়াই।

এখনই সময়। বাংলা তথা ভূভারতের পুরুষের মগজের সফটওয়্যার আপডেট দেবার উদ্যোগ নিন। নারীর স্বাধীনতা মাপার বাটখারা হাতে নিয়ে ওজন মাপতে মাপতে ‘পুরুষ’ নিজেই যে রচনা করছে নিজের বন্দীত্বের গোলকধাঁধা এই সত্য তাকে বুঝতে সহায়তা করুন।

আন্তর্জাতিক নর দিবসে পিতা-ভ্রাতা-স্বামী-বন্ধু-নারীর শরীর থেকে নরের শরীর বেছে নেয়া নরদের শুভেচ্ছা জানাই।

পুরুষের হাত থেকে নারী মুক্তি পাক। পৌরুষের মায়া-শৃঙ্খল হতে মুক্তি পাক নর। নর ও নারীর প্রেমে পৃথিবীতে বসন্ত আসুক। পরস্পরকে পাশে নিয়ে জীবনের জ্বরা ও জীর্ণতা মোকাবেলা করুক নর ও নারী।

 

 

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপকমিডিয়া এন্ড ম্যাস কমিউনিকেশান বিভাগআমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিবাংলাদেশ

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘সাইমন জাকারিয়া নিরপেক্ষ গবেষক নন’

ডেস্ক রিপোর্ট ::  সরলপুর ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটি নিয়ে সম্প্রতি বাংলা একাডেমির ...