ব্রেকিং নিউজ

না’গঞ্জে হোসিয়ারি শিল্প হুমকিতে: বেকার হচ্ছে কয়েক হাজার শ্রমিক

durএম আর কামাল, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : টানা অবরোধ ও হরতালে হুমকির মুখে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের কয়েক হাজার হোসিয়ারি প্রতিষ্ঠান। এতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক মালিক-শ্রমিক চরম উদ্বিগ্ন। দৈনিক প্রায় আড়াই কোটি টাকার বিক্রি নেমে এসেছে মাত্র কয়েক লাখ টাকায়। বিক্রি নেই বললেই চলে। পুঁজি ভেঙে খাচ্ছেন মালিকদের অনেকেই। কারখানা ও ব্যবসা ধরে রাখতে ধার-দেনা করে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু এটা কতদিন? এক সময় দেয়া সম্ভব হবে না। যদি না পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারী ও মালিকরা এখন অলস সময় পার করছেন।

হোসিয়ারী মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছে, সারাদিন দোকানে বসে গল্প-গুজব করছেন আবার কেউ ক্রিকেট খেলা দেখে সময় পার করছেন। তবে বড় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ছোট গুলোর অবস্থা আরও করুণ। তাদের ৯৫ ভাগ মালিক বিভিন্ন এনজিও’র কাছ থেকে চড়া সুদে এসএমি লোন নিয়ে ব্যবসা করছেন। গত দুই মাস ধরে ব্যবসায় ধস নামলেও সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের ত্রাহি অবস্থা।

অন্যের কাছ থেকে নতুন করে ধার এনে কিস্তি পরিশোধ করছেন মালিকরা। কারণ লোন দেয়া প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য হচ্ছে, বিক্রি হলো কি হলো না তা দেখে লাভ নেই, কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। ফলে নিরুপায় মালিকরা। তাছাড়া হরতাল-অবরোধে ভয়াবহ চিত্রের সঙ্গে ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘাঁ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রেড লাইসেন্সের বাড়তি ফি নিয়ে।

আনুষঙ্গিত খরচ মিটিয়ে নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়ন করতে মালিকদের খরচ হতো ১০০০ টাকা। এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩ হাজার ৭শ’ টাকা। যা স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ২রা মার্চ থেকে কার্যকরী হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। এতে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে হোসিয়ারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

হরতাল-অবরোধের কারণে এমনিতেই এই শিল্প ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তার উপর সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমরা হতাশ হয়েছি। আমরা মনে করি বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর রুটি-রুজির এই প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার্থে সরকার সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে আমরা বেঁচে যাবো। না হয় এক সময় এই হোসিয়ারি ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে মালিকদের। এতে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ।

বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সূত্র মতে, অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত ও অ্যাসোসিয়েশনের বাইরে প্রায় ৬ হাজার হোসিয়ারি শিল্প রয়েছে। এসব হোসিয়ারির সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় লক্ষাধিক মালিক ও শ্রমিক। প্রতিটি হোসিয়ারিতে ৩ থেকে সর্বোচ্চ শতাধিক শ্রমিক কাজ করে। নারায়ণগঞ্জ শহরের উকিলপাড়া, বিবি রোড, নয়ামাটি, করিম মার্কেট, রেলিবাগান, দেওভোগ রেলওয়ে মার্কেট, টানবাজার, কাশিপুর গলাচিপা, দেওভাগ, বন্দর এলাকায় হোসিয়ারি শিল্পের অবস্থান।

উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে, বেবি আইটেম, পলো শার্ট, সেন্টু গেঞ্জি, টিশাট, আন্ডার ওয়্যার, শীতের কাপড়, কার্ডিগানসহ বিভিন্ন পণ্য। মোট কথা লোকাল গার্মেন্ট। দেশের প্রায় প্রত্যেকটি জেলায় এই পণ্যের বাজার রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে মালামাল নিয়ে যান। দৈনিক আড়াই থেকে ৩ কোটি টাকা বিক্রি হয় হোসিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কারখানার শ্রমিকরা দুই ভাবে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। প্রডাকশনের শ্রমিকরা সাপ্তাহিক আর অন্যরা মাসিক বেতনে।

নারায়ণগঞ্জ শহরের উকিলপাড়া, নয়ামাটি, বিবি রোড এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্ন হোসিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবরোধ-হরতালে এই ব্যবসায় ক্ষতির চিত্র। উকিলপাড়াস্থ হাজী কলিম উল্লাহ মার্কেটে প্রায় দেড় শতাধিক হোসিয়ারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই মার্কেটের মীম টেক্সটাইলের মালিক মো. পনির হোসেন জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় তার উৎপাদিত হোসিয়ারি মালামাল যায়।

কিন্তু হরতাল-অবরোধের কারনে দূরের ক্রেতা না আসায় বিক্রি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দৈনিক বিক্রি হতো প্রায় ৭০ হাজার টাকা। আর এখন কোন কোন দিন বোনিও হয় না। দুই মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকার বিক্রি কমেছে। বসে বসে জমা টাকা খাচ্ছি। প্রতিষ্ঠানের ২০জন শ্রমিকের বেতন-ভাতা মিটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অপর ব্যবসায়ী আল আমিন হোসিয়ারির মালিক আল আমিন জানান, বিক্রি তো নেই। উত্তাঞ্চলের একজন পার্টিও আসেনি গত দুই মাসে। পূর্বাঞ্চলেও একই অবস্থা। ফলে এক সপ্তাহেও একদিন বোনি হয় না। অথচ প্রতিদিন ২০/৩০ হাজার টাকা বিক্রি হতো। তার চেয়ে বড় সমস্যা লোন পরিশোধ। এনজিওদের কাছ থেকে চড়া সুদে এসএমি লোন নিয়ে ব্যবসায় পুঁজি খাটাচ্ছি। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ বিক্রি নেই। অন্যস্থান থেকে সুদে টাকা এনে লোনের কিস্তি দিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে পথে বসতে হবে।

কমফোর্ট হোসিয়ারির মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, এই মার্কেটের অধিকাংশ হোসিয়ারির মালিক-শ্রমিক এখন অলস সময় পার করছেন। টিভিতে ক্রিকেট খেলা আর গল্প-গুজব করে দিন যাচ্ছে। সকালে খোলা থাকলেও দুপুরের পর অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। অথচ অবরোধের আগে দম ফালানোর সময় পেতো না মালিক-শ্রমিকরা। নয়ামাটি এলাকার নিউ হোসিয়ারি টেক্সটাইলের মালিক মামুন বলেন, যেখানে দৈনিক ৬০/৭০ হাজার টাকা বিক্রি হতো সেখানে আজ (বুধবার) দুপুর ১টা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা।

২২ শ্রমিকের মধ্যে ৪ জন ছাঁটাই করে দিয়েছি। প্রতিদিনই লোকসান গুনছি। শীতের বাজার পুরোপুরি ধস ছিল। এখন শুরু হয়েছে গরম। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার তো কোন লক্ষণ দেখছি না।

নয়ামাটি এলাকার আনিয়া হোসিয়ারির মালিক আতাউর রহমান জানান, ১৬ জন কর্মচারী। বিক্রি নাই। তাই উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। শীতের মাল তৈরি করেছি কিন্তু বিক্রি হয়নি। এখন শ্রমিকদের ৫০০ এক হাজার টাকা ধার দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে কর্মচারী বিদায় করে দিতে হবে। মাসিক বিক্রি ছিল ১৫-থেকে ২০ লাখ টাকা। এখন শূন্যে নেমে এসেছে। একই এলাকার আলপনা হোসিয়ারির মালিক কৃষ্ণ রায় জানান, তার প্রতিষ্ঠানে ৭০ থেকে ৮০ জন কর্মচারী। সপ্তাহে ২/৩ লাখ টাকা বেতন-ভাতা দিতে হয়। কোন বিক্রি নাই। দিন দিন লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।

বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক দীপক কুমার দীবা জানান, অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত ও অ্যাসোসিয়েশনের বাইরে মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার হোসিয়ারি রয়েছে। এসব হোসিয়ারিতে সপ্তাহে প্রায় ২০ কোটি টাকা বিক্রি হয়। অবরোধ-হরতালে সেখানে বিক্রি নেমে এসেছে এক থেকে দেড় কোটি টাকায়। বিক্রি কমে যাওয়ায় মালিকদের অবস্থা ভয়াবহ।

লোনের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকেই নতুন করে অন্যত্র থেকে সুদে টাকা নিচ্ছে। এবং শ্রমিকদের চালিয়ে রাখতে ধার-দেনা করে বেতন ভাতা দিচ্ছে। তিনি জানান, এমনিতে অবরোধ-হরতালে মালিকদের করুণ অবস্থা তার উপর সরকার নতুন করে ট্রেড লাইন্সেসের বাড়তি টাকা জুড়ে দিয়েছে। আগে লাইসেন্স ফি ছিল ৫০০ টাকা, উৎস কর ৩০০ টাকা, ভ্যাট ৭৫ টাকা, সাইনবোর্ড ১০০ টাকা।

যদিও শুরু থেকে গত ২৫ বছর লাইসেন্স ফি ছিল ২০০ টাকা। এখন করা হয়েছে লাইসেন্স ৩০০০ টাকা। উৎস কর ৭৫০ টাকা, ভ্যাট ৩০০ টাকা, সাইনবোর্ড ৬০০ টাকা। লাইসেন্স নবায়ন করতে এখন আয়করের কাগজপত্র লাগবে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয় চলতি মাসের ২রা মার্চ থেকে কার্যকরী হবে গেজেট প্রকাশ করেছে।

দীপক কুমার ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, এমনিতেই আমরা সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি না। তার উপর লাইসেন্স ফিসহ অন্য খরচ বৃদ্ধি হোসিয়ারি মালিকদের কাছে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টরি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লোন নিয়ে যাচ্ছে। আর হোসিয়ারি (ক্ষুদ্র শিল্প) মালিকদের লোন নিতে মর্গেজ রাখতে হয়। হোসিয়ারি শিল্প মূলত কুটির শিল্প।

পরিবারের সদস্যরাও এখানে কাজ করছে। তাছাড়া প্রতি দুই বছর পর পর বার্গেনিংয়ের মাধ্যমে আমরা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করছি। রাজস্ব দিচ্ছি। কিন্তু সরকার আমাদের দিকে নজর দিচ্ছে না। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিকে না পাওয়ায় পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, অবরোধ-হরতালের কারণে হোসিয়ারি ব্যবসায় ৭৫% বিক্রি কমেছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সিজোনাল সময় এই দুই কারণে পড়ে হোসিয়ারি ব্যবসায়ীদের ত্রাহি অবস্থা। কারন শীতের ধকল কেটে না উঠতেই শুরু হয়েছে গরম। দ্রুত দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। সরকার সহজ শর্তে ঋণ দিলে এই শিল্প বেঁচে থাকবে। মালিকরা লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে। না হয় ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা এই অস্থির পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চাই

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৯৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৯৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: লক্ষ্মীপু্‌র পৌরসভার ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্যে ৯৭ ...