মামুনূর রহমান হৃদয়:: আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি তাদের কাছে নব্বই দশকের একেকটা দিন একেকটা স্মৃতির পাতার মতো।সেই সময়টাতে হয়ত এখনকার মতো প্রযুক্তির ছোঁয়া ছিলো না তবে এমন কিছু বিশেষত্ব রয়েছে যা ভালো না বেসে উপায় নেই।

নব্বইয়ের দশকে ছিলো না কোনো  ফেসবুক , ছিল না অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। সেলফোনমুক্ত সময় ছিল নব্বই দশক, চাইলেই হারিয়ে যাওয়া যেত যখন তখন। ল্যান্ডফোন ছিল, আর ছিল ক্রিং ক্রিং সুর। নগরের কিছু জায়গায় টেলিফোন বুথ ছিল। ক্র্যাচকার্ড ঘষে মানুষ কথা বলত হিসেব করে। ট্রাংক কলের যন্ত্রণায় একদিকে যেমন অভিযোগের অন্ত ছিল না, তেমনি কত তরুণ-তরুণী সম্পর্কের সূত্রপাতটা ছিল ওই ট্রাংক কলই!

নব্বইয়ের দশকে প্রতি ঘন্টায় একবার করে লোডশেডিং হতো।এখনকার মতো আইপিএস কিংবা জেনারেটর ছিলো না। বিদ্যুত যাওয়ার সাথে সাথে সবাই ছুটে আসতো বাইরে।তারপর কত ধরনের শোরগোল।বড়রা মেতে উঠত চায়ের আড্ডায় আর ছোটরা নানা রকম খেলায়।যেমন: কানামাছি ,মাংস চোর, বৌ-সি , কুমির ডাঙ্গা , বরফ পানি আরো কত কি।কিন্ত আজকাল কার দিনে গ্রামেও এই দৃশ্য  চোঁখে তেমন পড়ে না।

নব্বইয়ের দশকে বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে ক্রিকেটের তুলনায় ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছিল বেশি। ম্যারাডোনা-রোমারিও থেকে বাতিস্তুতা-জিদান-রোনালদোতে (সিআর সেভেন নয়, দ্যা ফেনোমেনন রোনালদো!) মানুষ বুঁদ হয়ে থাকত। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের চিরকালীন দ্বৈরথটাও ছিল চেয়ে দেখার মত। নব্বইয়ে আমাদের দেশেও ক্লাবের ফুটবল ছিল! এখনকার ফুটবলের মতো নয়, আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচগুলো ছিল বারুদ দিয়ে ঠাঁসা।

নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশনে একটাই চ্যানেল ছিল, বিটিভি! কি অসাধারণ স্বপ্নের মায়াঞ্জনে আঁকা ছিল বিটিভি। সকালে মোগলি, দুপুরে বাংলা ছায়াছবি, সন্ধ্যায় আলিফ লাইলা/ অনন্য সব প্যাকেজ নাটক আর রাতে ছিল হারকিউলিস-এক্স ফাইলস এর স্বপ্নের ভূবন। আর সবার প্রিয় অনুষ্ঠান ছিল, ‘ইত্যাদি’। নব্বইয়ে বাংলা সিনেমা ছিল সত্যিকার অর্থেই ‘বাংলা সিনেমা’। নব্বইয়ে আমাদের ছিল স্বপ্নের এক ‘নায়ক’, সালমান শাহ্‌!

নব্বইয়ের দশকে ডিএসএলআর ছিল না, সফটওয়্যার দিয়ে ফটোতে ফটোতে কারসাজিও ছিল না। ফ্লিম ক্যামেরায় হিসেব কষে ছবি তোলা ছিল তীব্র আনন্দময়। ঘরে ঘরে কম্পিউটার ছিল না, ইন্টারনেট তখনো অচেনা শব্দ , তখন ছিলো মানুষের হাতে অঢেল সময়!

নব্বইয়ে একজন জাদুকর ছিল, হুমায়ুন আহমেদ! এই জাদুকর তাঁর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ হতে একের পর এক জাদু বের করে মোহাবিষ্ট করে রাখত আমাদের।

নব্বইয়ের দশকে মফঃস্বল শহরগুলোতে তারুণ্যের গান মানেই ছিল ব্যান্ডের গান। বড়দের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠেছিল কত-শত ব্যান্ড দল। শত শত শিল্পীদের ভিড়েও বাংলা ব্যান্ড সংগীতের শেষ কথা বলতে ছিল আইয়ুব বাচ্চু আর জেমস অবশ্য আইয়ুব বাচ্চু  না থাকলেও তার গান এখনো বেঁচে আছে সবার অন্তরে।

নব্বইয়ে কোচিং সেন্টার ছিল না, খুব বেশি হলে প্রাইভেট শিক্ষক ছিল। জেএসসি-পিএসসি মানের প্রহসন ছিল না। ছিল ম্যাট্রিক আর আইএ পরীক্ষা। সেখানেও কেবল পাশ করলেই চলত, জিপিএ-৫ পাবার অন্ধ যুদ্ধ ছিল না। স্কুলের পরের সময়ের সবটুকু জুড়ে ছিল খেলা আর খেলা। পাড়ায় পাড়ায় খেলা হত মেডেল-শীল আর কাপ দিয়ে। খেলাকে কেন্দ্র করে মারামারি ছিল অগাধ, কিন্তু দিন শেষ ওই খেলারই জয় ছিল।

নব্বইয়ের দশকে প্রেম ছিল অতিব সাহসিকতার বিষয়। এখনকার মতো তখন তরুণ-তরুণীরা এতো খোলামেলা ভাবে রাস্তা-ঘাটে একত্রে চলাফেরা করতে পারত না। সেসময়ের তরুণ-তরুণীদের চোখের ভাষায় লেখা হত অজস্র গল্প। একের পর এক চিঠি লেখা আর ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্নভাবে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে দেয়া। মাঝে মধ্যে তীব্র আবেগ দিয়ে লেখা চিঠি ধরা পড়ে যেত বড়দের কাছে। এরপর কত মান-অভিমান আর শাস্তির খেলা! নব্বইয়ের ভালবাসা ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কত ছেলে-মেয়ে শুধু ভালবেসে একে অন্যের হাত ধরে ঘর ছেড়েছে অজানা গন্তব্যে, আজ কি তারা খুব খারাপ আছে? হয়ত বা না!

নব্বইয়ের সময় এদেশে জঙ্গি-মৌলবাদী ছিল না, পিস্তল-বোমা-গ্রেনেড হাতে সন্ত্রাসীদের আধিক্য বিস্তার এতো ছিল না। সে সময় পাড়ায় পাড়ায় বাকের ভাই টাইপের কিছু গুন্ডা ছিলো। শার্টের উপরের বোতাম খোলা, মুখে ভারী গোঁফ, চোখে কালো চশমা আর গলায় চেন পরা এইসব গুন্ডাদের অস্ত্র ছিল হকিস্টিক অথবা ক্ষুর, কিংবা খুব বেশি হলে রামদা।

নব্বইয়ের দশকে এদেশের ‘রাজনীতি’ ছিল আরো রোমাঞ্চকর । উত্তাল রাজপথে মিছিল ছিল, ছিল না পেট্রোল বোমা অথবা গুম-খুনের মতো আতঙ্ক। এজন্যই সব রকমের নির্বাচন মানেই ছিল উৎসবের মহাধুম ।

নব্বইয়ের আরও কত যে অসাধারণ সব স্মৃতি রয়েছে , অনেকটা নিশ্চিত করেই বলতে পারি আমরা হয়ত অনেককিছুই হাড়িয়ে ফেলেছি। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, নব্বইয়ের জীবন ছিল, সত্যিকার অর্থের আনন্দময় ! নব্বইয়ে ভালোবাসা ছিল স্নেহ-মমতায় পরিপূর্ণ ।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here