নতুন সামরিক যুগে পৃথিবী

ট্রাম্পডেস্ক নিউজ :: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেড় মাসের শাসনামল নিয়ে পর্যবেক্ষক মহলের একটি সাধারণ বিশ্বাস ছিল_ ব্যবসা ছেড়ে রাজনীতিতে আসা এই নেতা বুঝি মুক্তবাণিজ্য ও সামরিক মৈত্রীর বিরোধী। অর্থাৎ তিনি একজন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ নেতা। বিশেষ করে, টিটিপি এবং ন্যাটো ইস্যুতে তেমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনেই এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১২টি দেশের অংশীদারত্বের চুক্তি ‘ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ (টিপিপি) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়ে আসেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, নির্বাচনের আগে থেকেই পশ্চিমা সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’কে (ন্যাটো) ‘সেকেলে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি, ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো সংস্থাটিতে ব্যয় না বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই দেশগুলোর নিরাপত্তা থেকে বের করে নিয়ে আসারও হুমকি দেন।

এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষকরা মনে করছিলেন আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে ক্ষমতাগ্রহণের দেড় মাসের মধ্যেই ‘খোলস পাল্টাতে’ শুরু করেছেন তিনি। অন্তত তেমনটাই মনে করেন কেমব্রিজের ইতিহাসবিদ স্টিফেন ওয়েরথেইম। এই বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন, ‘ট্রাম্প আসলে বিচ্ছিন্নতাবাদী নন। বরং তিনি একজন যুদ্ধবাদী বা আরও খারাপ কিছু।’

অবশ্য, গত নভেম্বরের নির্বাচনের আগেও ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল। এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি হবেন সেনাবাহিনীর প্রেসিডেন্ট। তাছাড়া, তিনি বারবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মিত্রশক্তির প্রধান সেনাপতি ও জাপানস্থ মার্কিন হেড কোয়ার্টারের (জিএসকিউ) প্রশাসক জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থার এবং ওই বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন কমান্ডার জর্জ প্যাটোনের নাম বারবার উল্লেখ করেন।

এখানেই শেষ নয়। ট্রাম্পের নির্বাচনী সস্নোগান ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বাস্তবায়নে সামরিক বাজেট বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত ছিল তখন থেকেই। আর চলতি সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন অর্থবছরের বাজেট বৃদ্ধির ঘোষণার মাধ্যমে সেই পথেই থাকার প্রমাণ দিলেন তিনি। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ত্রাণ ও পরিবেশ খাতে বরাদ্দ কমিয়ে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াতে চান তিনি। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানান, মার্কিন সামরিক সংস্থা ও পেন্টাগনের বাজেট বর্তমানের চেয়েও আরও পাঁচ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বাড়াতে চান ট্রাম্প, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। সেই হিসেবে নতুন অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক খাতে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

সম্প্রতি ট্রাম্প দম্ভভরে বলেছেন, ‘আশা করছি, আমাদের সামরিক শক্তিকে কারও বিরুদ্ধে ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু কেউ যেন আমাদের সঙ্গে লাগতে না আসে। কারণ আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করতে যাচ্ছি।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেয়া প্রথম ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের যোদ্ধারা যে সম্পদ পাওয়ার যোগ্য, তাদের জন্য তা বরাদ্দ করা হবে।’ একই ভাষণে ‘আমেরিকান উদ্দীপনা পুনরুদ্ধারের’ও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে পরমাণু অস্ত্র সংখ্যা আরও বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে শক্তিশালী পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের ‘মর্যাদায়’ ফিরিয়ে আনারও ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশন’র হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছয় হাজার ৮০০ এবং রাশিয়ার কাছে সাত হাজার পরমাণু অস্ত্র মজুদ রয়েছে। এরপর প্রশান্ত মহাসাগরে পরপর চারটি দীর্ঘ পাল্লার পরমাণুবাহী ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইতিহাসবিদ ওয়েরথেইম বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পরিবর্তে শত্রুতা বাড়ানোর এবং সামরিক বিজয়ের কথাই বলছেন ট্রাম্প।’ তার মতে, ১০০ বছর আগে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এমন বাস্তবতা বহাল ছিল, যখন কট্টর জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা ও সংঘর্ষে জড়িত হওয়াকেই সাফল্য বলে মনে করত। আর সেই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে অনেকে সেই যুগেরই প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখতে পাচ্ছেন। সেই যুগের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, মুক্তবাণিজ্যের পথ বন্ধ এবং সাম্রাজ্যের পতন।

ওয়েরথেইম আরও বলেন, ‘ট্রাম্পের বিদ্রুপাত্মক বক্তব্যের কারণে বিশ্ব আমাদের নিয়ে উপহাস করছে। জাপান সাম্রাজ্য বা নাৎসি জার্মানরা কিন্তু নিজেদের মানচিত্র বাড়ানোর জন্য যুদ্ধে নামেনি। বরং তাদের নেতারা নিজেদের ক্ষমতা ও পদমর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে, এমন ধোঁয়া তুলেই যুদ্ধে নেমেছিলেন। ট্রাম্পও অনেকটা তাই।’- ওয়াশিংটন পোস্ট

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ু্ ্রউ্র

সামরিক শক্তি আরও বাড়াবে ইরান: ঘোষণা রুহানির

ডেস্ক নিউজ :: চাপ থাকা সত্ত্বেও সামরিক শক্তির বৃদ্ধিতে ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম চালিয়ে ...