নতুন ভবনে বইয়ের ভান্ডার: পরিত্যক্ত ভবনে পাঠদান

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, নোয়াখালী প্রতিনিধি :: নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার মধ্যম সুন্দলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন থাকা স্বত্বেও শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে পরিত্যক্ত টিনশেডে ভবনে। মূল ভবনে ৫টি কক্ষের মধ্যে দুটিতে পুরো উপজেলার নতুন ও বিগত সময়ের উদ্ধৃত্ত বইয়ের ভান্ডার গড়ে তোলায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কোমলমতী শিশু শিক্ষার্থীদের। অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়ম বহির্ভূত বইয়ের ভান্ডার গড়ে তোলেন ওই স্কুলে। এ নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যও ছিল দায়সারা।

চতুর্থ শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী জানান, পরিত্যক্ত টিনশেড ভবনে তাদের ক্লাস করতে অসুবিধা হয়।তারা ঠিকমত বসতে পারে না।ইট বালুর কারণে পরনের জামা কাপড় প্রায় ময়লা হয়।ক্লাস শেষ করে বাড়িতে গিয়ে ধোঁয়ার সময় না পাওয়ায় ময়লা পোশাক নিয়ে ক্লাসে আসতে হচ্ছে।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দুটি ভবন। একটি দোতলা, অপরটি আধাপাকা পরিত্যক্ত টিনশেড। শিশু শ্রেণিসহ বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় দুইশ। শিক্ষার্থী হিসেবে দোতলা ভবনটিই পাঠদানের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ২য় ও চতুর্থ শ্রেণির কোমলমতী শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে পরিত্যক্ত টিনশেড ভবনে। এতে বর্ষা মৌসুমে পানি গড়িয়ে অনেক সময় বই খাতা আসবাবসহ শিক্ষার্থীদের ভিজতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পানি ডুকে পড়লে পায়ের নিচে ইট দিয়ে বসতে হয় তাদের। কক্ষে পানি থাকায় শিক্ষকও যেতে পারে না শিক্ষার্থীর পাশে। শীতে কুয়াশায় ভেজা থাকে কক্ষগুলো। অতিরিক্ত রোদেও সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। টিনশেডে নেই ভালো আলোর ব্যবস্থা। কোনো কোনো অংশ মনে হয় এখনই ভেঙে পড়বে।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক ও স্থানীয়রা জানান, ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ২০১১ সাল পর্যন্ত অর্ধশত বছরের পুরোনো তিন কক্ষের আধাপাকা সেই টিনশেডেই লেখাপড়া করেছে। পরে ২০০৫-২০০৬ সালে সরকারিভাবে একতলা একটি পাকা ভবন হলে কয়েকটি শ্রেণি সেখানে স্থানান্তর করা হয়। ঝুকিপূর্ণ হলেও অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ২০১২ সাল পর্যন্ত ওই টিনশেডেই পাঠ নিতে হয়েছে। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ একতলা ভবনকে দোতলায় রূপান্তর করে এবং ২০১৭ সালের দিকে টিনশেডটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু পরিত্যক্ত হলেও বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হচ্ছে পরিত্যক্ত ভবনেই।

সূত্র জানায়, দোতলা ভবনটি দৃষ্টি নন্দন। ওই ভবনে ৫টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় তলায় তিনটির মধ্যে একটিতে অফিস কক্ষ। নিচ তলায় রয়েছে দুটি বড় কক্ষ। যার দুটি কক্ষই গত তিন বছর পর্যন্ত পুরো কবিরহাট উপজেলার নতুন ও বিগত সময়ের উদ্বৃত্ত বইয়ের স্টোর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার যোগশাজসেই মূলত এ বিদ্যালয়ে বইয়ের ভান্ডার গড়ে তোলা হয়। নিয়ম না থাকলেও জোর পূর্বকই ব্যবহার করা হচ্ছে। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে একাধিকবার বইগুলো সরিয়ে নিতে বললেও তিনি কর্ণপাত করেননি। ফলে ভবন থাকা স্বত্বেও বিদ্যালয়ের কোমলমতী শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে হচ্ছে পরিত্যক্ত টিনশেডে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, গত তিন বছরের মতো বই রাখছে। তার আগে আরো তিন বছর ওই দুই কক্ষ ব্যবহার হতো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে। অর্থাৎ এক তলা ভবন যখন দোতলায় রূপান্তরিত হয় তখন থেকেই নিচ তলার কক্ষগুলো উপজেলা শিক্ষা অফিসের দখলে চলে যায়।

জানতে চাইলে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি মাহমুদ বিন ওয়াহিদ বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে তিনি মৌখিক ও লিখিতভাবে জানিয়েছেন। কিন্তু কিছুতেই উপজেলা কর্মকর্তা কর্ণপাত করেননি। ২০১৬ সালের দিকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদরে মুনির ফেরদৌস বিদ্যালয় পরিদর্শনে এলে তাকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তখন তিনি এগুলো দ্রুত সরিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিলেও তা করেনি।

অনেকের বক্তব্যে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরীর যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। পরে বিষয়টি প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তবে তার বক্তব্য ছিল অনেকটা দায়সারা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন নয়, বছরের শেষের দিকে মূলত বই রাখা হয়। জানুয়ারিতে বই বিলি হয়ে গেলে ক্লাস আবার চালু হয়ে যায়।

এক প্রশ্নে তিনি বলেন, শিক্ষা কর্মকর্তা চেয়েছেন বলেই তিনি সুযোগ দিয়েছেন। তবে বই গুলো সরিয়ে নিলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো হতো বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে কবিরহাট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বিদ্যালয়ে বই রাখার কথা অকপটে স্বীকার করন। তিনি বলেন, ওই স্কুলে বই রাখা ছাড়া তার কোনো উপায় নেই। সেখান থেকে বইগুলো সরানো হলেও আবার অন্য কোনো স্কুলেই রাখতে হবে। তিনি উপজেলা পরিষদ ভবনে কেন রাখছেন না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পরিষদ ভবনে কোনো স্থান নেই, ফলে বাধ্য হয়ে তাকে সেখানেই বই রাখতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের ভবন থেকে বই সরিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার সুযোগ করে দেয়ার দাবী শিক্ষার্থী ও স্কুল কর্তৃপক্ষের। একই সঙ্গে এমন ঘটনায় শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলেও মনে করেন অনেকে।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বাঘায় ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা

ডেস্ক রিপোর্ট:: রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ছাত্রলীগের নেতার ...