মাহমুদুন নবী বেলাল, নওগাঁ প্রতিনিধি ::

সারাদেশে ধান-চাল উৎপাদনে অন্যতম জেলা নওগাঁয় বাজারে ধানের দাম পাওয়াসহ সরকারি গুদামে বিভিন্ন ভাবে হয়রানির কারণে কৃষকরা সরকারি গুদমে ধান সরবরাহে আগ্রহী নন। ফলে গত ইরি-বোরো মৌসুমের মতো বছরও ধান সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাজারে ধান বেশি দামে কেনাবেচা হলেও চালের বাজারে এর প্রভাব পরেনি। আগের দরেই বিক্রি হচ্ছে চাল। নওগাঁর মিল মালিকরা জানিয়েছেন, সরকারি বেধে দেওয়া দামের চেয়ে বর্তমানে চাল উৎপাদনে ১/২ টাকা বেশি হলেও সরকারি গুদামে সরবরাহে আগ্রহী। পুরোদমে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হলে ধান-চালের দাম কমার সম্ভাবনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, নওগাঁয় স্বর্ণা-৫ ও গুটি স্বর্ণা জাতের ধান মাঠে মাঠে কাটা মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কৃষকরা জানিয়েছেন, জেলার কিছু জমিতে কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। তবে জমিতে ভালো ধান হওয়ায় প্রতি বিঘায় ১৪ মণ থেকে ১৮ মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে। ভালো ফলন ও কাটা মাড়াইয়ের শুরুতে বাজারে গত বছরের তুলনায় বেশি দামে ধান বিক্রি করতে অনেকটাই খুশি।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সামছুল ওয়াদুদ জানান, নওগাঁয় চলতি আমন মৌসুমে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ধান চাষে পরিবেশ অনুক’লে থাকায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। ইত্যে মধ্যে ২৩ ভাগ ধান কাটা মাড়াই শেষ হয়েছে। আমন মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান চাষ হওয়ায় ও ধানের চাষ আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের ভালো ফলনও হয়েছে। খাদ্যে উদ্বৃত্ত জেলা নওগাঁয় আমন মৌসুমে ৭ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বেশি ধান উৎপাদন হবে।

নওগাঁ সদরের বোয়ালিয়া গ্রামের আব্দুর রফিক জানান, গত বছর আমন ধান প্রতি বিঘায় ১০ মণ থেকে ১৪ মণ উৎপাদন হয়েছে। কম দামেই ধানও কেনা বেচা হয়েছে। তবে এ বছর ধানের ভালো ফলন ও ধান প্রতি মণ ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে লাভবান হবে কৃষকরা।

জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য বিভাগ থেকে চলতি আমন মৌসুমে সরকারি ভাবে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৮০ টাকা ও প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। গত ৭ নভেম্বর ধান-চাল সংগ্রহের উদ্ভোধন করা হয়েছে। নওগাঁয় চলতি আমন মৌসুমে ধানে ১০ হাজার ২শ’ মেট্রিকটন ও চালে (সিদ্ধ) ২৩ হাজার ৩শ’ মেট্রিকটন কেনা হবে। নওগাঁর সদর, রাণীনগর, মহাদেবপুর ও নিয়ামতপুর উপজেলায় কৃষি অ্যাপসের মাধ্যমে ধান কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। আর জেলার বাঁকি আত্রাই, বদলগাছী, পত্নীতলা, ধামইরহাট, মান্দা, পোরশা, সাপাহার উপজেলার কৃষি কার্ডধারীদের মধ্যে লটারির মাধ্যমের ধান কেনা হবে। চাল সংগ্রহ করা হবে মিলারদের কাছ থেকে। গত ইরি-বোরো মৌসুমে নওগাঁয় ধান ২৫ হাজার ৬শ’ ৯৭ মেট্রিকটনের বিপরীতে ৩ হাজার ৫শ’ ৮২ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ করতে পেরেছিল খাদ্য বিভাগ। তবে চালে বরাদ্দ ৫৩ হাজার ২শ’ ৪৬ মেট্রিকটনের বিপরীতে ৯৮ ভাগ সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে।

কৃষকরা জানান, নওগাঁর বাজারে প্রতি মণ ধান কেনা-বেচা হচ্ছে ১ হাজার টাকা থেকে ১ হাজার ৭০ টাকায়। ১০ কিলোমিটার দূর থেকে ১ মণ ধান পরিবাহনের মধ্যেমে গুদামে নিয়ে গেলে প্রায় ১ হাজার ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকা খরচ হয়। এ ছাড়াও
সরকারিগুদামে ধান সরবরাহ করতে গেলে নিজের শ্রমিকের দাম যোগ করলে সরকারি দামের চেয়ে বেশি খরচ হয়। এ ছাড়াও ধানের আদ্রতা, চিটা, ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনসহ খাদ্য বিভাগের অসহযোহিতায় ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ কারণেই কৃষকরা নিজ বাড়ি থেকে নগদ টাকায় কোন হয়রানি ছাড়াই সহজেই নগদ টাকায় ধান বিক্রি করে দেন।

জেলা চাল কল মালিক গ্রুপের সাধারণ ও মিল ব্যবসায়ী ও সম্পাদক ফরহাদ হোসেন জানান, সরকারি ভাবে ধানের নির্ধারণ করা মূল্যের কাছাকাছি নওগাঁর বাজারে ধান বিক্রি হওয়ায়, সরকারিগুদামে হয়রানি, ঘুষসহ বিভিন্ন জটিলতায় এ বছরও গত বছরের মতো কৃষকরা সরকারিগুদামে ধান সরবরাহে আগ্রহী নন। কৃষকদের আগ্রহী করতে বাজারের মূল্যেও চেয়ে বেশি দাম নির্ধারণসহ হয়রানি বন্ধের দাবি জানান তিনি।

নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার জানান, নওগাঁর হাট-বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধি পেলেও এখনো চালের বাজারে এখনো এর প্রভাব পরেনি। বর্তমানে খুচরা মোটা জাতের প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকা দরে।
চিকন জাতের চালের বাজার স্থীতিশীল রয়েছে।

শেখ রাইচ মিলের প্রোপাইটার শেখ ফরিদ উদ্দিন জানান, নওগাঁয় আমন ধান কাটা- মাড়াইয়ের শুরুতে বেশি দামে ধান-কেনাবেচা হচ্ছে। সরকারি ভাবে প্রতি কেজি চালের মূল্য ৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও বর্তমানে চালের উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ৪২ টাকা। ২/১ টাকা তাদের লোকসান হলেও সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করে সরকারকে সহযোহিতা করতে চাই। পুরোপুরি ভাবে ধান কাটা মাড়াই শুরু হলে ধান ও চালের মূল্য কমে যাবে এমনটাই আশা ব্যক্ত করেন।

নওগাঁর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) আলমগীর কবির জানান, সরকার স্বচ্ছতার সাথে ধান ও চাল সংগ্রহ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। গুদামে কোথাও কৃষকদের হয়রানি করা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বছর ধান ও চাল নওগাঁয় পুরোপুরি সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here