ধর্মান্ধ ও ধর্মবিদ্বেষী, দু'টোই ভয়ঙ্কর
ছবিতে লেখক

ফাতিহুল কাদির সম্রাট: ধর্মান্ধ ও ধর্মবিদ্বেষী দুটো গ্রুপই সমাজে প্রবল হয়ে উঠেছে। এরা উভয়েই সমাজ ও মানবতার শত্রু। এই দুই অশুভশক্তি আমাদের চিরায়ত সহাবস্থান সৌহার্দ্যকে ধ্বংস করছে। একজন মানুষ ব্যক্তিগতজীবনে ধর্মকর্ম না করুক এমনকি নাস্তিক হলেও সে যদি নিজের মতো থাকে, ধর্মের বিরুদ্ধে বিষোদগার না করে তাকে ধর্মবিদ্বেষী বলা অন্যায়। যার যার বিশ্বাস তার তার কাছে এবং প্রত্যেকে নিজের কৃতকর্মের জন্যে দায়ী। আবার একজন মানুষ ধর্মকর্ম করলেও যদি ধর্মের প্রকৃত চেতনাকে জীবনাচরণে ধারণ না করে তাকে ধার্মিক বলার কোনো কারণ নেই। আচরণিক ক্রিয়াকলাপ সর্বস্ব ধার্মিকতা বর্তমানে বাড়-বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে।

সাকিব আল হাসানকে হত্যার হুমকিদাতা কিংবা পাটগ্রামের পাগলরা ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। ইসলাম ব্যক্তি মানুষকে আইন হাতে তুলে নেওয়ার অনুমোদন দেয় না। কোরানের ভুল ইন্টারপ্রিটেশন তৈরি করে ধর্মান্ধ ও ধর্মবিদ্বেষী দুটো শ্রেণিই। বিশেষ করে ‘কিতাল’ নিয়ে দুপক্ষই দুরভিসন্ধিমূলক বক্তব্য দেয়। ইসলামে মুরতাদ কিংবা ইসলাম ত্যাগকারীকে হত্যা করার নির্দেষ আছে বলে দুপক্ষই দাবি করে। একপক্ষ কিতাল বাস্তবায়নের জন্যে খঞ্জর নিয়ে মাঠে নামতে চায় আরেক পক্ষ ইসলামকে নিষ্ঠুর ও রক্তপিপাসু ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করতে মরিয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রেক্ষিত বিবেচনায় না নিয়ে কথা বলা হয়। যে রাষ্ট্র ইসলামি শরিয়া আইন দ্বারা পরিচালিত নয় সেখানে কোরানিক নির্দেশনা বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। সরকার যদি প্রচলিত আইনে কোনো বিধিব্যবস্থা নেয় তাহলে তার আওতায় বিহিত হতে পারে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষ কিছুতেই কিতালের মতো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার অধিকার রাখে না। কেউ চেষ্টা করলে তা হত্যাচেষ্টারই শামিল বলে গণ্য হবে। সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্থখলা সৃষ্টি ঘোরতর অপরাধ। “আর ধর্মের ব্যাপারে ফেতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ।” (বাকার-১২১৭) যারা প্রতিনিয়িত ধর্মের বিষয়ে বিষোদগার করে তারা এবং ধর্মের নামে যারা অনধিকার চরমপন্থা প্রদর্শন করে উভয়েই অপরাধী। এরা সামাজের শত্রু। মানবতার শত্রু।

সাকিব আল হাসানের মতো স্টারদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। কারণ তাদের লাখো অুনসারী আছে। তাদের প্রতি মানুষের মুগ্ধতা ইমোশনে মোড়ানো। তিনি বলেছেন, তিনি কলকাতায় কোনো পূজা উদ্বোধন করেননি। আমি বিশ্বাস করি, সাকিব মিথ্যা বলেননি। কিন্তু তিনি একথাটি বলেছেন যখন তখন যখন চারদিক দিক থেকে তাঁর দিকে সমালোচনার তীর ছুটে আসছিল, এমনকি হত্যার হুমকিও। অথচ দেশের প্রধান মিডিয়াগুলো তার পূজা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার খবর সচিত্র প্রচার করছিল। আমার ধারণা সত্যমিথ্যা যাই হোক, খবরটা তিনি উপভোগই করছিলেন। নিজের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়ার সুযোগটা তিনি লুফে নিয়েছিলেন। তানা হলে তিনি সাথে সাথে মিডিয়ায় প্রতিবাদলিপি পাঠালেন না কেনো?

আমার জানামতে সাকিব আল হাসান ব্যক্তিগতজীবনে ধার্মিক মানুষ। তিনি যদি পূজা উদ্বোধন করে থাকেন তাহলে বলতে হবে ইসলাম বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। পূজা উদ্বোধন করা হয়তো তাঁর ঠিক হয়নি কিন্তু বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি মূর্তিপূজারী হয়ে গেছেন এমনটা বলাও ঠিক নয়। এটা মুসলমান হিসেবে তার একটি মানবীয় ভুল। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন অথবা জানতেন না, একজন প্রকৃত মুসলমান কিছুতেই প্রতিমাপূজার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে পারেন না। একজন মুসলমান ভিন্নধর্মী মানুষদের সাথে কীভাবে মিশবেন, কী করবেন, তা কোরানে বলা আছে। একজন মুসলমান সমাজজীবনে অন্যধর্মের মানুষের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখবেন, তাদের প্রতি যত্নশীল হবেন ইসলাম এমন নির্দেশই দেয়। তাদের দেওয়া খাবার খেতেও নিষেধ নেই কিন্তু সব খাবার গ্রহণের অনুমোদন নেই। বিশেষ করে পূজার উপাচার খাওয়া হারাম। একজন মুসলমান বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সমাজে অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মকর্ম পালন নির্বিঘ্ন করতে সহায়তা করবেন, এমন কি প্রতিমাপূজা হলেও। এটা তার দায়িত্ব। কিন্তু পূজায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে সাকিব যদি পূজা উদ্বোধনও করে থাকেন তাহলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু তাকে হত্যা করতে যাওয়া বা চাওয়া কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাকিব সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। বিষয়টি এখানেই শেষ হওয়া উচিত। তসলিমা নাসরিন বলেছেন সাকিব ক্ষমা চেয়ে ঠিক করেননি। আমি মনে করি তসলিমা নাসরিনের এ কথায় সাকিব কান দেবেন না।

চরমপন্থা কিছুতেই কাম্য নয়। বহু ধর্ম ও বর্ণের মানুষের পারস্পরিক মেলবন্ধনে আমরা একটি সুখময় সমাজজীবন চাই। ফেতনা ফাসাদ সহিংসতা কিছুতেই চাই না। সরকারের উচিত হবে ধর্মান্ধ ও ধর্মবিদ্বেষী দুটি শ্রেণিকেই নিয়ন্ত্রণে আনা।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, বাংলা, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here