দেশে হচ্ছে কী, আর ঘটছে কী?

জুঁই জেসমিন

লেখক- জুঁই জেসমিন

জুঁই জেসমিন :: ‘বিচার চাই, বিচার চাই- অপরাধীর ফাঁশি চাই’  এই শ্লোগানে ছাত্রছাত্রীসহ সকল প্রতিবাদী জনতা নামে রাস্তায়, বিচারের দাবিতে। এতে কি সমাধান আদৌ হচ্ছে ? কমেছে কি অপরাধ? বরং বেড়েই চলেছে। তার মানে দিনের পর দিন একটার পর একটা ঘটনা ঘটবে, ঘটতেই থাকবে। আর পেঙ্গুইনের মতো সারিবদ্ধ হয়ে চুপটি করে দেখে যেতেই হবে। প্রশাসন, সাংবাদিকসহ সকল স্তরের ক্ষমতাধারীগণ যদি বৃক্ষের ডালকাটা নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে বৃক্ষের গোড়ার সমস্যা বের করে- কি কি কারণে- একজন মানুষ খুনি ধর্ষক অপরাধী হয়ে রূপ ধারণ করছে, এর পিছনে কে বা কারা ? তবেই হয়তো অপরাধ কমে আসতে পারে।

আজ সেই কারণ গুলো চিহ্নিত না করে সচেতন মূলক ব্যবস্থা না নিয়ে, দিনের পর দিন ভয়ংকর ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে জাতি প্রকাশ্য দিবালোকে। হয়তো আজ, কাল,পরশু আমার আপনার প্রত্যেকের প্রাণ এভাবেই ঝরে যাবে! যেভাবে গেল তনুর প্রাণ, তানজিনার প্রাণ, রাজন, রিফাতের প্রাণ আরও অনেকের ।

স্বাধীনতার বুকে আর কত রক্ত ঝরবে? আর কত প্রাণ ঝরবে এভাবে? কেউ জানিনা? নুসরাত হত্যাকারীর সিরাজদ্দৌল্লার ফাঁসির গানের ভলিয়ম কমতে না কমতেই রিফাত হত্যার নয়ন বল্ডের ‘ফাঁশি চাই’- বিচার চাই ‘ এই মিছিল স্লোগানে আকাশ বাতাস পথ উত্তপ্ত করা হয় কিন্তু আপসোস নয়ন বল্ড জেলখানায় জামাই আদর পাওয়ার আগেই পুলিশের সাথে বন্ধুক যুদ্ধে নিহত হলো। খুব দ্রুত অপ্রত্যাশিত এক বিচার, যেন হাত ফুসকে মাছ আগুনে পড়ে মরার মত।

ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতালের সেবিকা ‘তানজিনা’, রাস্তার বখাটে ছেলে জীবন’কে শাসন করতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষতই প্রাণ হারালো! নারায়ণগঞ্জের অক্সফোর্ড বিদ্যালয়ের শিক্ষক আরিফের ফাঁদে প্রায় সত্তরজন শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির স্বীকার হয়। ছাত্রছাত্রী, ডাক্তার, নার্স, অভিভাবকসহ রাস্তায় নেমেছে সুবিচার পাওয়ার প্রত্যাশায়। শিক্ষা অঙ্গনে চরম নিরাপত্তার অভাব! কী হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ? কী ঘটছে দেশে ? শুধু ঘটনা আর মিছিল, স্লোগান।

জাতীয় গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’- এই গান সেই সুর কেন আকাশে হিলোল্লিত হয়না সুমধুর সুরের মূর্ছনায়? দৈনন্দিন কেন উচ্চাতি হয়- ‘বিচার চাই, নিরাপত্তা চাই, খুনির ফাঁশি চাই’ ? এই চিৎকারে আকাশ কাঁপে, গলাও ফাটে, পাপীরা হাসে। এতে কতটুকু রক্তে কেনা দেশের মান থাকছে? দেশ উন্নয়নে বেশ এগিয়ে, যা প্রশংসনীয় বিশ্ব উদ্যানে। কিন্তু অপরাধ আর ভয়ংকর ঘটনায় প্রতিনিয়ত আতংকিত জাতি। বেশির ভাগ কূ ঘটনা ঘটে শিক্ষক ও ছাত্রীর মধ্যে । শিক্ষকরা যদি সুশিক্ষা না দিয়ে ভক্ষক হয়, দেহ ভোগী হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা কি শিক্ষা অর্জন করতে পারবে? কতটুকু আলোকিত হতে পারবে?

গুরুতর প্রশ্ন হলো -শিক্ষক হয়ে এই জঘন্য কাজ কেন শুরু করে? কি কি কারণে? অপরাধীর কাছ থেকে এসব জানা অত্যন্ত জরুরী। তা না হলে অপরাধীর সংখ্যা দিনদিন বাড়তেই থাকবে। শুধু মেধা যাচাইয়ে শিক্ষক নির্বাচন নয়, চরিত্র জেনে এবং বিশেষ বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। কোনো প্রকার ঘুষ ছাড়াই প্রকৃত মেধা ও সৎ স্বভাব এমন আদর্শবান প্রার্থী যদি শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়, তবেই দেশের সন্তান মানুষ হবে।

এতে আর কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নুসরাত ও সিরাজদৌল্লার মতো ঘটনা ঘটবেনা, আর কোনো শিক্ষক নারায়ণগঞ্জের আরিফ হয়ে উঠবেনা, হবেনা কোনো ছাত্রী যৌন হয়রানির স্বীকার। বাংলার ঘরে ঘরে কতটা পরিবার শান্তিপূর্ণ? স্বামী স্ত্রীর মাঝে কতজনের ভাল সম্পর্ক ? কতজন বাবা মা সন্তানকে সময় দিচ্ছে সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখছে ? পরিবার সুস্থ না থাকলে, বাবা মা সন্তানের কাছে শ্রেষ্ঠ না হলে- সন্তান কতটুকু ভাল হবে? একটু ভাবুন- সন্তান কি বাবা মা’কে ভয় করে? করেনা, বরং বাবা মা’য়েরাই সন্তানদের ভয়ে জড়সড়।

কি করে আশা করতে পারি সন্তান মানুষ হবে? অনেক পরিবারে দেখা যায় মা তার সন্তানকে বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। বাপ ও সন্তানের মাঝে সম্পর্ক নেই এক পরিবারে থাকা সত্তেও। মায়ের কথায় সন্তান উঠেবসে বা বাবার কথায়। মা বলে তোর বাপ খারাপ, আর বাপ বলে তোর মা খারাপ, তোর মা’র মতো হবিনা’ – মধ্যখানে এই হিংস্র প্রভাবে সন্তান একসময় ভয়ংকর ভাইরাস হয়ে সমাজে চোখ মেলে। যা একটার পর একটা শিরোনাম হয় কুকর্মের।

সন্তান আর পিতামাতার সম্পর্কের দূরত্বের কারণে এক একটি সুন্দর জীবনে অন্যায় অপকর্মের দানা বাসা বাঁধে। আর পরকীয়ার প্রভাব এতো বেশি জাল বুনেছে শহর গ্রাম সবখানে, সংসার গুলো যেন চরম ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। সংসার আছে, শান্তি নেই। বউ আছে সেবা নাই। স্বামী আছে দায়িত্ব নাই। সন্তান আছে যত্ন নাই।

উড়ুউড়ু মন নিয়ে অনিয়ম পথ চলা সন্দেহ আর ভাংচুরের ছক্কা গুটি ছুঁড়ে। একটা কথা না বললেই নয়, দেশের মানুষ দেশের খবর কতটুকু রাখে? অপরাধ তো ক্রমশ বাড়বেই। একজন শিক্ষার্থী কোচিং আর ক্লাস শেষ করে ফিরতেই রাত হয়ে যায়। হাতে রিমোট নিয়ে দেশের খবর শোনা বা জানার কোনো সময় সুযোগ নেই। সময় থাকলেও রিমোট বন্দী মায়ের হাতে, ভারতীয় চ্যানেলে মায়েরা মগ্ন, বিভোর। একজন শিক্ষার্থী কিভাবে সচেতন হবে আর কিভাবে দেশের খবর জানতে পারবে ?

আপনার আশেপাশের বা আত্মীয় স্বজনের মধ্যে কাউকে ফোন দিয়ে বলুন তো- রিফাত, তনু, নুসরাতের ঘটনার ব্যাপারে। দশজনের মধ্যে সাতজনেই বলবে কোন রিফাত? কোন নুসরাত? তারপর নিজেই বুঝতে পারবেন, দেশের খবর কে কতটুকু রাখে। সংবাদ আছে শ্রোতা নেই। পত্রিকা আছে পাঠক নেই। এই অবস্থা। সিরাজদৌল্লাহ, মাষ্টার, আরিফুল, নয়নবল্ড, ও জীবন আকাম, মনে হয়না দেশের কোনো খবর রেখেছিলো কোথায় কি ঘটছে। তা না হলে এই বিশ্রী কাজে লিপ্ত হতোনা।

এসব করার আগে প্রাণে ভয় হতো। প্রত্যেক অপরাধীর ফটো পোস্টার করে সব প্রতিষ্ঠানসহ হাটবাজারে ব্যানার ঝুলিয়ে বা দেয়ালে দেয়ালে লাগিয়ে দেওয়া হলে কেমন হবে ? এমনটি করলে নিশ্চয় সকলেই দেখবে, সকলেই পড়বে, জানবে সচেতন হবে। টিভি দেখুক আর না দেখুক, পত্রিকা পড়ুক আর না পড়ুক। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টারে সবার ঠিক চোখ পড়বে। দেশের প্রত্যেকটা মানুষ জানবে দেশে হচ্ছে কী, আর ঘটছে কী?

 

 

 

 

মানবাধিকার কর্মী, ঠাকুরগাঁও। jui.jesmin306@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রথমবারের মতো স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে অর্থনীতিতে নোবেল জয়

ডেস্ক নিউজ :: নোবেলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই বছরে অর্থনীতিতে অভিজিৎ বিনায়ক ...