দেশে করোনা এ দায় কার?

.
কৃষ্ট মোহন সিংহ :: ” I have an Italian Passport. I hate you Bangladesh.”  এক প্রবাসী ভাইয়ের বিমানবন্দরে এমন দৈত্যের মত ঘোৎ ঘোৎ চিৎকার শোনার সৌভাগ্য হয়েছে ফেসবুকের বদৌলতে।
.
কিনা দেখি ফেসবুকে চোখ দিলে?  ভালো মন্দ উভয়ই। টেঁটা যুদ্ধ, প্রতিপক্ষের পা কেটে উৎসব, ত্রান সামগ্রী চুরি, খাটের নীচে টিসিবি’র তেল, করোনা সন্দেহে সন্তানের মাকে জঙ্গলে ফেলে আসা, প্রবাসীর গৃহে ঢুকে স্ত্রীসহ তিন সন্তানের গলাকাটা দেহ, রেপিড টেস্ট করোনা কীট স্নায়ুযুদ্ধ এবং সর্বশেষ গোপালগঞ্জে কোটালিপাড়া  সাদুল্লাপুরে এক নারী স্বাস্থ্যকর্মীর নিভৃত কোয়ারেন্টাইন তাল পাতার সেপাই।
.
করোনা শনাক্ত আর মৃত্যুর হিসেবের পাশাপাশি ভালো খবরও শুনার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রনোদনা প্যাকেজ ৭৩ হাজার কোটি টাকা, ডাক্তার নার্সসহ সরকারি কর্মচারীগণের নিরাপত্তা বীমা, অসৎ চেয়ারম্যান ইউপি সদস্য ও ডিলারের হাতে হাতকড়া, জঙ্গলে ফেলে দেওয়া মায়ের ম্যাজিস্ট্রেট ধর্মপুত্র, বাজার নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব প্রাপ্ত অফিসার কর্তৃক অসাধু ব্যবসায়ীর গলাকাটা দামের ফেসবুক লাইভ, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঁধে অনাহারীর গৃহে ত্রান পৌছানো, বরিশালে ডাঃ মনীষা চক্রবর্তীর  “এক মুঠো চাল” সংগ্রহ কর্মসুচী ও “মানবতার বাজার “, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তিলোত্তমা সিকদারের বৃষ্টিতে ভিজে ইফতার বিতরণ, এক ভিক্ষুকের কষ্টে জমানো দশ হাজার টাকা সরকারি ত্রান তহবিলে জমা এবং তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর, আর বুকের দুধের সন্তানকে বাড়িতে  রেখে ডাক্তার  মায়ের কর্মক্ষেত্রে যমের সাথে যুদ্ধ – সবই চোখে পড়ে বাঙালী শিক্ষিত সমাজের।
.
খুব আনন্দ লাগে এবং গর্ব হয়  যখন আমরা  ভালো খবর শুনি। আমরা নিজেরা করতে পারিনা কিন্তু আমাদের ভাই বোনেরা এটা করে। আবার হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হয় যখন খারাপ খবর শুনি বা চোখে পড়ে ।
.
ঘটনা গোপালগঞ্জ কোটালিপাড়ার সাদুল্লাপুর ইউনিয়ন। পিতৃহারা এক কিশোরী স্বাস্থ্যকর্মী বয়স একুশ। বৃদ্ধা মায়ের ভরনপোষণের একমাত্র উপার্জক্ষম কন্যা সম্প্রতি ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছে । ইমপালস হাসপাতালে চাকুরি করত সে। করোনা ভাইরাসের ভয়ে নিজের বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি অত্র এলাকার চেয়ারম্যান প্রশান্ত বাঁওড়ে। ঠাই করে দিয়েছে গ্রাম থেকে দুরে পুকুর পাড়ে তালপাতা মোড়ানো এক ঝুপড়ি ঘরে। মশা, ঝড়বৃষ্টি আর রৌদ্রে সাতদিন সাতরাত। গৃহে বৃদ্ধা মায়ের নির্ঘুম রাত – সবই বিচলিত ব্যথিত করেছে বিবেকবান মানুষকে।
.
সভ্য সমাজে বাস করে এমন অসভ্য কাণ্ড দেখতে হয় কিছু অসভ্যদের জন্য। সমাজপতি হয়ে কিভাবে এর দায় চাপায় গ্রামবাসীদের উপর। গ্রামবাসীর সবার সিদ্ধান্তে এটা করা হয়েছে বলে জানায় এই অকর্মা চেয়ারম্যান সাহেব।
.
আমার জানামতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার কারনে এমন কতিপয় অকর্মাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে নিরুপায় জনগন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন গ্রহনযোগ্য করার ক্ষেত্রে এমন জনপ্রতিনিধিদের  বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিগণকে ভাবা দরকার।
.
 বাংলাদেশে তথা বিশ্বে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লো – এই দোষটা কার?  প্রবাসীদের? না। জনগণের?  না। সরকারের? না। চীনের? না।
 দোষ কারো না। মনে হয় দোষটা শুধু এই স্বাস্থ্য কর্মী নারীর। নারীর প্রতি অবহেলা আমাদের সমাজব্যবস্থা আর শিক্ষাব্যবস্থাই দায়ী। বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করে সার্টিফিকেট পেয়েছি কিন্তু নলেজ বাড়েনি, মানবতা বাড়েনি।
.
যুগে যুগে কেবল নারীরাই নির্যাতিত ধর্ষিত হয়েছে। ১৯৭১ যুদ্ধে পুরুষদের গুলি করে মেরেছে কিন্তু নারীদেরকে পাক-ক্যাম্পে খুবলে খুবলে খেয়েছে রাতদিন। নারী নির্যাতন অব্যাহত আছে। অপরাধ ঘটে ধরা পরে শাস্তি হয় কিন্তু জনগন শান্তি পায় না। কারন অপরাধ কর্ম ফেসবুকে আসে কিন্তু শাস্তি দৃষ্টান্তমুলক হচ্ছে কিনা তা প্রচার হয় না। দ্রুত দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির ব্যবস্থা না হলে এটা চলতেই থাকবে।
.
বাংলায় অনেক পরিবার আছে যেখানে পুরুষ নেই। এক মা তিন বা পাঁচ কন্যা। মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য লেখা পড়া করেছে কিন্তু
চাকুরী নেই। ভালো পরিবারে বিয়ে দিবে যৌতুক দেওয়ার ক্ষমতা নেই। অশিক্ষিত অকর্মার সাথে বিয়ে হয়েছে চলে অকথ্য নির্যাতন, তালাক সর্বোপরি পতিতালয়ে বিক্রি। নিরুপায় হয়ে গার্মেন্টস ফেক্টরিতে চাকুরী করলে খারাপ মেয়ের অপবাদ। এমন পরিবারের দিকে সরকারের শুভদৃষ্টি কামনা করছি।
.
চাকুরী জীবীদের বেতন বেড়েছে তাই যৌতুকও বেড়েছে। কিছু অপদার্থ কুলাঙ্গারদের যৌতুক দাবি দশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। অনাদায়ে ঠাঁই বাপের বাড়ি না হয় ভালোবাসা হীন দাসী হিসেবে স্বামীগৃহে নিগৃহীত। যৌতুকের ব্যাপারে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করা প্রয়োজন। কেউ যৌতুক নিলে বা প্রমাণ পেলে চাকুরী চ্যুত বা সম্পত্তি বায়েজাপ্ত আইন করা জুরুরী।
.
কিছু নর্দমা থেকে উঠে আসা কুলাঙ্গার সকল নারীকে যাত্রাগানের নর্তকীর মতো মনে করে। রাস্তায় নারী দেখলে জিহবায় পানি আসে কামাতুরাভাব জেগে ওঠে। এর জঘন্যতম উদাহরণ বাসযাত্রী দিল্লির মেডিকেল ছাত্রী নির্ভয়া আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কুর্মিটোলায় রাস্তা ভুলে হায়েনার কবলে পড়া। এদের নেই মা কিংবা বোন। এদের দ্রুতবিচার প্রয়োজন এবং এর পরিনাম যেন প্রচার হয়।
.
করোনার ছোবল শক্তি সমন্ধে কারো ধারনা ছিল না। সচেতনতা সত্ত্বেও ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। একজনের অবহেলায় আরেকজন কবলিত। দেশে চলছে লকডাউন। বেড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্দশা। কষ্ট করছে দুঃখিনী মা যার হাঁড়িতে চাল নেই, দীর্ঘ রাস্তা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিচ্ছে অসহায় পথিক। প্রবাসী ভাই বোনদের সজন হারানো বেদনায় পৃথিবী এখন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। এমন সময়ে আমরা মানবতার হাত বাড়িয়ে দেই। করোনাকে ঘৃণা করি, নিরপরাধ কাউকে নয়।
.
.
.
.

কৃষ্ট মোহন সিংহ

লেখকঃ প্রভাষক, সরকারি শহীদ আকবর আলী বিজ্ঞান প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়, বালিয়াডাঙ্গী, ঠাকুরগাঁও।           
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জুঁই জেসমিনের গল্প ‘সেও শরীর খুঁজে’

জুঁই জেসমিন :: এমিলিয়া তুমুল দৌড়াতে থাকে, জীবন বাঁচাতে নয়-  শরীর বাঁচাতে! ...