ব্রেকিং নিউজ

দেশের জন্য বাঙালিরা যে কোন যুদ্ধেই জয়লাভ করবে: রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম

রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম
বাংলা প্রেস, নিউ ইয়র্ক থেকে :: একাত্তরে পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করে বীর বাঙালিরা যেভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল আবারো দেশের কোন বিপদ আসলে বাঙালিরা সেটাও মোকাবেলা করে জয়লাভ করবে বলে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র সফররত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি নির্বাচনী এলাকার সাংসদ মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম।
তিনি ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ রাতেই চট্টগ্রামে কার্যত বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। তাঁর আদেশ পেয়েই সীমান্ত ফাঁড়িতে বাঙালি সৈন্যরা অবাঙালি সিপাহিদের নিরস্ত্র ও নিষ্ক্রিয় করে চট্টগ্রামে এসে প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগদানের জন্যে প্রস্তুত হয়। স্থানীয় সময় রবিবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের মিডলটাউনে বাংলাদেশ সোসাইটি অব কানেকটিকাট আয়োজিত মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষনে এসব কথা বলেন তিনি।
সোসাইটির বোর্ড অব মেম্বার চেয়ারম্যান মীর সাব্বির আহমেদের সভাপতিত্বে এবং ডেভিড স্বপন রোজারিও’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে চট্টগ্রামে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে প্রেষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেনা মোতায়েন পরিস্থিতি দেখে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তিনি স্বাধীনতার প্রয়োজনে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তদনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্যসহ প্রশ্ন উত্তর পর্বে অংশ নেন ডেভিড স্বপন রোজারিও, মীর আজম, হালিম আকবর, আনোয়ার হোসেন হিমু, মোল্লা বাহাউদ্দিন পিয়াল, আনোয়ার মন্ডল, আনোয়ার মাহমুদ ও সৈয়দ শাহাজ ইসলাম  প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শেষে সোসাইটির কর্মকর্তারা সম্মাননা স্বরুপ তাঁর হাতে একটি ক্রেষ্ট তুলে দেন।
রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম বলেন, তাঁর অধীনস্থ বাঙালি অফিসার ও সিপাহিদের সাথে আলোচনা করে কর্তব্য স্থির করেন, এবং সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের সাথে গোপন বৈঠক করে প্রয়োজনে বিদ্রোহের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন। এম. আর. চৌধুরী ও মেজর জিয়াউর রহমানের অনুরোধে সেদিন তিনি তাদের চট্টগ্রামে আসার নির্দেশ বাতিল করেছিলেন। কিন্তু পরদিন ২৫শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য অনুধাবন করে তিনি সক্রিয় বিদ্রোহ শুরু করেন এবং ইপিআরের অবাঙালি সৈন্য ও অফিসারদের জীবিত অবস্থায় বন্দী করে রেলওয়ে হিলে তাঁর হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেন।
মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, তাঁর অধীনে ন্যস্ত সৈনিকরা এম. ভি. সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল চৌধুরী ও মেজর জিয়াউর রহমান সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় ২০ বালুচ রেজিমেন্ট-এর সৈন্যরা চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার-এর সহস্রাধিক বাঙালি সৈনিক ও অফিসারকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর বাঙালি অফিসার ও সৈনিকরা ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে কালুরঘাট ব্রিজের দিকে অবস্থান নেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে চট্টগ্রামের অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আগত তাঁর অধীনস্থ ইপিআর সৈনিকদের মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন রফিকের বাহিনীর সাথে যোগদানে বাধা দেন এবং ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকদের সাথে কালুরঘাট ব্রিজ এলাকায় অবস্থান নিতে বাধ্য করেন। এ কারণে তিনি সেনাবলের অভাবে চট্টগ্রামে যথাযথ দখল বজায় রাখতে ব্যর্থ হন এবং এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রচুর ক্ষতি সাধন করে পশ্চাদপসরণ করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ করেন এবং ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তাঁর হেডকোয়ার্টার সীমান্তের ওপারে হরিণায় স্থাপন করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে এখান থেকেই তিনি ১ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে চট্টগ্রাম এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ন্যস্ত হন।১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে তচট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তিনিপাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
সামরিক শাসক এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯০ সালে দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি মন্ত্রী পদমর্যদায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ শাহরাস্তি নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুর-৫ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাজিগঞ্জ শাহরাস্তি এলাকা থেকে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে একই আসন থেকে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
রফিকুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি থানার নাওড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আশরাফ উল্লাহ এবং মায়ের নাম রহিমা বেগম। তিন ভাই ছয় বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার বড়। বাবার চাকুরীসূত্রে শৈশবকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেয়ে থাকতে হয়েছে যার ফলে পড়াশুনা করতে হয় ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটা স্কুলে। নিজ গ্রাম নাওড়াতেই প্রাথমিক স্কুলে হাতেখড়ি। পরে লেখাপড়া করেন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরের পালং, কুমিল্লার চান্দিনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ১৯৫৯ সালে অন্নদা মডেল হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৮১ সালে তিনি আমেরিকার হার্ভাড বিজনেস স্কুলে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম কোর্স সম্পন্ন করেন।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ

সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার :: প্রখ্যাত লেখক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ আর নেই ...