তেরশ্রী গণহত্যা দিবস এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

তেরশ্রী শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ

পংকজ পাল : ২২ নভেম্বর ’তেরশ্রী গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ বাহিনীর ঘাতকরা তেরশ্রীতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেই দিন বর্বরোচিত হামলায় তেরশ্রী গ্রামের জমিদার ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষসহ ৪৩ জন কৃতিসন্তান ও নিরীহ গ্রামবাসীকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং পরে গুলি করে হত্যা করা হয়।

কেন এই হত্যাযজ্ঞ? সেজন্য আমাদের একটু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে হবে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে প্রাচীনকাল থেকেই তেরশ্রী এলাকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৪২ সালের পর ঢাকা শহরের বাইরে দুটি কলেজ ছিল। তার একটি মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ, অপরটি মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তেরশ্রীতে ’তেরশ্রী কলেজ। পরে নানা ঘটনার মাধ্যমে তেরশ্রী কলেজ মানিকগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমানে ’সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ নামে জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সমহিমায় উজ্জ্বল।

দুইশত বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন শোষণের পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম হয়। পাক শাসকগোষ্ঠী একই কায়দায় বাঙালিদের ভাষা, জাতিগত শোষণ ও বৈষম্য অব্যাহত রাখে। পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে দেশব্যাপী যে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে ওঠে তার প্রভাব ঢাকার বাইরে মানিকগঞ্জেও এসে পড়ে। মানিকগঞ্জে গঠিত হয় মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ’মাতৃভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ। মূলত মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এপার ওপার বাংলার বিপ্লবী পুরুষ ডা. এম.এন নন্দী, তাঁর ভাই প্রমথ নাথ নন্দী ও আফসার উদ্দিন মাস্টার এর প্রেরণায় আন্দোলন ক্রমশ ত্বরান্বিত হতে থাকে। মানিকগঞ্জ ’মাতৃভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ এর মাধ্যমে পরে জেলার সকল প্রগতিশীল ছাত্র ও ব্যক্তি আন্দোলনে যোগ দেয়।

১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানী পুলিশ প্রশাসন তেরশ্রী কে.এন. ইনষ্টিটিউশন ৪ (চার) শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে।

তেরশ্রী অঞ্চলের কৃষক জনগণের মাধ্যমে ঘিওর হাটে ইজারদারদের বিরুদ্ধে এক সময় গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৯৬৯ এর গণআন্দোলনে তেরশ্রী অঞ্চলের লোকজন ঢাকার গভর্নর সোলায়মান খানের বাসভবন ঘেরাও করে পায়ে হেঁটে গিয়ে।

ব্রিটিশ পুলিশের কাছে তেরশ্রী ছিল রেড এরিয়া অর্থাৎ কমিউনিষ্ট এলাকা। কারণ তেরশ্রী গ্রামেই জন্ম নিয়েছেন-বাংলার অসাম্প্রদায়িক মানবদরদী ডা. এম.এন. নন্দী (মন্মথ নন্দী), জন্ম নিয়েছেন চিরকুমার আমৃত্যু বিপ্লবী অধ্যক্ষ পমথ নাথ নন্দী যিনি রেড নন্দী হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। মূলত তাঁর প্রচেষ্টাতেই জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, ডা. এম.এন. নন্দী, আফসার উদ্দিন মাস্টার, আব্দুর রহমান ঠাকুর, আ. হাকিম, মিরান মাস্টার, ডা. মোবারক আলী, মন্তোষ কুমার পাল, বিজয় চন্দ্র শীল প্রমুখের উদ্যোগে এবং সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণে মেহনতি মানুষের মুক্তি আন্দোলন শুরু হয়। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় তেরশ্রী গ্রাম।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ এর ভাষণের পরশ লাগে তেরশ্রী গ্রামেও। বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানে আব্দুর রহমান ঠাকুর, আফছার উদ্দিন মাস্টার, আব্দুল হাকিম, আব্দুল মতিন প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ সাল, শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ বাঙালির প্রাণ, ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় প্রিয় স্বাধীনতা। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী, মিলিটারী, তাদের সহযোগী শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্ সারাদেশে ব্যাপক ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। হত্যা, খুন, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ-অত্যাচারের যত রকম পন্থা আছে, তারা তা অবলম্বন করে, বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিঃচিহ্ন করার জন্য। সারা বাংলাদেশের মত পর্যায়ক্রমে এই মানবতাবিরোধী অপরাধ যজ্ঞের শিকার হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোক বর্তিকা গ্রাম তেরশ্রী।

১৯৭১ এর ২১ নভেম্বর রাতের অন্ধকার শেষে ২২ তারিখের দিনের আলোর আশায় যখন রাতের শেষ প্রহর আর সোনালী সূর্য উদিত হওয়ার রক্তিম আভা পূর্ব আকাশে উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তেমন সময়ে ঘিওর থেকে পাকহানাদার আর তাদের সহযোগিরা আক্রমণ চালায় তেরশ্রী গ্রামের উপর। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে হায়েনার দল ঝাপিয়ে পড়ে সেন পাড়ার ঘুমন্ত মানুষের উপর। ঘর-বাড়িতে আগুন, প্রচণ্ড গুলির শব্দ, চিৎকার আর আর্তনাদে পরিবেশ ভারী হয়ে যায়। আতংকিত গ্রামবাসী প্রাণভয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। আত্মরক্ষাও করতে পারে না তারা। হানাদার বাহিনী যাকে যেখানে পেয়েছে তাকে সেখানেই হত্যা করেছে। বাড়িতে, রাস্তায়, ঝোপে-ঝাড়ে, শিশু, নারী ও বৃদ্ধা, যুবকসহ সবাইকে হত্যা করেছে। আহাজারী আর আর্তচিৎকারে তেরশ্রী গ্রাম ডুবে যায় নারকীয় অবস্থার মধ্যে। পাক বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগিরা দিনের আলো ফুটলে, তাদের মুখে ’মুখোশ পড়ে নেয়। ভবিষ্যতে সুবিধা মতো রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি তাদের মাথায় ছিল বলে।

অনেক লোক কোনমতে পালিয়ে বাঁচলেও, সেদিন ৪৩ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছিল হায়েনার হাতে নৃসংশভাবে। তেরশ্রী এলাকার উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে তারা হত্যা করে পৈশাচিকভাবে। জমিদার বাবুকে তাঁর শয়ন কক্ষ থেকে বের করে লেপ-কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে। এ সময় তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান এগিয়ে যান ঘটনাস্থলে। তিনি জানতে চান জমিদার বাবুকে হত্যা করা হচ্ছে কেন? হায়েনার দল তখন অধ্যক্ষ সাহেবকে ধরে নিয়ে আসে তেরশ্রী বাজারে এবং বেয়নেট চার্জ করে। পরক্ষনেই তাঁকে তাঁর বাসায় নিয়ে শিশু পুত্র এবং স্ত্রীর সামনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তাঁর স্ত্রী বাসার উত্তর পাশের পুকুরে লাফিয়ে পড়ে কোন রকমে প্রাণ বাঁচান।

ঐ দিন নিহত হওয়ার আগে সাধুচরন দাস, যিনি হানাদার বাহিনী রাইফেল কেড়ে নিয়ে এ জুলুমের প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শতাধিক অত্যাচারী দলের কাছে তাঁকেও প্রাণ দিতে হয়। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত হানাদার বাহিনী এবং দোসররা হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ সম্পন্ন করে ফিরে যায় ঘিওরে।

লাশের গ্রামে পরিনত হয় পুরো তেরশ্রী গ্রাম। এই হত্যাযজ্ঞ যারা দেখেছেন তারাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। পরে স্থানীয় হিন্দু মুসলামন মিলে লাশগুলোকে কবর দেয় গণ-কবরের মত।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে মনে, কেনই বা বেছে বেছে তেরশ্রীকে হানাদাররা টার্গেট করেছিল। এর উত্তর আগেই পাওয়া যায়, অন্ধকারের মধ্যেও আলোক বর্তিকা ছিল তেরশ্রী গ্রাম। কারণ তৎকালীন তেরশ্রী ছিল শিক্ষানুরাগী, বাম প্রগতিশীল তথা শিক্ষা সংস্কৃতিতে শীর্ষে। জেলার প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ অনেক গুনী জনের জন্ম তেরশ্রীতে। আবার ড. মো. শহিদুল্লাহ্, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, সরদার ফজলুল করিম, ড. মোতাহার হোসেন, কবি মনসুর উদ্দিনসহ বহু মনীষীদের আগমনে শ্রী বৃদ্ধি পেয়েছিল তেরশ্রীর।

তাছাড়াও ১৯৭১ সালে আশে পাশের অনেক এলাকা থেকে বহু লোক আশ্রয় নিয়েছিল তেরশ্রী গ্রামে। তেরশ্রী ছিল অসহায়, নিরূপায় জনগণের মায়ের কোলের মত নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তেরশ্রীতে গড়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। এসব কারণ ছাড়াও দোসররা  তেরশ্রীর হত্যাকান্ডটি ঘটিয়ে ছিল আরও বিশেষ কারণে, কারণটি-বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত করতে।

একসময় অর্জিত হয় প্রিয় স্বাধীনতা। ২২ নভেম্বর তেরশ্রী গণতহ্যা দিবসের ভয়াল স্মৃতিকে স্মরণ করার জন্য ১৯৯৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্ব-পক্ষের রাজনৈতিক দল, স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণের সমন্বয়ে গঠিত হয় ’শহীদ স্মৃতি পরিষদ। শহিদ জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর বিধবা পত্নী গায়ত্রী দেবী চৌধুরানী কর্তৃক একটি স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর।

১৯৯৫ সালের  ১৪ ডিসেম্বর তেরশ্রীতে আয়োজন করা হয় একটি স্মৃতিচারণ সভার। তেরশ্রী কলেজ মাঠ প্রাঙ্গণে তৈরি করা হয় শহীদ অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান মঞ্চ। প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র তেরশ্রীতে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নিমার্ণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। ১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রশিকার নির্বাহী পরিচালক ডা. কাজী ফারুক আহমদ স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচন করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোনটিই নির্মিত হয়নি।

১৯৯৫ সালে মানিকগঞ্জে আনোয়ার চৌধুরী, ইকবাল হোসেন, আজহারুল ইসলাম আরজুসহ বেশ কয়েজন নেতৃবর্গ তেরশ্রীতে আসেন। তাদের নেতৃত্বে এবং তেরশ্রীর সর্বস্তরের লোকজনের সহযোগিতায় ’২২ নভেম্বর ঘটনাকে প্রতি বছর স্মরণ করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে আব্দুল হাকিম মাস্টারকে সভাপতি, আব্দুর রহমান ঠাকুর, জমিদারপুত্র সোমেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরী, মোশারফ হোসেন মানিকসহ তিন জনকে সহ-সভাপতি, আফতাব উদ্দিন খন্দকারকে সাধারণ সম্পাদক, আমিরুল ইসলামকে সহ-সাধারণ সম্পাদক, মন্তোষ কুমার পালকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্য বিশিষ্ট ’তেরশ্রী শহীদ স্মরণ কমিটি গঠিত হয়। উপদেষ্টা করা হয় ব্রিগেডিয়ার আবুল হোসেন, ড. কছিম্দ্দুন, ডা. আব্দুস সালামসহ মানিকগঞ্জ শহরের বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দকে এবং ১৯৯৬ সালে ঐ বছর থেকেই মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলাকে পার্ট-১ এবং তেরশ্রী বিজয় মেলাকে পার্ট-২ করে উদযাপন করা হয়।

এক সময় মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক কর্তৃক শহীদ অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান-এর সিধুনগরস্থ গোরস্থানের কবরটি বাঁধাই করে দেওয়া হয়।

সময়ের আবর্তনে শহীদ স্মরণ কমিটির অনেক রদ বদল করা  হয়েছে। শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য শহীদ স্মরণ কমিটি, ব্র্যাক গণকেন্দ্র পাঠাগার, তেরশ্রী কলেজ, তেরশ্রী কে.এন. ইনষ্টিটিউশন এবং প্রগতিশীল জনগণের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে শহীদ স্মরণে আলোচনা সভা, মৌন মিছিল ও পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয়। তেরশ্রী গণহত্যা দিবসটি নিয়ে বিটিভি সহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, বিভিন্ন সংবাদ-প্রতিবেদন প্রচার করে থাকে। ২০১০ সালে ২২ নভেম্বর তেরশ্রী গণহত্যা দিবস স্বরণে রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের তৎকালীন পরিচালক ও মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের মাননীয় পি.পি. জনাব এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম এর উদ্যোগে এবং শহীদ স্মরণ কমিটির সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের তত্ত্বাবধানে তেরশ্রীর সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহনে মৌন মিছিল, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জেলা প্রশাসক মুন্সী শাহাবুদ্দীন আহমেদ, রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের তৎকালীন পরিচালক ও মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের মাননীয় পি.পি. জনাব এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, ঘিওর উপজেলার নির্বাহী অফিসার রাজা মো. আব্দুল হাই, ঘিওর থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের  ডেপুটি কমান্ডার মো. আবুল হোসেনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, শহীদ পরিবারের সদস্য ও সর্বস্তরের জনগণ উপস্থিত ছিলেন। তখন এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তেরশ্রীতে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের জোড়ালো দাবি ওঠে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় ২২ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে সঠিক ভাবে কোন ইতিহাস রচিত হয়নি আজ পর্যন্ত। স্থানীয় ভাবে ৪৩ জনের মধ্যে ৩৭ জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন- জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান, স্থানীয় স্কুলের দপ্তরী মাখন চন্দ্র সরকার, যাদব চন্দ্র দত্ত, তাঁর পুত্র মাধব চন্দ্র দত্ত, সাধুচরণ দাস, শ্যম লাল সূত্রধর, নিতাই চন্দ্র দাস, জগদীশ চন্দ্র দাস, সুধন্য চন্দ্র দাস, সুরেন্দ্র নাথ দাস, প্রাণ নাথ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, সাধন কুমার সরকার, যোগেশ চন্দ্র দাস, রামচরণ সূত্রধর, রাধাবল্লভ নাগ, জ্ঞানেন্দ্র ঘোষ, যোগেশ চন্দ্র সূত্রধর, মো. কছিম উদ্দিন, মো. গেদা মিয়া, একলাছ মোল্লা, শ্যামা প্রসাদ নাগ, নারায়ন চন্দ্র সূত্রধর, শচীন্দ্রনাথ গোস্বামী, যোগেশ দত্ত, গৌড় চন্দ্র দাস, মো. তফিল উদ্দিন, মনীন্দ্র চন্দ্র দাস, মো. তাজু উদ্দিন, রমজান আলী, দেলবর আলী, ওয়াজ উদ্দিন, শ্যামল সূত্রধর, বিপ্লব সরকার, মহেন্দ্র নাথ দাস, শ্রীমন্ত কুমার দাস।

প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও এসেছে ২২ নভেম্বর। আসবে চিরকাল। ৪৩ জন শহিদ ঘুমিয়ে রয়েছে তেরশ্রীতেই। তাঁদের স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে রয়েছে কেউ কেউ। স্মৃতির মনিকোঠায় হাতড়িয়ে তারা মেলাতে পারে না অনেক কিছুই। স্বজনহারা লোকগুলো স্বপ্ন দেখে তেরশ্রীর ইতিহাস রচিত হবে, সেখানে ধ্রুব তারার মত জ্বলজ্বল করবে তাদের প্রিয় লোকটির স্মৃতি। তেরশ্রী শহীদ স্মৃতি কমিটিসহ ও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বান্ধব সরকার এবং প্রগতিশীল অনেকেরই উদ্যোগে শহীদ স্মৃতি স্মরণে ঘিওর-দৌলতপুর সড়কের পাশে তেরশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের জায়গাটিতে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এর অধীনে শহীদদের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার্থে শহিদ স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত হয়েছে ২৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে। ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।  ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধকালীন এম,সি,এ ও কমান্ডার ও প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া, মানিকগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম আনোয়ারুল হক।

২০১২ সালের ১৩ নভেম্বর শুভ  উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম। সেই সাথে উন্মোচিত হয়েছে তেরশ্রীবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

প্রতি বছর ২২ নভেম্বর তেরশ্রী গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এ এম নাইমুর রহমান দুর্জয় মহোদয়ের নেতৃত্বে দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয় এবং শহিদ স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

পাক হানাদার বাহিনী ৪৩ জনকে হত্যা করেছিল, কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করতে পারেনি। নতুন প্রজন্মকে হৃদয় বিদারক ঐতিহাসিক সেই ঘটনাটি জানতে ও জানাতে হবে। শহিদদের পূণ্য স্মৃতি ধারণ করতে হবে হৃদয়ে। তেরশ্রীবাসীর হৃদয় গোলাপ প্রস্ফুটিত করে অপেক্ষায় আছে ’শহিদ স্মরণে নির্মিত স্মৃতি স্তম্ভে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য

 

 

লেখক : গল্পকার ও সাংস্কৃতিকর্মী ।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মূনীরুজ্জামান আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার :: দৈনিক সংবাদ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মূনীরুজ্জামান আর নেই। ...