তিস্তার বুকে রাস্তা: স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ

আসাদুজ্জামান সাজু, লালমনিরহাট প্রতিনিধি: তিস্তায় পানি নেই। এ নিয়ে দেশজুড়ে চলছে শোরগোল। সেই উত্তাপের আঁচে সরগরম রাজনৈতিক ময়দান। কেউ করছে লংমার্চ, কেউ বা সমাবেশ। অথচ তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে দুই মাস ধরে নদীর বুক চিরে যে রাস্তা বানানো হয়েছে তা যেন কারো নজরেই পড়েনি। রাস্তা বানিয়ে মুমূর্ষু তিস্তার টুঁটি চেপে ধরায় যতটুকু পানি আছে তাও স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে না।

লালমনিরহাটের সঙ্গে রংপুরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য নির্মাণাধীন দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঢাকার নাভানা কন্সট্রাকশন লিমিটেড এ রাস্তা বানিয়েছে। তাদের সঙ্গে হাত লাগিয়েছেন কাকিনা-মহিপুর খেয়াঘাটের ইজারাদার লুলু মিয়া। রাস্তা ব্যবহার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুর মালামাল আনা-নেওয়া করছে। আর ঘাটের ইজারাদার নৌকা চালানো বন্ধ করে দিয়েছে। তার বদলে ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ ও যানবাহন থেকে টোল আদায় করছে।

প্রায় ৮০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে ও প্রায় ১০ মিটার প্রস্থের রাস্তাটি বানানো হয়েছে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ও রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর ঘাট এলাকায়। দ্বিতীয় তিস্তা সড়ক সেতুর দৈর্ঘ্য ৮৫০ মিটার। ফুটপাতসহ প্রস্ত  ৯ দশমিক ৬ মিটার। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১শত ২১ কোটি টাকা। ২০১২ সালের মে মাসে সেতুর কাজ শুরু হয়েছে। শেষ হওয়ার কথা ছিল এ বছরের জুনে।

তবে এখন পর্যন্ত কেবল অর্ধেক কাজ হয়েছে। নিজেদের ‘সুবিধার’ কারণেই এ রাস্তা বানানো হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

সরে জমিন ঘুরে দেখা গেছে, সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ঘাটের ইজারাদার মিলে মেশিন দিয়ে নদী থেকে বালু তুলে তার সঙ্গে ইটের টুকরো মিশিয়ে রাস্তাটি নির্মাণ করেছে। নৌকার বদলে এখন লোকজন হেঁটে রাস্তা পারাপার হচ্ছে। কার, মাইক্রোবাস, ট্রাকের মতো যানও চলাচল করছে রাস্তা ধরে। তাদের কাছ থেকে টোল নিচ্ছেন ঘাটের ইজারাদার। পথচারীপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা, মোটরসাইকেলপ্রতি ৩০ টাকা। রাস্তা ব্যবহার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামাল আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। রাস্তার এক পাশে বসানো হয়েছে লোহার মোটা পাইপ। এর মাধ্যমে সিমেন্ট-পাথরের মিশ্রণ এক পাশ থেকে অন্য পাশে নেওয়া হচ্ছে। রাস্তার উভয় পাশে নদীতে কোমর সমান পানি আছে।

তবে তা স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারছে না। পানিপ্রবাহের জন্য রাস্তার নিচে কয়েকটি পাইপ বসানো হলেও তা দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি চলাচল করতে পারছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়ক সেতু নির্মাণ স্থলে রাস্তা তৈরির কারণে এর আরো ভাটিতে থাকা লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা ও রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী প্রথম তিস্তা সড়ক সেতু ও তিস্তা রেল সেতু এলাকায় নদীটি একেবারে শুকিয়ে গেছে।

তিস্তা ব্যারাজ থেকে নির্মাণাধীন দ্বিতীয় সেতু এলাকা দিয়ে ওই দুটি সেতু পেরিয়েই নদীটি গিয়ে মিশেছে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে। তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে নদীতে বিভিন্ন জায়গায় যে পানি আছে তা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে কাকিনা-মহিপুর এলাকায়।

নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার প্রবীর কুমার বিশ্বাস রাস্তা তৈরির কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন, রাস্তার নিচে কয়েকটি পাইপ দিয়ে পানিপ্রবাহ ঠিক রেখেছি। আমরা প্রবাহ বন্ধ করিনি।

ঘাটের ইজারাদার লুলু মিয়া বলেন, রাস্তা তৈরি করতে নদী থেকে মেশিনে বালু তুলতে আমরা নাভানাকে তেলের টাকা দিয়েছি। নদীতে রাস্তা তৈরি ঠিক হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।

ঘাটের টোল আদায়ে লুলু মিয়ার নিয়োগ করা লোক গোলাম রব্বানী বলেন, মানুষ রাস্তা দিয়ে চলুক,  আর নৌকা দিয়ে নদী পার হোক,  আমরা টোল নিতেই পারি। কারণ ঘাটটি আমরা সরকারের কাছ থেকে বৈধভাবে ইজারা নিয়েছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখন তিস্তার কোনো প্রাণ নেই। তাই কাজের প্রয়োজনে রাস্তা হয়েছে। যখন নদীতে প্রচুর পানি আসবে তখন এটি হয়তো আর থাকবে না।

সেতু নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান রাস্তার বিষয়ে বলেন, নির্মাণকাজের মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য রাস্তাটি তৈরি করা হয়েছে। নীতিমালার মধ্যেই এটা আছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ড. এম এম মতিন সাংবাদিকদের বলেন, এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। নদীর ওপর রাস্তা তৈরি সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেন বাংলাদেশ সরকারও এমন কাজ করতে পারে না।

রংপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদ আহমেদের নজরে আনা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ফরিদ আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করুন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিবেশ কর্মী ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করা যাবে না। যদি এটা করা হয়ে থাকে তাহলে সরকারের উচিত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামূল হক সাংবাদিকদের বলেন, অনেক সময় সাময়িক রাস্তা তৈরি করতে গিয়ে নদীকে বেঁধে ফেলা হয়। এটি নদীর পানি প্রবাহের জন্য ক্ষতিকর।

প্রসঙ্গত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে তিস্তা। তিস্তা ব্যারাজের নিচ দিয়ে লালমনিরহাট হয়ে নদীটি মিলিত হয়েছে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে। নদীটি লালমনিরহাট জেলাকে রংপুর ও নীলফামারী জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা

শিবগঞ্জের জঙ্গি আস্তানা থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার

স্টাফ রিপোর্টার :: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবপুর উপজেলার শিবনগর গ্রামে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি ...