ব্রেকিং নিউজ

তাহমিনা কোরাইশী’র গল্প ‘নাগরদোলা’

তাহমিনা কোরাইশী

তাহমিনা কোরাইশী :: মালিহা ভেবে পায় না কি করে সম্ভব দুই দুটো মাস ঘরে বসে কাটনো। কী এমন হয়েছে অনিকের! কারো সাথে কথা বলবে না দেখা করবে না। সেল ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। এই তো দু’মাস আগে ওর বাবার মৃত্যু হয়েছে। কষ্টবোধ তো আছেই। তাই বলে জীবনের সব অনুষঙ্গ স্থবির করা যায় কি? এ কেমন দুঃখ-বিলাস! মালিহা বুঝতে পারছে না। যেদিন ওর বাবা মারা যায় ঐ দিন ওর বাসায় সব বন্ধুরা গেছে।

মালিহাও বাদ পড়েনি। এর পর থেকে বাইরে বেরুনো বাদ। কারো সাথে কথা বলা বাদ। সেলফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে ইদানিং অনিক।
মালিহার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ওর অপমান বোধটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠছে। আজ বাদে কাল ওরা বিয়ের পিঁড়িতে বসবে। নিজেদের ইচ্ছের কুসুম নিজেরাই ফোটাবে। আর এই মুহ‚র্তে এমন ভাবে বিভাজন! ভাবতেই পারছে না মালিহা। দুঃখ হওয়াটাই স্বাভাবিক। বাবা-মায়ের স্থান কেউ পূরণ করতে পারে না। এমন নয় যে একেবারে পানিতে পরে গেছে। অনিকের মা এডফার্ম-এর পরিচালক। বাবারও ভালো ব্যবসা ছিল। মালিহা যতদূর জানে অর্থ কষ্ট নেই ওদের। ছোট একটা ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ছোট্ট সংসার। এর বেশি কী চাই? ওর সমস্যাটা কোথায়? এমনভাবে দিনের পর দিন গৃহবন্দি রেখেছে নিজেকে। ওতো মেয়ে নয় মায়ের কথায় নিজেকে গৃহে স্থাপন করেছে। মালিহারা দুটিতে মিলে কত যে প্লান প্রোগ্রাম করেছে।

ম্যাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে চাকরির এপ্লাই করেছে। যদিও পড়ালেখার শেষ নেই তবুও যতটুকু না করলে চাকরির বাজার মন্দা ততটুকু ওরা শেষ করেছে। চাকরি পেয়ে বিয়ের ব্যাপারে ভাববে মালিহা অনিক। এমতাস্থায় এ কিসের আলামত মালিহা ভেবে পায় না। অনিক কেনো ওকে এভোয়েড করছে। আবলতাবল কত কথাই ওর মাথায় বাসা বেঁধে চলেছে। কোন বন্ধু-বান্ধবই খোঁজ-খবর আনতে পারছে না অনিকের। হঠাৎ মালিহার মনে পড়ে যায় রাব্বির কথা। ওদেরই গ্র“পের। কিন্তু সবার আগে রাব্বির কপাল খুলেছে। দুর্মূল্যের বাজারে একটা ভালো চাকরি পেয়েছে। পোস্টিং অবশ্য সিলেটে। তাতে কি? এইতো বয়স কষ্ট করে কেষ্টর খোঁজ করার। রাব্বি অবশ্য অনিকের একেবারে বাল্যবন্ধু। ছোট্ট থেকে একসাথে বেড়ে ওঠেছে। অনিক, রাব্বি, মালিহা, সেঁতুলী, ঝুমুর এরা ভার্সিটিতে একসাথে পড়াশোনা করে বেরিয়েছে।

মালিহা রাব্বির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। ওকে সব কথা খুলে বলে। এখন মালিহার কী করা উচিত বন্ধুরা যার যার মত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাকরির খোঁজে, ব্যবসায়ের খোঁজে। কেউ তো কারো জন্য বসে নেই। মালিহার মা-বাবা চাইছেন মেয়ের বিয়ে দিতে। এর মধ্যে যদি একটা চাকরির অফার পেয়ে যায় তবে বিয়ে আটকে রাখতে পারবে। ওর কথার একটু দাম বাড়বে। চিন্তায় চিন্তায় মালিহার নাওয়া খাওয়া হারাম হয়ে গেছে। দেবদূতের মতো রাব্বি এলো দুই দিনের জন্য। শুক্র আর শনি করে। নতুন চাকরি ছুটির কথা বলার সাহস না পাওয়াতে স্টেশন লিভ করার পার্মিশন নিয়ে এলো ঢাকায় মালিহার কাছে। হন্তদন্ত হয়ে মালিহাদের বাড়িতে। মালিহার কাছে সব ঘটনা শুনে বীরদর্পে রাব্বি বলল- এ কোন ব্যাপার হলো? তুই এই জন্য কেঁদে ধে একেবারে একাকার হয়ে গেছিস? এখনই বেরিয়ে পড়ি তোর সমস্যা সমাধানে।

মালিহা বিষম্ন চোখে রব্বিকে বলে—এতোটাই সহজ করে দেখছিস ব্যাপারটা? দুটো মাস যে ছেলে একদিনের জন্য বাসা ছেড়ে বাইরে যায়নি। কারো সাথে কথাও বলে নি তার ব্যাপারে এতটা পজেটিভ কী করে হলি?

রাব্বি চঞ্চল স্বভাবের আমুদে ছেলে। বেশ হিউমার আছে ওর মধ্যে—বলে শোন শোন রাব্বি পারে না এমন কোন কাজ এখনও জন্মায়নি। বুঝেছিস। এক নিমেষে তোর কাজ হয়ে যাবে, এত চিন্তা করিস না তো। তুই সঠিক মানুষটিকে ডেকেছিস সঠিক সময়। আরে শোন—দেখ না এর প্রমাণ তোদের সবার আগে আমিই চাকরিটা বাগিয়ে নিলাম। হাসতে হাসতে আবার বলে—চল বেরিয়ে পড়ি গুলশানে কেএফসিতে তুই একটু অপেক্ষা করবি। আমি ওর বাসা থেকে সোনার চাঁদুকে ধরে আনবো।

মালিহা—এতই সহজ তোর কাছে মনে হচ্ছে?
রাব্বি—আরে চেষ্টা তো করি। তোর কাছে সেলফোন আছে না। দেরি হলে বা সমস্যা হলে বলবো। গুলশানেই কেএফসির পাশেই ওদের বাড়ি। সময় বেশি লাগবে না। তোর খিদা পেলে অর্ডার দিয়ে খাওয়া আরম্ভ করে দিস। ভয় পাস না বিলটা আমি পে-করব। তোরা এখনও বেকার। যখন চাকরি করবি তখন দেনা পাওনা শোধ করিস। মালিহার মুখে হাসি। অনেক কাল পরে যেনো হাসতে পারছে। রাব্বিকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে।

ওরা দুটিতে বেরিয়ে পড়ে গুলশানের উদ্দেশ্যে। ধানমণ্ডি থেকে যেতে প্রায় আধাঘণ্টা লেগে গেলো। মালিহা ফ্রাইড চিকেন তিনজনের জন্য অর্ডার দিয়েই বসলো এক কর্নারে।

সময় গড়িয়ে যায় মালিহার উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। কী হলো কী হতে পারে। এক একটা মুহ‚র্ত একটা দিনের সমান হয়ে ওঠে মালিহার কাছে। অবশেষে রাব্বির জয় হলো। সাথে করে নিয়ে এসেছে কে সে? একি অনিক? কী হাল হয়েছে ওর? একটা বন্যমানুষের মতো। চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে গেছে।

উশকোখুশকো চুল। দাড়িতে মুখ ঢেকে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। এলোমেলো জামাকাপড় পায়ে স্যান্ডেল।
মালিহার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কাছে আসতেই মালিহা অনিককে জড়িয়ে ধরে। কী হয়েছে তোর? কাঁদতে আরম্ভ করে মালিহা। অনিক বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন নয় কোনো ব্যাপারে। নির্বিকারভাবে তাকিয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি কেমন টালুমালু। কি যেনো খুঁজছে। কি যেনো দেখার চেষ্টা করছে। ওই জানে।

রাব্বি পরিস্থিতি ওদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বলল, তোরা বস। আমি একটু আসি। চোখের ইশারায় মালিহাকে বলল—কাছেই আছি অন্য টেবিলে।
মালিহা তবুও একটু স্বস্তি পেলো রাব্বি কাছেই আছে জেনে। দু’জনে পাশাপাশি বসে আছে। অনিকের মুখে কোনো শব্দ নেই। দৃষ্টি ঘুরছে টেবিলে রাখা প্রতিটি জিনিসের উপর—চামচ, গ্লাস, পানি, ফ্লাওয়ার ভাস, তারপর টেবিলের নিচে নিজের পায়ের দিকে। পায়ের উপর নিজের পায়ের আঙুল দিয়ে ঘষছে কিছু একটা বলতে চাইছে করতে চাইছে ওর খুব অস্বস্তি লাগছে বসে থাকতে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু মালিহার কিই বা করার আছে। তবুও নিজেকে সামাল দিয়ে মালিহাই আগ বাড়িয়ে ওর সাথে আন্তরিক হওয়ার চেষ্টা করছে। এ যেনো চেনা মানুষের অচেনা রূপ। বদলে যাওয়া মানুষটাকে কীভাবে আবার সহজ করে পাবে ভাবে মালিহা। কী কথা বলবে? মালিহা চোখের জল মুছে ফেলে। বলে—কিরে, কিছু খাবি? খিদে পেয়েছে? অবশ্য আগেই অর্ডার দিয়ে রেখেছি তোর প্রিয় খাবার। মালিহার এই কথাতে মুখের কোণে হাসির রেখা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বোঝা গেলো সে খেতে চাইছে।

মালিহা খাবার এনে দিল সামনে। ওদের দু’জনের খাবার ফ্রাইড চিকেন সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই সস, কোল্ডস্লো সবই আছে। মালিহা একটা করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মুখে পুরছে আর অনিককে খেয়াল করছে। অনিক খাবার পেয়ে একেবারে গ্রোগ্রাসে গিলছে। আহা মনে হয় কতদিন না খেয়ে আছে। তৃপ্তি সহকারে সবগুলো খাবারই শেষ করলো। মালিহা নিজের প্লেটও ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—ভালো লাগছে এটাও খেয়ে নে। আমার খিদে নেই। নিজের কোক শেষ করলো মালিহা। কথা নেই হারিয়ে গেছে। কী বলবে এতো ভাব এতো ভাষা দমকা হাওয়ায় কোথায় উবে গেল বুঝে পায় না মালিহা। অনিকের খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পরে কথা পাড়ে মালিহা—চাকরির প্রসঙ্গ টানে। ওর প্রসঙ্গে আর যাবে না আজকের মতো।

মালিহা জানতে চায়—কিরে চাকরির জন্য যে এপ্লাই করেছিলি কোনখান থেকে কি কল করেছে? অনিক মাথা নেড়ে বলে—না।
মালিহা বলে—আমার কাছে এসেছে আজ একটা কোম্পানির কল। কাল যেতে বলেছে। মালিহার কথা শুনে হঠাৎ অনিক চঞ্চল হয়ে ওঠে। মালিহার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলে—তুই চাকরি করতে পারবি না। মালিহা ওর হাতের উপর হাত দিয়ে একটু সহানুভ‚তির ছোঁয়া দিয়ে বলে—কেন? তুই আর আমি না এতদিন চাকরি খোঁজে মরেছি?

অনিক কিছুই শুনতে চাইছে না আজ। সে আবার বলে—আমি বলছি তাই তুই চাকরি করবি না, ব্যস। এর ওপর আর কিছু বলার আছে? আমি পছন্দ করি না মেয়েদের চাকরি করা। কেনো একজনের ইনকামে সংসার চালানো যায় না? মালিহা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে কিছুক্ষণ। বলে—এবসার্ট। এমন কথা তোর মুখে মানায় না। তোর নানী চাকরি করতেন। তোর মা চাকরি করেন। সভ্যতার দোর গোড়ায় এসে অন্ধকার যুগের মানুষের মতো কথা বলছিস কেন?

তুই কি চাস ঘরে বসে শুধু তোর জন্য রান্না করবো। আর পতিদেবের অপেক্ষায় থাকবো। তিনি এলে তাকে তালের পাখায় বাতাস করবো আর যতœ করে খাওয়াবো।
অনিক হাসি মুখে বলে—হ্যাঁ। করলে কী হয়? আমার জন্য এতোটুকু করতে পারবি না।

মালিহা ওর কথায় কষ্ট পায়। বলে—ওহ্ মাই গড! তোর মতো স্মার্ট ছেলের মুখে একি কথা? নারীকে পেছনে টানা! নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা? নারীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ? যে দেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী সেই দেশের ছেলে হয়ে এমন চাওয়া? যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, যে দেশের বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নারী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী নারী অনেক দ্রুত কথাগুলো বলে ফেলে মালিহা। অনিক বেশ শান্ত গলায় আবার বলে—পুরো নারী জাতিকে আর দেশকে কেনো টানছিস? আমাকে ওদের কাছে জিস্মি করছিস? আমি আমার আশার কথা আমার স্বপ্নের কথা বলছি, আমি শুধু তোর কথা বলছি। পুরো সমাজে নারী এগিয়ে যাক, তাতে আমার কী, আমি শুধু তোকে বলছি। তুই আমার পাশে থাক। আমার রোজগারে তুই সংসার চালাবি। কেন পারবি না আমার জন্য এইটুকু সেকরিফাইস করতে? করুণ চোখে অনিক মালিহার দিকে তাকিয়ে থাকে। মালিহার হঠাৎ করে রাগ পড়ে আসে। কেমন যেনো মায়া হয় অনিকের জন্য। অসহায় লাগে অনিককে। এমন একজন অসুস্থ ছেলের কথায় সায় দিতে মন চায়। তাকে আরো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। ভীষণ মায়া হয় ওর জন্য।

মালিহা অনিকের হাতটা নিয়ে চেপে ধরে বলে পারব। আমি পারবো তোর জন্য সব করতে পারব। তুই দেখে নিস। অনিককে আর কষ্ট দিতে মন চায় না। দারুনভাবে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে মালিহার। মালিহার মনে হয় আজ ওর আস্থার অভাব। আজ ওর বিশ্বাসের অভাব। অনিকের মনের মাঝে জমে থাকা অবিশ্বাসের স্তূপ সরাতে চায়। পরিপূর্ণ আস্থায় ওর মনে আশার আলো জ্বালাতে চায় মালিহা। মালিহা অনিকের টেবিলের উপর রাখা হাতটির ওপর নিজের হাত চাপা দিয়ে চোখে চোখে রাখে নিজের বিশ্বাসকে ওর অস্থি-মজ্জায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রচুর বিশ্বাস আর আশায় অনিকের মনটা ভরিয়ে দিতে চায়।

আগের মতো অনিক মালিহাকে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে না। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে উষ্ণতায় উম্ নিতে ভুলে গেছে। এ এক অন্য মানুষ। তবুও ওর অনিক এতোটুকুই সান্ত্বনা। সবুরে মেওয়া ফলে। মালিহা অপেক্ষায় থাকবে। ওকে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনবে।

রাব্বি কাছ থেকে অনেক কিছুই জেনেছে মালিহা। ওর বাবা মায়ের সংসারে অশান্ত জীবনের গল্প। ওর মা বাবাকে ভীষণভাবে হিউমিয়েলট করেছে। প্রথম প্রথম ওর বাবা প্রতিবাদ করেছে। পরে সংসারে শান্তির জন্য সবকিছু নিরবে সহ্য করেছেন। মানুষের মন শরীর অহরহ কত যে দৈহিক মানসিক যাতনার শিকার হয়। কেউ কেউ বিধ্বস্ত হয়। কেউ কেউ দিব্যি ভুলে যায়।

বিচিত্র মানুষের মন। ভাবিয়ে তোলে তুচ্ছ ঘটনাকেও। নাড়িয়ে দেয় ভিত। দুর্বল চরিত্রের মানুষ সেই সব ঘটনায় ডিপ্রেসড হয়। গূঢ় রহস্যের গন্ধ নিজের আপন মনে খোঁজে। হীনমন্যতা জন্মায়। দিনে দিনে এর মাত্রা বাড়ে। আতংকিত হয়। ভাবুক মন ভাবনার দোলায় দোলে। মায়ের রুদ্রমূর্তি ওকে বিব্রত করেছে। বাবার অক্ষমতা ওর মন ছুঁয়েছে। কিন্তু কিছুই করতে পারে নি বাবার জন্য। বাবার অক্ষমতায় নিজেকে জড়িয়েছে। প্রতিকারের পথ পায়নি বলে নিজেকে নিজেই অক্ষম ভেবেছে অনিক। আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নগুলো মুহ‚র্তেই চুরচুর হয়ে গেছে।

অনিক মালিহার বিশ্বাসের হাতে আশার আলোর বিচ্ছুরণ দেখেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই ঝড় ওঠে। চারদিক কালো মেঘে ছেয়ে যায় বজ্রবিদ্যুৎ চমকায়। অনিকের মাথায় বাজ পড়ে। অনিক দুই হাতে কান চাপা দেয়। চোখ দুটো বন্ধ করে। মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। এতো শব্দ, এতো ঝড়, ঐ তো ঝড়। ভয় ভয় করছে আমার। নিজের শরীরকে কুঞ্চিত করে। মালিহার বুঝতে অসুবিধা হয় না অনিক অন্য অবস্থানে চলে গেছে। এই মুহ‚র্তে সে আর ফিরবে না। মালিহার কাছেই বসে থাকা রাব্বি প্রায় দৌঁড়ে এসে অনিককে জড়িয়ে ধরে। ভয় নেই বলে সান্ত্বনা দেয়। অনিক চোখ খোল। দেখ আমরা আছি তোর পাশে। মালিহা আছে, আমি আছি।

অনিক চোখ খোলে না। ওকে ধরাধরি করে নিয়ে যায় রাব্বি ও মালিহা। গাড়িতে ওঠায়। ওর বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে।
রাব্বির সেই হাস্যেজ্জ্বল মুখে বিষণœতা। সময়ের অভাবে চলে যেতে হয় নিজের কর্মস্থলে।
তবুও মালিহকে আশ্বাস দিয়ে যায়। আগামী সপ্তায় ফিরে আসবে। যতটা সম্ভব ওর পাশে থাকবে।

মালিহার ভীষণ কান্না পায়। দু’মাস যে কষ্ট জমে ছিল কান্নায় তা বেরিয়ে আসে নতুন কষ্টরা সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করে। মালিহা ভাবে বিশ্বাসের পিদিম জ্বেলে কি ওকে পথ চেনাতে পারতো না? অনিকের জন্য বিশ্বাসের ঝাপি খুলে বসে আছে মালিহা। সে দেখুক ঐ ঝাপিতে বিষাক্ত সাপ নেই, আছে অফুরন্ত বিশ্বাসের সুবাসিত ফুল।

কবে ফুরাবে এই পথ চলা। মালিহা নিজেকে কবে সপে দেবে। এক ফালি চাঁদ হয়ে আকাশের বুকে। সারারাত স্বপ্নে অবগাহন করবে জোছনা প্লাবনে। সুখ পায়রা চৌহাদ্দি বাকবাকুম শব্দে তোলপাড় করবে। অনিক কবে বুঝবে মালিহার মনের গভীরতা। মালিহা বলবে তুমি পরজীবী নও। নিজস্ব একটি সত্তায় আছো তুমি আমার জীবনে। মুক্ত আকাশে স্বাধীন বিহঙ্গ। মেলো তোমার পাখা। অপার বিশ্বাসে দাঁড়াও বাধাহীন রাজপথে। পাশে আমি আছি।
পরক্ষণে মনের ঈশান কোণে মেঘ জমে থমথম। সেই মেঘ কি বৃষ্টি ঝড়াবে, নাকি উড়িয়ে নিয়ে যাবে দুরন্ত বাসাতে ওদের খেলাঘর। জীবনের টানাপোড়নে স্লেটে পেন্সিলের দাগ কখন যে মুছে যাবে। পাবে কি তার নাগাল? ভাবনায় কতটা দিন চলে যায়।

মালিহা চাকরি নিয়েছে। বাবা-মা বিয়ের কথা বলে। সে রাজি হতে পারে না। যদিও অনিক এখনও সুস্থ হয়নি। ডাক্তার দেখাচ্ছে ওকে। বাবা মাকে ওর কথা বলতেও পারছে না। শুধু বলে এতো তাড়া কিসের? কিছুদিন স্বাধীনভাবে চাকরি করে নিই। মা বলেন বয়স বেড়ে গেলে কোন রাজপুত্র পাওয়া যাবে না। কে বসে থাকবে তোর জন্য এতকাল। পরে দোজবরই নিতে হবে। মায়ের দুশ্চিন্তা। মায়ের আবোলতাবল কথা কানে দেয় না মালিহা। আজকাল মনে হয় ওর মধ্যে আরেকটা মানুষ নিত্য কথা বলে চলে। সে নিজের মনে নিজেই কথা বলে। নিত্যই অনিকের সাথে কথা বলে মনে মনে। মনের খবর কে রাখে? কে করে তাকে শাসন? নিরবে নিরালায় ভালোবাসার গল্প বলে অনিক মালিহাকে। ও শুনতে পায় অনিকের কথা। কখন কাঁদে কখনও হাসে মালিহা।
অনিক নামের ঘোর লেগে যায় মনে। নিভৃতে নিরবে মালিহা হারিয়ে যায় অনিকের মাঝে।

বাইরে ঝুমবৃষ্টি। মালিহা ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বৃষ্টির নামতা পড়ছে। পাশে এসে অনিক নিজের হাত দুটো দিয়ে মালিহার চোখ
বন্ধ করে দেয়। বৃষ্টি আর দেখতে পায় না মালিহা শুধু ঝমঝম বর্ষণের শব্দ।
হৃদয়ের লোনা জলে চোখ ভিজে যায় মালিহার। ভিজে থাকে অনিক মালিহার শরীর। শুধু বৃষ্টিভেজাক্ষণ অনিক মালিহার জীবন। দিনের চাকা ঘুরে চলে প্রতিদিন। মেঘে ঢাকা আকাশে কখনও বিদ্যুৎ খেলে যায়। কখনও সূর্যর আলোর বিচ্ছুরণ সচল করে প্রাত্যহিক জীবন।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে ঢাবি শিক্ষার্থীর আবেগঘন চিঠি

আরিফ চৌধুরী শুভ :: হারিয়েছি না হেরে গেছি আমরা? আ্যাম্বুলেন্স চলছে সারেইন ...