সাদিয়া নাসরিন

সাদিয়া নাসরিন :: একজন ফুলটাইম মা, ফুলটাইম এক্সিকিউটিভ, ফুলটাইম গৃহকর্মী, ফুলটাইম ড্রাইভার, পার্টটাইম স্ত্রী, পার্টটাইম অ্যাক্টিভিস্ট। মেয়েটি ১৩ বছরের একটি কিশোরী মেয়ের মা, যার ১১ বছরের এবং ৬ বছরের দুটো ছেলেও আছে, তাকে মাত্র দু’টো হাত দিয়ে সামাল দিতে হয় সংসার, অফিস, বাচ্চা, লেখালেখি, টেলিভিশন, অ্যাক্টিভিজম, সার্কেল, আত্মিয়তা, সামাজিকতা।

এর মধ্যে বাবার শাসন, মায়ের উপদেশ, সঙ্গীর বিশ্বাস-আস্থা (?) সব কিছুই ব্যালেন্স করার হ্যাপা, সাথে আছে মেয়ের কৈশোরের বিশেষ আবেগ, ছেলের বয়ঃসন্ধিকালীন প্রশ্নের চাপ আর অসম্ভব চঞ্চল ছোট্ট ছেলেটার দিনমান বায়নার ধকল, যাকে তুলে খাইয়ে না দিলে তিনদিন পর্যন্ত না খেয়ে থাকে, মা পাশে না শোয়া পর্যন্ত ঘুমায় না।

ক’দিন পরপরই মেয়েটির ডোমেস্টিক হেল্পার কাজে আসে না। সেদিনও আসেনি। রোজার মাস। তিনটা মিটিং ছিলো, শহরের তিন প্রান্তে। রোজার বিশেষ ট্রাফিক ঠেলে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরে ইফতার বানাতে হলো। গরমে-ক্লান্তিতে ইফতারের পর বমি হলো দুবার। বিভিন্ন কারণে মন আর শরীর দুটোই সাফোকেটেড হয়ে ছিল বলে পানি খেয়েই রোজা রেখেছে। ভেবেছিল আজ বিশ্রাম নেবে। কিন্তু গাড়ির ইমার্জেন্সি সার্ভিসিং দরকার হলো। প্রচন্ড গরম, ময়শ্চারাইজার, তীব্র অবসন্নতা নিয়ে সকাল ১১ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত মেয়েটি ওয়ার্কশপে বসে থেকে গাড়ির কাজ শেষ করলো।

ওয়ার্কশপে বসে থাকতে থাকতে মেয়েটি ফ্লাশব্যাকে দেখতে পায়, গত বছর ঠিক এরকম সময়ে এভাবেই তীব্র গরমে সারারাত এসির মেকানিকদের সাথে কাটিয়েছিলো মেয়েটি। স্বামী থাকতে চেয়েছিল দয়া করে। কিন্তু বেচারা অফিস করে ক্লান্ত শরীরে রাত জাগবে বলে দয়াবতী বিবি স্বামীকে ঘুমুতে পাঠিয়ে পুরো রাত কাটিয়ে দিলো ওয়ার্কশপের ভাঙা চেয়ারে বসে মশার কামড় খেয়ে। বেচারা স্বামী বউ এর মহানুভবতায় কৃতজ্ঞ হয়ে নাক ডেকে রাত পার করেছিল। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে পড়তেও মেয়েটি আর বলেনি যে, একটা প্রপোজালের ডেটলাইন মিট করার জন্য তারও আগের তিন রাত সে বিছানায় গা মেলার সময় পায়নি।

দুপুরের অসহনীয় গরমে বসে থাকতে থাকতে এরকম অসংখ্য নির্ঘুম রাত মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়। সারারাত বাসে চড়ে ঢাকায় পৌঁছে একটানা তিন চার দিনের সেশন নিয়েছে। মিরপুর- বনানী গাড়ি চালিয়ে তিনটা বাচ্চার স্কুল ডিউটি করছে, বাচ্চার ক্লাবে আনা নেওয়া করছে। ওই তো মেয়েটি, আট মাসের বাচ্চা পেটে নিয়ে সচিবালয়ের দেয়াল ধরে ধরে হাঁটছে, বস্তিতে ঘুরে ঘুরে প্রজেক্ট এক্সিকিউট করছে, রাতে তীব্র ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সাতমাসের প্রেগনেন্ট মেয়েটি দিল্লী এয়ারপোর্টের এ মাথা ও মাথা হোটেল পিক আপ খুঁজে খুজে পা ফুলিয়ে ঢোল করেছিল, এইতো সেদিন!!

হ্যাঁ, এই মেয়েটিই তো! এডভান্স প্রেগনেন্সিতে। তিনদেশীয় আন্তঃমন্ত্রণালয় সেমিনার হোস্ট করতে হবে। তারিখ, অতিথি সব চূড়ান্ত। অলটারনেটিভ না থাকায় প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারি করাতে বাধ্য হয়েছিল; সার্জারি করার তেরো ঘন্টার মাথায় হাসপাতালের বেড হাইফোল্ড করে ল্যাপটপে ডুবে যেতে হয়েছিল; ছেলের এপেন্ডিসাইটিস অপারেশন বেডের পাশে বসে রাত জেগে অফিসের অডিট মেলাতে হয়েছিল।

মেয়েটি দিব্য চোখে দেখতে পায় তিনটা বাচ্চা গায়ের সাথে ল্যাপটাল্যাপটি করতে করতেই বড় হচ্ছে তার অফিসে। ওই তো মেয়েটি কাজ করছে, কাজের ফাঁকে বাচ্চাদের আদর করছে, গল্প-অভিযোগ শুনছে, খাওয়াচ্ছে, ঘুম পাড়াচ্ছে। ছোট ছেলেটা তো চার বছর পর্যন্ত গাড়িতে আর অফিসেই বড় হয়েছে।

গাড়ির ওয়ার্কশপে বসে সময় কাটানোর জন্য ফারিয়ানা উল্লাচির ‘দ্যা ইউজলেস সেক্স’ পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই হিসেব করতে শুরু করলো মেয়েটি।

কেন সে একা একা এতো স্ট্রেস নিতে শুরু করলো? কেন সবাইকে ভালো রাখার এতো দায় তার? কেন বাসার রান্না, মেইনটেনেন্স, স্কুল, মায়ের শরীর, বাবার সম্মান, ভাইয়ের দেখাশোনা, শাশুড়ির প্রয়োজন, ননদের কন্যাদায়, স্বামীর ক্যারিয়ার, বাচ্চার প্যারেন্টিং সব ঠিক করার দায় তার একার? এমন কি বাচ্চাদের জুতোজামা কেনার ধকল পর্যন্ত একা তাকে নিতে হয়? কেন সেও টাকা দিয়ে দায় সারতে পারে না?

না, স্বামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই মেয়েটির। সে জানে এবং মানে, তার স্বামী অনেক বেশি ডোমেস্টিক ওয়ার্ক করে, বাচ্চাদের দেখাশোনা করে, মাঝে মাঝে রান্নাও করে, হোম মেইন্টেনেন্স করে, গাড়ি সার্ভিসিং এ যায়। কিন্তু তখনই করে, যখন তার ইচ্ছে হয়, মেজাজ মর্জি ঠিক থাকে। এই মেজাজের পারদ উঠানামা করে মেয়েটির সার্ভিসের উপর। যথাসময়ে সার্ভিস দিতে পারলেই স্বামীর মুড ঠিক, তো সব ঠিক। মুড ঠিক নেই তো বউ বাচ্চা কাউকে চেনে না। তাছাড়া, তার চাকরির ধরণটাই এমন, মাসের পনের/বিশ দিনই বাইরে থাকতে হয়। এ সময়ের ফুল ডিউটি মেয়েটির।

মেয়েটির তাই কোন সুযোগ নেই কাউকে না চেনার। মা তো! বাচ্চাগুলো মায়ের পেট ঘেঁষতে চায় যে সারাক্ষণ!! তাই মেয়েটির করে যেতে হয়, ইচ্ছে না করলেও। সবাই বলে, বাচ্চাদের বাবা চাকরি করে। মা তো চাকরি করে না, মা’র নিজের প্রতিষ্ঠান, সুতরাং সে ইচ্ছে মতো নাকি সময় বের করতে পারে। এই ইচ্ছেমতো সময় বের করতে গিয়ে মেয়েটির হাজার রাত পার হয়ে যায় ল্যাপটপের উপর। কি মজা, তাই না!!

এভাবে একা সব সামাল দিতে দিতে একসময় মাতৃত্বকে সর্বাঙ্গীণ করে ফেলে। নিজেকে বিশ্বসংসারের মা ভেবে নেয়। মা দুর্গার মতো দশহাতে সব সামাল দেয়ার দক্ষতা দেখে তার মা, বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি সবাই হাততালি দেয়, স্বামী বন্ধু মহলে উচ্চকিত প্রশংসাও করে। তাদের মেয়ের বা বউ এর মতো গুনবতী নারী আর কয়জন আছে? দাও হাততালি!!

এই হাততালির শব্দে চাপা পড়ে থাকে মেয়েটির একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা আর ক্লান্তির শব্দ। যে শব্দ মেয়েটি নিজের কাছেও লুকিয়ে যায়, পাছে কেউ শুনে ফেলে। কান্না গিলে মেয়েটি নিজেকেই নিজে সাহস যুগিয়ে যায় নিশিদিন। তবু একদিন নিঃসঙ্গতার খাদে দাঁড়িয়ে মেয়েটি মহাশ্বেতা দেবীর মতো জেনে যায়, “সব কিছুরই শেষ আছে। মাতৃত্বেরও শেষ হয়, বুকের দুধও একসময় শেষ হয়। বিশ্বসংসারকে যত্নে পাললে, মাতৃত্বের মহিমায় বিশ্বমাতা সেজে বসলে এ সংসারে সবাই ত্যাগ করে এবং তাকে সতত একলা নির্বান্ধব মরতে হয়”।

অতএব, একলা নির্বান্ধব নিয়তিকে মেনে নিয়ে মেয়েটি একলাই বাঁচতে শেখে। মেয়েটি রোদ দেখে না, চাঁদ দেখে না, বৃষ্টি দেখে না। শুধু বেঁচে থাকে। সবার জন্য বাঁচে। সবার ভিড়ে আর নিজের জন্য বাঁচা হয়ে ওঠে না তার। তার মেয়েটি ভালো গান করে, ছেলেটি ক্রিকেট খেলে। মেয়েটি ভাবে, মা পাশে না থাকলে কি হবে!! যখন স্কুল থেকে বলে, আপনার বাচ্চারা খুব ডিসিপ্লিন্ড, অরগানাইজড, ওয়েল ম্যানার্ড, তখন মেয়েটির কেবল মনে হয়, পৃথিবীতে কিছুই ফেলনা নয়। এসবই তো আমার!!

মেয়েটি ইদানিং একটা কথা খুব শোনে। তার মতো করে মেয়েরা এগিয়ে আসলেই নাকি দেশ এগিয়ে যাবে। মেয়েটি ভাবে, কথাটা সত্যি। কিন্তু, এই এগিয়ে যাওয়ার পথটাই যে এখনো কাটা হয়নি পুরোপুরি। আধ-কাটা, খানা-খন্দ, আর খাড়া পথে এগিয়ে যাওয়া যে কি জিনিস সে তো শুধু ‘এই মেয়েরা’ই জানে। লোহার জুতো পায়ে দিয়েও রক্ষা নেই এখানে মেয়েদের, মাথায় পাথর মেরে রক্তাক্ত করার লোক সবদিকে। চারপাশের কাঁটাতার পেরিয়ে এগিয়ে যেতে যে অনেক দম লাগে, তেজ লাগে, ঘুরে দাঁড়ানোর মতো জোর লাগে। ক্লান্তিতে মায়ের মতো ছায়া লাগে, বাবার মতো ঝড়ে আগলে রাখার বাহু লাগে। আর??? দম পড়ে গেলে দম দেয়ার মতো নির্ভরযোগ্য সঙ্গী লাগে। কোথায় সেসব পাথেয় মেয়েদের?

তবু মেয়ে দৌড়ে যায় জীবনের রেইস। কখনো হেরে যায় ভীষণ রকম, কখনো হোঁচট খেয়ে টালমাটাল হয়। তবু উঠে দাঁড়ায় বারবার। মেয়েটি জানে, যারা দৌড়ায় তাদেরই পড়ে যাবার ভয় থাকে। যে দৌড়াতেই জানে না, সে পড়েও না, হারেও না। তাই জেতার আনন্দও সে জানে না। নিজেকে বারবার ফিরে দেখে মেয়েটি, “কতবার পথ হারতে হারতে দুহাতে আঁধার সরিয়ে আলো খুঁজে পেয়েছি ! কি তীব্র যন্ত্রণার বিষকে বিষের দাহ দিয়ে পুড়িয়েছি! সব এই এক জীবনের আলোছায়া”।

কোন এক ঝড়ের রাতে নিজেকে খুঁজে বেড়ানোর সময়, হঠাৎ করে এক ধুলো উড়ানো ঝড় হয়ে সব ক্লান্তি উড়িয়ে দিয়ে ‘সময়’ তার ডালায় করে আনন্দ, উদ্যম আর স্বপ্ন নিয়ে মেয়েটির দরজায় এসে কড়া নাড়ে। দরজা খুলে তাকে সাদরে গ্রহণ করে মেয়েটি। সে জানে, সময় যখন ভালোবাসা নিয়ে জীবনের দরজার কড়া নাড়ে, ঠিক সে সময়ই দরজাটা খুলতে হয়। সময়কে ধরতে জানতে হয়।

মেয়েটি আবারো, বারবার বিশ্বাস করে, জীবন সুন্দর। এটাই জীবন। এ জীবন উদ্যমের। এ জীবন গতি আর কাজের। এই জীবনে সবাইকে ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে তার। জোছনার ফুল ধরতে ইচ্ছে করে, বৃষ্টি ছুঁতে মন চায়, কেবল বাঁচতে ইচ্ছে করে। তাই মেয়েটি বারবার বেঁচে ওঠে, তুমুল বেঁচে থাকে।

মেয়েটি জানে কিভাবে বাঁচতে হয়, কিভাবে বাঁচাতে হয়। মেয়েটি যে বাঁচতে বড়ো ভালোবাসে।

 

 

লেখক: প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ। ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here