ইউনাইটেড প্রতিবেদক।।

নদী মাতৃক দেশে শত নদী নিয়েই আমাদের ইকোলজি গঠিত। রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উৎস যুক্ত হচ্ছে। দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস গুলোর একটি হলো “ট্যানারি শিল্প দ্বারা সরাসরি নদী দূষণ। কিন্তু কিভাবে এই দূষণ হচ্ছে তা তুলে ধরতে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ কনসোর্টিয়াম এর আয়োজনে ‘ট্যানারি শিল্প ও নদী দূষণ’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে মঙ্গলবার। বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী বছিলা উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

রাজধানী ঢাকাকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে একটি বাসযোগ্য নগরী হিসাবে গড়ে তুলতে ইউএসএআইডি, এফসিডিও এবং কাউন্টারপার্ট ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এবং বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) কে সাথে নিয়ে দূষণবিরোধী নাগরিক প্রচেষ্টা প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংলাপ অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এএসএম আলী কবীর এর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এর সমন্বয়ক শরীফ জামিলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সংলাপে আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ইলিয়াসুর রহমান বাবুল এবং ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম নেতা এবিএম মাসুদ। সংলাপে আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ক্লইমেট চেঞ্জ এক্সপার্ট মনির হোসেন চৌধুরী, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ফাতেমা-তুজ-জোহরা, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ, বছিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: সোলায়মান, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো: রাকিবুল ইসলাম, বারসিকের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফেরদৌস আহমেদ, সিইউপি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো: মাহবুল হক, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির রুমানা আফরোজ দীপ্তি, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মো: কামরুজ্জামান এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের পরিবেশ সাংবাদিক ও স্থানীয় কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সংলাপ অনুষ্ঠানে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর পানির মান নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপনা করেণ কনসোর্টিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হেমায়েতপুর ট্যানারি সংলগ্ন এলাকাসমূহে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্য করা যায়। অতি উচ্চমাত্রার অক্সিজেনের চাহিদা, অম্লতা, এমোনিয়া ও ফেনলের উপস্থিতি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকারক। এছাড়াও তিনি বলেন, সিসিএমই সূচকে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে হেমায়েতপুরের অবস্থান সবার নিচে যা পানির গুনমানকে সর্বদাই হুমকির মুখে রাখে। যেহেতু হেমায়েতপুর উজানে অবস্থিত এবং ধলেশ্বরী বুড়িগঙ্গার উপনদী, সেহেতু হেমায়েতপুরের পানিই পরবর্তীতে ঢাকায় প্রবেশ করে।

সংলাপে ওয়াটারকিপার্স এর সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ট্যানারিগুলোকে হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুর নিয়ে গেলাম তাতে কি আমরা দূষণের মাত্রা কমালাম নাকি আরো ছড়িয়ে দিলাম? আমরা ট্যানারি শিল্পকে ধ্বংস হতে দিতে চাই না। আমরা চাই দূষণ বন্ধ করে পরিবেশসম্মতভাবে এই শিল্পের কলেবর আরো বৃদ্ধি হোক। ট্যানারি শিল্পের দূষণের সমস্যার সমাধান আমাদের সবাই মিলে করতে হবে আর এর জন্য সরকারকে রোডম্যাপ করতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ইলিয়াসুর রহমান বাবুল বলেন, আমরা ট্যানারি মালিক, আমরা পরিবেশবান্ধব ট্যানারি তৈরি করতে চাই। কিন্তু আমাদের কারোরই কোন পরিকল্পনা নাই। শিল্প মন্ত্রণালয় কোন বিষয়ের দায়ভার নিতে চায় না। শুধু মামলা খাই আমরা ট্যানারি মালিকেরা। আরো অন্ততঃ ৪০০ একর জায়গা পেলে পরিবেশবান্ধব ট্যানারি করতে পারবো।

ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এবিএম মাসুদ, ট্যানারি শিল্প মানে শুধু ট্যানারি মালিক নয়, ট্যানারি শিল্প মানে গ্রামের একজন কৃষকও যে পশুপালন করে বিক্রয়ের জন্য।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার প্রতিনিধি রুমানা আফরোজ বলেন, আমরা উন্নয়ন করতে চাই কিন্তু উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা নদী হারাতে চাই না। উন্নয়ন তো করাই যাবে, কিন্তু নদী মরে গেলে আমরা আর নদীকে ফিরিয়ে আনতে পারবো না।

পরিবেশ অধিদপ্তর ফাতেমাতুজ্জোহরা বলেন, আমরা নতুন করে আর কোন ট্যানারির অনুমোদন দিচ্ছি না। তবে দেশটা আমাদের সবার। সবাই মিলে যদি দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তবে দেশটাকে সুন্দর করা সম্ভব।

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, আগে একটা গরুর চামড়া দেড়হাজার অথবা তারচেয়ে বেশি দামে বিক্রয় হতো কিন্তু এখন ২০০ টাকাও না। ফলে গবাদীপশু পালনকারীরা আর লাভবান নয়। আমরা দেখেছি চোরাই লাইন দিয়ে নদীর মাঝখানে দুষিত বর্জ্য ফেলা হয় আর কর্তৃপক্ষের লোক গেলে চোরাই লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিইউপি’র প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো: মাহবুল হক বলেন, আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই, আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই। কিন্তু সে উন্নয়ন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন মেনে উন্নয়ন করতে হবে পরিবেশ রক্ষার পরিকল্পনা রেখে উন্নয়ন করতে হবে। নদী দূষণের দায় পরিবেশ অধিদপ্তর কোনভাবেই এড়াতে পারেন না।

বারসিক এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফেরদৌস আহমেদ বলেন, সরকারের যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন তাকে যদি আমরা মেনে চলি তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। পরিবেশ-প্রাণ-বৈচিত্র্যকে যদি আমরা সবার উপরে স্থান দিই তবে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here