জয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসছে মোদির বিজেপি

ু্ পুআপু

ডেস্ক নিউজ :: ভারতে লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট বিপুল জয় পেয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে ভোট গণনার পর থেকেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের বিপুল জয়ের খবর আসতে শুরু করে।

মোদির নেতৃত্বে বিজেপি জোটের সুনামি জয়ে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ইউপিএ এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন জোটের ভরাডুবি হয়েছে। তবে এনডিএ জোটের জয়ের আভাস আগেই পাওয়া যায়। সাত ধাপের ভোটগ্রহণের শেষ দফায় ১৯ মে সন্ধ্যার পর বুথফেরত ১৪টি জরিপের মধ্যে ১২টিতেই এনডিএ জোটের জয়ের আভাস ছিল।

এনডিএ জোটের অভাবনীয় সাফল্যে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতজুড়ে জোটের নেতাকর্মী-সমর্থকরা আনন্দ-উল্লাস করেছে। রাস্তায় নেমে ঢাকঢোল পিটিয়ে নেচে-গেয়ে তারা আনন্দে মাতেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখোশ পরে কেউ কেউ উল্লাস প্রকাশ করেন। বড় বড় শহরের রাস্তায় বাজি ফাটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে বিজেপি জোটের নেতাকর্মীরা। উল্টোদিকে বিরোধী শিবিরে শুধুই হতাশা। শ্মশানের নিস্তব্ধতা বিরোধী শিবিরে।

মমতা ব্যানার্জি, চন্দ্রবাবু নাইডু ও মায়াবতী-অখিলেশদের জোটের অবস্থাও ভালো নয়। এদিকে নরেন্দ্র মোদির টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের সম্ভাবনায় ভারতের পুঁজিবাজারের সূচক বৃহস্পতিবার ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ৪০ হাজার পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে।

দল ও জোটের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করেছেন। টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘ভারত আবারও জয়ী হল।’ পরাজয় মেনে নিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। পাশাপাশি, মোদির সঙ্গে যে আদর্শিক লড়াই তার চলে আসছে, তা একইভাবে চলবে বলেও জানান তিনি।

রাহুল বলেন, আজ যা ঘটেছে তা হল, জনগণ নরেন্দ্র মোদিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছে। তাদের এ সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান জানাই। তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি টুইট করেছেন। জয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সব পরাজিতরাই পরাজিত নয়।’ খবর আনন্দবাজার, বিবিসি, হিন্দুস্থান টাইমস, এনডিটিভি ও রয়টার্সের।

দ্বিতীয়বারের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে যাওয়া মোদি একই সঙ্গেই ইতিহাসে ঢুকে পড়েছেন। ভারতের ইতিহাসে মোদি হতে চলেছেন তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি পরপর দু’বার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছেন। অর্থাৎ কোনো জোট বা শরিক দলের সাহায্য ছাড়াই সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক ফিগার (২৭২) ছাড়িয়ে গেছে কোনো দল।

এর আগে জওহরলাল নেহরু পরপর তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন কংগ্রেসের হয়ে। ১৯৬৭ সাল ও ১৯৭২ সালে পরপর দু’বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এ দু’বার একাই ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে গিয়েছিল কংগ্রেস। ভারতের ১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচন সম্পন্ন হতে তিন মাস সময় লেগেছিল।

ভারতে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ১,৮৪১টি রাজনৈতিক দলের ৮০০০-এরও বেশি প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। এতে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৭২০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের চারজন প্রার্থী হয়েছিলেন। ভারতের সপ্তদশ লোকসভার ৫৪২টি আসনে ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত সাত দফায় ভোটগ্রহণ করা হয়।

দেড় মাস ধরে নির্বাচনে নানা হিংসাত্মিক ঘটনা ঘটে। অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। শেষ দফা ভোটগ্রহণের পর ১৪টি বুথফেরত জরিপের মধ্যে ১২টিতেই আভাস মেলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবারও সরকার গড়তে চলেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। তবে জরিপগুলোতে ওই জোটের ২৮২ থেকে ৩৬৫টি আসন পাওয়ার আভাস মেলে।

বুথফেরত এ জরিপকে বিজেপিপন্থী স্টাবলিশমেন্টের কারসাজি হিসেবে দেখেছেন বিরোধীরা। তাদের কেউ কেউ দাবি করেন, ইভিএম কারসাজির মধ্য দিয়ে ফল বদলে দিতে পারে ক্ষমতাসীনরা। সেই ফল জায়েজ করতে এ জরিপকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করতে পারেন তারা।

কারণ বিরোধীদের যুক্তি ছিল- কয়েক মাস আগেই মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তীশগড়ের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেস। বিরোধী শিবিরের আশা ছিল, এ তিন রাজ্যে বিজেপির ফল ব্যাপক খারাপ হবে। কিন্তু ফলাফলের আভাস বিজেপির দিকেই।

বিজেপির ঝড়ে বেসামাল হিন্দি বলয় থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার-ওড়িশা, এমনকি উত্তর-পূর্ব ভারত পর্যন্ত। এবার এককভাবে বিজেপি ২০১৪ সালের ২৮২টি আসন টপকে যাওয়ার মুখে। এবার ৩০০টি আসনের বেশি আসন পাওয়ার ইঙ্গিত এনডিএ জোটের। অপরদিকে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বাড়লেও সরকার গঠনের ধারে-কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই ইউপিএ জোটের।

এবার কংগ্রেস ৯০টি আসন পেতে পারে। ২০১৪ সালে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৪টি আসন। যা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে পরাজয়। মমতা ব্যানার্জি, চন্দ্রবাবু নাইডু, মায়াবতী-অখিলেশদের জোট গড়ার চেষ্টা করলেও নিজেদের রাজ্যেই তাদের পরাজয় শোচনীয়। পশ্চিমবঙ্গে এক ধাক্কায় বিজেপির এক ডজন আসন বেড়েছে। উত্তরপ্রদেশেও ৫০টির কাছাকাছি আসন পেতে যাচ্ছে বিজেপি।

রাজ্যে রাজ্যে আসন বেড়েছে বিজেপির : সর্বশেষ খবর অনুযায়ী এনডিএ জোট মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লিতে জয় পেয়েছে। বিরোধী জোটের অন্যতম নেতা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যান্যার্জির রাজ্যে ১৫টিরও বেশি আসন পাচ্ছে বিজেপি।

ওড়িশাতেও বিজু জনতা দলকে বিরাট ধাক্কা দিয়ে ব্যাপক ভালো ফল পেয়েছে বিজেপি। তবে কয়েক মাস আগে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তীশগড়ের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে সরিয়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসায় বিরোধী শিবিরে জয়ের ব্যাপক আশা ছিল। এ তিন রাজ্যে ২০১৪ সালের মতোই আসন পাচ্ছে বিজেপি।

বিহারে বিজেপি-জেডিইউ-আরএলএসপির জোট ভালো করেছে। ঝাড়খণ্ডেও প্রায় একই অবস্থা। উত্তর-পূর্বে বিজেপির ফল আগে ভালোই ছিল। এবারও তা বজায় রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে ২০১৪ সালে বিজেপির ছিল দুটি, এবার সেখানে ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে তারা। বিপরীতে মমতার তৃণমূলের আসন কমে আসছে ২২টিতে, গতবার ছিল ৩৪টি। আর এবার কংগ্রেসের আসন তিনটি কমে একটি হচ্ছে। এ রাজ্যে প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট ২০১৪ সালে দুটি আসনে জিতলেও এবার ফিরছে শূন্য হাতে।

বিরোধীদের কাছে কার্যত তুরুপের তাস ছিল উত্তরপ্রদেশ। কারণ আসন সংখ্যার নিরিখে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এ রাজ্যে দীর্ঘদিন পর দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি বহুজন সমাজ পার্টি এবং সমাজবাদী পার্টি এক হয়ে ভোটে লড়েছে। সঙ্গে ছিল অজিত সিংহের আরএলডিও। কিন্তু তাতেও ফল আশানুরূপ নয় বললেই চলে।

২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির ৭১টি থেকে আসন কমলেও ৫০-এর কাছাকাছি পেতে যাচ্ছে। বিরোধী মহাজোটের নেতৃত্ব দেয়া চন্দ্রবাবু নাইডু নিজের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশেই কার্যত ধরাশায়ী। রাজ্যের ২৫টি আসনের মধ্যে ২০টিরও বেশি আসন পেতে যাচ্ছে জগমোহন রেড্ডির ওয়াইএসআর কংগ্রেস। প্রতিবেশী রাজ্য তেলঙ্গানাতেও ভালো ফল করতে যাচ্ছে বিজেপি।

‘আব কি বার ৩০০ পার’ : পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ ৩৩৬ আসনে জিতেছিল। আর এককভাবে বিজেপি জিতেছিল ২৮২টি আসন। সেবার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ৫৯টি আসন জিতেছিল। আর এককভাবে কংগ্রেস পেয়েছিল মাত্র ৪৪টি আসন।

এবার বিজেপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মূল স্লোগান ছিল ‘ফির একবার, মোদি সরকার’। তাদের এ স্লোগান একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলেছে। এবার বিজেপি ২৯৪টি আসন পেতে পাচ্ছে। বুথফেরত সমীক্ষায় তার স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। সেই সমীক্ষা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। প্রশ্নও উঠেছিল অনেক।

জন্ম নিয়েছিল অনেক অবিশ্বাস, সংশয় ও সন্দেহ। কিন্তু গণনা শুরু হওয়ার সামান্য সময়ের মধ্যেই বোঝা গেল পাঁচ বছর আগের ভোটের রায়ের সঙ্গে এবারের রায়ের অমিল বলতে প্রায় কিছুই নেই।

কংগ্রেসের ভরসা ধূলিসাৎ : কংগ্রেসের ভরসা ছিল রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের ওপর। মাত্র কয়েক মাস আগে এ তিন রাজ্যে বিজেপিকে সরিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল। ওই তিন রাজ্যও তাদের হতাশ করেছে। ছত্তিশগড়ে কিছুটা লড়লেও অন্য দুই রাজ্য কংগ্রেস সমর্পণ করেছে বিজেপির কাছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গুজরাটের বিধানসভার ভোটে কংগ্রেস বিজেপিকে জোর ধাক্কা দিলেও লোকসভার ভোটে তারা বিজেপির কাছে গুটিয়ে গেল। কংগ্রেসের ভরসা ছিল কর্নাটকের ওপরও। অথচ সেখানে জেডিএসের সঙ্গে জোট সত্ত্বেও কংগ্রেসের ফল ওই রাজ্যেও হতাশাজনক।

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কসবায় ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন যারা

স্টাফ রিপোর্টার :: ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের‏ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে সোমবার ...