জুঁই জেসমিন

জুঁই জেসমিন :: এমিলিয়া তুমুল দৌড়াতে থাকে, জীবন বাঁচাতে নয়-  শরীর বাঁচাতে! লোকটার চোখে মুখে, যা কামুকি ঝড়,সেই প্রাগৈতিহাসিক ভিখু চরিত্রকেও  যেন হার মানায়, রক্ষা পাওয়া মুশিকল, তবে উপায়?
চারদিক ভূট্রাক্ষেত, লোকজনের সাড়াশব্দ নেই! কী হবে এমিলিয়ার, কীভাবে রক্ষা পাবে আজ?

এমিলিয়া, জীবন সংগ্রামী এক পল্লী মেয়ে,
হাজারো স্বপ্ন তার ওই মন প্রান্তরে, পানকৌড়ির মতো ডুবে ওঠে।  তার আজ ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো একটা সাবজেক্ট নিয়ে পড়ার কথা,
কিন্তু, সে রোজ সকাল বিকেল  এসে এই এক আদি গাছের ছায়াতলে চিৎকার করে  কাঁদে।

এমিলিয়া জীবনে কতশত বার আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়, মায়ের আচল যেন প্রাণটাকে পৃথিবীর দেয়ালে বেঁধে রাখে কঠিন রূপে, যা বার বার মরতে গিয়েও মরতে পারেনি সে। যে গাছের ডালে ফাঁস লাগিয়ে মরার চিন্তাভাবনা  এমিলিয়ার, সে গাছের আকৃতি ও বেড়ে ওঠা দেখে  সে অবাক হয়, বড় অদ্ভুত, বেড়ে ওঠার লড়াইটা যেন সাংঘাতিক! জন্ম থেকেই প্রতিবছর গাছটির ডাল পালা কেউ না কেউ ভেঙে ফেলে  তা মূল কাণ্ড দেখেই বুঝা যায়,  সেই গোড়া  থেকে আবার  বেশ কয়েকটা ডাল বের হয়, এভাবে অনেক শাখা প্রশাখার বিস্তার, দূর থেকে বেশ শোভনীয় লাগে, যেন এক সবুজ  বৃত্তকার পৃথিবী এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে শস্যের প্রান্তরে । এই আদি উদ্ভিদটির টিকে থাকার যুদ্ধ দেখে এমিলিয়া সৈনিক রূপে জেগে উঠে , বেঁচে থাকার প্রত্যাশায়।

এমিলিয়া বেশ ভালো আবৃত্তি ও গান গাইতে পারে, এই এতোটুকু বয়সে জগতটা তার কাছে বেশ রহস্যময়। পৃথিবীর শরীরে গা দুলে  পুরুষরা যেন শুধু রমণীর দেহ খুঁজে,  পুরুষের চোখে শুধু নারী ভোগের কারুকাজ এই এক ধুসর  ধারণা।
সে ছোট্ট বেলা হতে তার জীবনে এ অবধি কত পুরুষের হাত, পাঁচ দশেক আঙ্গুলের নৃত্য খেলতে চায় তার বুকের জমিনে ওষ্ঠে পিঠে, চিবুকে– নিজেকে রক্ষা করে যায়  হাজারো কৌশলে।

একদিন তার মামাতো ভাই তাদের বাড়িতে বেড়াতে এলে, সবাই মিলে এক ঘরে থাকে।  এমিলিয়া চতুর্থ শ্রেণীতে তখন, আর মামাতো ভাই দশমে, মামাতো ভাইটাও অন্ধকারে শরীর খুঁজেছিলো উষ্ণ হাতে, ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাসে রজনীর শিরোনামে।
এমিলিয়াদের শুয়ে থাকার ঘর মাত্র দুটো, আলাদা করে কোথাও থাকার উপায় ছিলোনা সে যুগের গর্ভে।

হুজুরেরও চোখ থেকে এমিলিয়া রক্ষা পায়নি,কোরআন শিক্ষা নিতে হুজুরের বেশ পরিতাপ সইতে হয়। সুযোগ পেলেই চিমটি মারতো যেখানে সেখানে।
এসএসসি পাশের পর তার জীবনে আসে প্রেম,  ভালোলাগা স্বপ্নিল  সুপুরুষ, তবে তা বিমূর্ত রূপে -হঠাৎ একদিন এমিলিয়ার নামে চিঠি আসে,কে চিঠি দিলো?  কেন দিলো, সে জানেনা! ঠিকানা বিহীন।  তবে,চিঠিতে পৃথিবীর সমস্ত ভালো লাগা যেন শৈল্পিকতায় ভরা, কবিতার কারুকাজে !
(চিঠিটা-)
এই—
তোমাকে  রোজ হাসাবো
হৃদয় আলোয়, একটুকরো ঠোঁটের কণায়-
হাসবে?
কল্পনার বাইরে ভালো লাগার সেই শান্তির দেশ দেখাবো তোমায়?
যে দেশে, হঠাৎ মাঝ রাতে সূর্য ভেসে উঠে-
সেই দেশ- সেই দেশ দেখাবো
যদি দেখো তবে হাতে হাত রাখো
কল্পনায় অনুভূতিতে চোখে চোখ রাখো–
কী রাখবেনা?  ভাবছো আমি কে? আমি যে
তোমার স্বপ্ন।
স্বপ্ন,
স্বপ্নটা কে?  কোথায় বাড়ি কোথায় ঘর কোথায় থাকে? এমিলিয়া ঘোর ভাবনায় খুঁজে স্বপ্নকে, কে সেই স্বপ্ন,কে বা হতে পারে?
কিছুদিন পর আবার এক প্রণয় পত্র-
“এই  এমিলিয়া,
কাল নাকি তোমার জন্মদিন?
কাল আকাশে গোটা আকাশ জুড়ে চাঁদ হাসবে পূর্ণিমার তানে
আর আমি বেহেলা বাজাবো তোমার গানে
এক একটুকরো সময় দিও-
বের হয়ও ঘরের বাইরে ।।
*তোমারই স্বপ্ন-*।

এমিলিয়া চিঠিটা পড়ে অবাক-
কাল জন্মদিন সে কি করে জানলো,
সে কি তবে চেনাজানা কেউ?
পরদিন রাতে অস্থির ভাবনায় ঘুম আসেনি এমিলিয়ার-
সত্যিই কি তবে সে আসবে, হাতে বেহালা নিয়ে? প্রশ্নের মিছিলে উত্তপ্ত কৌতুহল গুলো। চাঁদ তো সমস্ত রূপে সারা আকাশ রাঙিয়েছে নতুন সাজে।  এমিলিয়া চুপিচুপি বের হয় ঘরের বাইরে- কোথাও কেউ নেই! তবে?
হঠাৎ দেখে পুকুর ধারে নারকেল গাছের নীচে   একটা কিছু চকচক করছে, কী তবে? কাছে গিয়ে দেখে গিফট বক্স, এমিলিয়ার বুকটা একরকম ভয়ে কেঁপে উঠে,
গিফটে লেখা, “এমিলিয়া –
তোমার ‘স্বপ্ন’।

কিন্তু স্বপ্ন কই?
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সে ভাবুক মনে ঘরে ফিরে।
-একি? বক্সের ভেতর  এক গুচ্ছ আমলকী,  একটা চিরুনি,   ডালচিনি লং,  কালো জিরা, চকলেট,  আর একটা ছোট্ট আয়না। আজব!  কে এই স্বপ্ন —-?
তারপরদিন গানের অনুষ্ঠানে সবুজের সাথে দেখা ,
সেও গানের শিল্পী।
এমিলিয়ার গান শুনে সবুজ সবার মাঝে সবাইকে বলে আমি কী স্বপ্ন হতে পারি তোমাদের মাঝে?  গানের মতো,,
এমিলিয়া অবাক!
ফাজিল কোথাকার বলে কী?
এইতো আমার জীবনে প্রথম এলারজি, এই কি তবে স্বপ্ন  সেজে এতো কিছু করে? এরই মধ্যে সবুজ তার বউকে পরিচয় করিয়ে দেয়, সবার মাঝে। তার বউ যাতে বড় কণ্ঠ শিল্পী হতে পারে এই দোয়া সকলের কাছে! এমিলিয়া নির্বাক, সবুজ তো স্বপ্ন নয়, সে তো বিয়ে করেছে, তবে?

এমিলিয়ার  পত্র আসেনা দীর্ঘকাল,এই আদি গাছের কাছে একটুকরো সুখ পেতে এখানেও কামুকের দৌড়,  এমিলিয়া দৌড়াতে দৌড়াতে দেখে তার এলাকার –
এক চাচা  ধান ক্ষেতের আইলে বসে তসবিহ টিপে, সে হাঁপাতে হাঁপাতে , চাচার কাছে এসে দাঁড় হয়—
চাচা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তবে তা অন্য  ভাবে—–!

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here