জুঁই জেসমিন’র ছোট গল্প ‘রাতুর বন্ধু’

জুঁই জেসমিন :: ভদ্র মহিলার আদেশেই গাভীটিকে কোরবানি দেওয়া হলো,
পাড়ার সবাই কালুকে নিষেধ করেছে,এই গাভী গরুটিকে কোরবানি দেওয়া মোটেও ঠিক হবেনা, বাছুরের বয়স বেশি হয়নি,
বাছুরটি এখনো মায়ের দুধ খায়।
কে কার কথা শুনে, এ যে মালিকের নির্দেশ।
ভদ্র মহিলা কিছু আত্মীয় স্বজনকে গরু পুষতে দেয়।
প্রতি ঈদুল আযহায় মহিলা একটি গরু কোরবানি দেয়।
এবারো তাই,কালুকে বলা হয় কোরবানি দেওয়া হলেই এক ভাগ মাংস বিলিয়ে বাকি দু ভাগ যাতে তার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
কালুর একমাত্র ছেলে রাতু।
রাতুই দেখা শুনা সেবা যত্ন করে গরু ছাগলের,
পড়াশুনা তার ভাল লাগেনা, দাদা ছিলেন জমিদার,সেই ক্ষেত্রে বাবার বিশাল সম্পদ, রাতু ভাবে পৃথিবীর সব চেয়ে বড় কঠিন কাজ হলো লেখাপড়া,
তারপক্ষে সম্ভব না বই হাতে নিয়ে প্রতি অক্ষর মনে রাখা!
রাতুর ভাল লাগে সারাদিন মাঠে থাকতে নদীতে মাছ ধরতে, নদীর ওপারে চা বাগানে গিয়ে চুপি চুপি চা পাতা ছিঁড়ে নদীর জলে ভাসাতে।
এই বাছুর তার খুব প্রিয় ভাল এক বন্ধু, রাতু যেদিক যেদিক যায়
বাছুরটিও সেদিক সেদিক ছুটে চলে।
রাতু বাছুরটিকে আদর করে বন্ধু বলেই ডাকে,
তার মন আজ খুব খুব খারাপ!
বাছুরটির সামনেই এক হুজুর বিশাল তলোয়ার দিয়ে জবাই করে গাভীটিকে।
জলে ভরা টলটল চোখ দুটো আকাশে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে—মাটিতে রক্তের মানচিত্র, যার কোনো সীমারেখা নেই নব আয়ুতে পথ চলার।
বাছুরটির গলা ফাটা হাম্বা হাম্বা ডাকে সারা গ্রাম যেন কাঁপে,কেউ স্থির থাকতে পারেনা।
বাছুরটি ছটপট করে
এতো গুলো মানুষ কী করছে তার মাকে?
হাম্বা হাম্বা ডাকে প্রতিটি মানুষকে কি জানি বলছে,
যে ডাকের অর্থ মানব প্রকৃতি বুঝেনা।
এ – সেই ডাক।
রাতু কোন ক্রমেই বাছুরটিকে সান্তনা দিতে পারেনা কিছু খাওয়াতে পারেনা,,
হাম্বা হাম্বা অবিরত ডাক, চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে, বাছুরের আকুতি দেখে রাতুও কাঁদে,কি করবে সে? সেও কিছু মুখে দেয়নি,
তার কথা তার বন্ধু কিছু খেলে তবেই সে মাংস রুটি মুখে দেবে।
ক্রমশ রাত হয়ে এলো, বাছুরটি মুখে ঘাস পানি দুধ কিছুই মুখে নিলনা, বাছুরের করুণ হাম্বা ডাকে বাড়ির কেউই ঘুমুতে পারেনি!
রাতুকে তার নানা এসে সকাল বেলা জোর করে খাবার খাওয়ায়। বাছুরের এমন অবস্থা দেখে কালু ভদ্র মহিলাকে ফোন দিয়ে বলে,
বাছুরটিকে কোন ক্রমেই কিছু খাওয়া যাচ্ছেনা, কি করবে সে এখন?
মহিলা একটা হাসি দিয়ে বলে আরে চাচা ঠিক হয়ে যাবে,
একটু জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করেন, খাবে।
এ বলে ফোন কেটে দেয়।
দুদিন পার হয়ে গেল, বাছুরটি আর ডাকতে পারেনা হাম্বা হাম্বা, সমস্ত মুখে জমাট বাধা খয় রঙা রক্ত। গলার নীচে অনেকটা ফুলে গেছে,
রাতু আর তার বাবা দুজনে পাইপলাইনে গরম দুধ খাওয়ায়।
কিন্তু, বাছুরটি কোন কিছুই গিলতে পারেনা,
কালুর গ্রামে গরু ছাগলের চিকিৎসার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই।
তাছাড়া তার তেমন সামর্থ নেই বাছুরটিকে নন্দিপুর গিয়ে ভাল ডাক্তার দেখাবার।
বাছুরটিকে যারা দেখে তারাই কালুকে বকুনি দিয়ে যায়,
গ্রামের সবাই নিষেধ করেছিল
কিন্তু,কালু নিরুপায় হয়ে পরিস্থিতির শিকার।
কালুর মুখে সত্য ঘটনা শুনে গ্রামবাসী মহিলার উপর একরকম রাগান্বিত হয়। সে পাড়ার টক্কর বুড়ো বলে “মহিলা তো বেশ শিক্ষিত পয়সাকড়িও হাতে ভাল,
অন্য গরু কেনে কোরবানি দিতে তো পারতো, বাছুরটির এমন অবস্থা আহারে!
দেখে কার ভাল লাগে,,,,
কাজটা মোটেও ভাল করেনি!”
একটানা বৃষ্টি, শেষ বিকেলে এক ঝলক রোদ্র প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে চঞ্চলতায়,
রাতু ও তার বাবা বাছুরটিকে বাহিরে এনে রোদে দেয় যে স্থানে তার মাকে কোরবানি দেওয়া হয়।
এখনো যেখানে সেখানে জমাট বাধা কালচে রক্তের দাগ,বাছুরটি সেই রক্তে নাক মুখ ঠেকিয়ে গঙ্গাতে থাকে,অস্ত রবি রোদ্রকে কোলে টেনে বিদায়ী সুরে সন্ধ্যার ছাঁয়া বিছিয়ে দেয় সব খানে!
মায়ের মতো বাছুরটিও অশ্রুপ্লাবন চোখ শুন্য আকাশে ভাসিয়ে দেয় কোরবানি নামে হাজার প্রশ্নে হাজোরো অভিমানে —!

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

দ্য প্যাপিরাস এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের প্রথম পলিটিকাল ইকোনমি এবং দর্শনভিত্তিক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন দ্য প্যাপিরাসের ...