মাহমুদা হক মনিরা :: ২০২১-২২ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের কর ও দাম বৃদ্ধির জন্য বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরতে প্রজ্ঞা এবং এন্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স- আত্মা আজ সকালে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেছে।

‘তামাক-কর ও দাম সংক্রান্ত বাজেট প্রস্তাব: ২০২১-২২’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় তামাকবিরোধী মঞ্চের আহ্বায়ক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে), বাংলাদেশ এর লিড পলিসি অ্যাডভাইজর ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) এর সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং বিআইডিএস এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিআইআইএসএস এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর এবং বাসস এর চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন এবং বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন প্রজ্ঞা’র হেড অব টোব্যাকো কন্ট্রোল প্রোগ্রাম হাসান শাহরিয়ার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন আত্মা’র কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ।

প্রজ্ঞা’র হেড অব টোব্যাকো কন্ট্রোল প্রোগ্রাম হাসান শাহরিয়ার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, “অর্থনৈতিক, অনৈতিক এবং স্বাস্থ্য এই তিন দিক বিবেচনায় তামাক-কর নির্ধারণ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক শিল্প থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪১০ কোটি টাকা এবং তামাক ব্যবহারজনিত অসুস্থতায় রোগে ভোগে চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ৩০৫৬০ কোটি টাকা। নৈতিক যুক্তি থেকে তামাক মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর আমাদের দেশে তামাক সেবনে ১লক্ষ ২৬ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

বাংলাদেশ এখনও পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের সিগারেটের মূল্য অত্যন্ত কম, যা একটি অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৫-১৬সালের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৫.৪ শতাংশ। অথচ এসময়ে বেশিরভাগ সিগারেটের দাম প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে অথবা সামান্য বেড়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করতে হলে তামাকের ব্যবহার ব্যাপক হারে কমাতে হবে।

২০২১-২২ অর্থবছরে সকল সিগারেট ব্র্যান্ড সম্পূরক শুল্ক চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬৫% করতে হবে। এবং ফিল্টারবিহীন ও ফিল্টারযুক্ত বিড়িতে সম্পূরক শুল্ক চূড়ান্ত খুচরা মূল্য ৪৫% করতে হবে। ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্য যেমন জর্দা ও গুণের ক্ষেত্রে করো দাম বৃদ্ধি করতে হবে। তামাক পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক পুনর্বহাল করতে হবে।”

বিআইআইএসএস এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “নৈতিকতা, স্বাস্থ্য ও অর্থে বড় ত্রুটি রয়েছে। কর এবং দামের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আমরা করে’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছি, দামের জায়গায় তেমন নজর দিচ্ছি না। সামগ্রিকভাবে গঠনগত মৌলিক পরিবর্তন দরকার। সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করা হলে দামের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব পড়বে। ফলে তামাক ব্যবসায়ীরা সহজে কর ফাঁকি দিতে পারবে না। সঠিকভাবে কর প্রদান কার্যকর হলে তামাক ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে। নিম্নস্তরের তামাক ব্যবহারকারীদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাদের পরিমান কমিয়ে আনতে হবে।”

বিআইডিএস এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, “শুল্কের হার নির্দিষ্ট রেখে দাম বাড়ানো উচিত। তামাকের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরতে প্রচার প্রচারণার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট রাখা দরকার। করোনাকে ঘিরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার একটি বিশেষ সুযোগ রয়েছে। আমাদের দেশে ধুয়াবিহীন তামাকের ক্ষেত্রে সচেতনতা অনেক কম। যেসব মহিলারা জর্দা গুল ব্যবহার করেন কিন্তু তার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন নন সেই ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। আমাদের লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন। সেক্ষেত্রে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রন গুরুত্বপূর্ণ। মান নিয়ন্ত্রণ জুড়ালো হলে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যে হারে আয় বাড়ছে সেই হারের দাম বাড়ছে কিনা অথবা মাথাপিছু আয়ের প্রেক্ষিতে দাম বৃদ্ধির ব্যাপারটি নজরে আনতে হবে।”

বাংলাদেশ এর লিড পলিসি অ্যাডভাইজর ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) এর সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “তামকের দাম বৃদ্ধি করে মানুষকে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার সেই ক্যাম্পেইনটা আমরা করছি। তামাক পন্যের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে কোনো লাভ নেই। কেননা তামাকের পরিমান যেমনই হোক না কেন তা ক্ষতিকর। তাই মানুষ যাতে তামাক সেবনে অনাগ্রহ প্রকাশ করে আমাদের সে জন্য কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তামাকের উপর কর বৃদ্ধি করলে তা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে ফলে তারা সহজেই তামাক সেবন করতে পারবে না। এতে তরুনরাও তামাক সেবনে নিরুৎসাহিত হবে।”

জাতীয় তামাকবিরোধী মঞ্চের আহ্বায়ক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, “তামাকবিরোধী বাজেট প্রস্তাব প্রতিবছরই করা হয়, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এর মূল হচ্ছে সরকারের আয়ের হিসাব রাখা হলেও এর পেছনে মানুষ কতটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে সে হিসাব রাখা হয় না। সকল আয় বা কাজ মানুষের কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত। নীতি নির্ধারক বা যারা বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছেন তাদের নিজেদের কর্মক্ষেত্রের দ্বায়বদ্ধতা কাটানো উচিত। তিনি আরও বলেন, তামাক সেবন নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তরুনদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। গ্রাম এলাকার অনেক মানুষ এখনো জানেই না এটা কতটা ক্ষতিকর। সেক্ষেত্রে জনসচেতনতা দরকার। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জনকল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আমি আশাবাদী আমরা একটু একটু করে বেশি সফল হবো।”

বাসস এর চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “প্রজন্মের পর প্রজন্ম সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু তাদের মানসিকতা পরিবর্তন নেই। আমাদের চিন্তাশীলতায় পরিবর্তন আনা দরকার। যারা তামাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাদেরও জীবনযাপন করতে হয় সেক্ষেত্রে তাদের একটি চাপ আছে। ট্যাক্স বাড়িয়ে তামাক সেবনের হার অনেকাংশে কমানো গেলেও সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। যেসব কৃষকরা তামাক চাষের সাথে জড়িত তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। অনেক শিশুরাও তামাক শিল্পের সাথে জড়িত তাদের শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। ধুমপান বিষপানের সামিল সেই সচেতনতা সবার মাঝে গড়ে তুলতে হবে।”

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here