ছাত্ররাজনীতির অবক্ষয় দৃশ্যমান : বাঁচতে চায় মেধা

এলিজা খাতুন :: এদেশেরই ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছিলেন ১৯৫২ সালে ভাষার অধিকার আদায়ে; সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, নাম না জানা আরও অনেকে। এরপর ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানীদের ঘৃণ্য, জগন্য হত্যাযজ্ঞ; দেশের জন্য প্রাণ দিতে ঝাঁপিয়ে পড়া মহান মানুষদের আত্মত্যাগে এবং লক্ষ্য শহীদের রক্তের বদলে আজ আমরা এত্ত স্বাধীন ! শত বছরের পুরোনো মুক্তি মিলেছে বৈকি, কিন্তু প্রাণেরে মুক্তি কি মিলেছে? মিলেছে চেতনার মুক্তি? লক্ষ্য শহীদের রক্তস্নাত বাংলার মাটি আজও কি রক্ত দেখে চলছে না ? দলাদলি, অন্যায়, খুনাখুনি, সাম্প্রদায়িক হানাহানি এসব কি দূর হয়েছে?- শিক্ষাঙ্গন থেকে, রাজপথ থেকে, বাংলার মাটি থেকে? দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে দেশকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসররা; বেছে বেছে দেশের সেরা শিক্ষক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রদের হত্যা করা হয়। আর সেইসব এ দেশীয় দোসররা বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দল-মত বদলেছে বার বার নিজেদের সুবিধা-স্বার্থে।

ঠিক যে সময়ে শহর পরিচ্ছন্ন, মশা নিধন অভিযান, জুয়াড় আখড়া ধোলাই-সাফ পদক্ষেপ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া… ইত্যাদি বিষয়ে বর্তমান সরকার প্রধানের একের পর এক পদক্ষেপ আশা জাগানিয়া হয়ে উঠছিল ; ঘোর অন্ধকারে জ্বলে ওঠা আলোর মতো ; এমন সময়ে এ-কোন্ অন্ধকার গ্রাস করছে আলোকিত প্রাণ? কোন্ অশুভ মুর্তী দুমড়ে মুচড়ে আঘাতে আঘাতে ছোপ ছোপ রক্তাক্ত করে দিচ্ছে উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে? কোন্ দানবেরা বিনাশ করছে মেধাকে?

‘আবরার‘ একটি মেধার নাম। মেধা হত্যায় বার বার মৃত্যু হচ্ছে এ দেশটার। এমন নৃশংস নির্মমতা মেনে নেওয়া যাচ্ছেনা, মনকে প্রবোধ দেয়া যায়না কোনমতে! এ-তো কোন দুর্ঘটনায় পতিত মৃত্যু নয় ! অসুখে পড়ে মৃত্যু নয় ! প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত মৃত্যু নয় ! পেটাতে পেটাতে আঘাতে আঘাতে ঘন্টার পর ঘন্টা একটা জীবনকে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করানো! সন্তানের প্রতি এমন বিভৎসতা কোন্ বাবা মায়ের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব!? ভাবলে গা শিওরে ওঠে। এ কোন্ সময় অকতবাহিত করছি আমরা? আমার সন্তানকে কীভাবে কোথায় পড়াবো? এ দুশ্চিন্তা গোটা দেশবাসির, গোটা সমাজের, সমস্ত পিতামাতার। এই অনিশ্চয়তা, দুর্ভাবনা, অনিরাপদ ছাত্রজীবন কী বয়ে আনছে দেশে !

আবরারের উপর অকথ্য নির্যাতন কেবল একজন ছাত্রের উপরে নয় ; এই অত্যাচার সরাসরি মেধার ওপর । মেধার বিনাশ ঘটাচ্ছে যারা- দল মত গোত্র, দেশ, জাতি, নির্বিশেষে তারা মানুষ শব্দের আওতায় পড়ে না। ‘মানুষ’ শব্দটি সহজ কথা নয়। মানুষ হওয়ার জন্য যাদের হাতিয়ার হওয়ার কথা কলম , তাদের হাতে অস্ত্র-লাঠিসোটা তো অন্য কোনো গ্রহ থেকে হাজির হচ্ছেনা বা অলৌকিক ভাবে পড়ছে না ! দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনের ওপর নির্ভার হয়ে আছে অনেকাংশে।এ তারই কুফল!

কিছু উগ্র ছাত্ররাজনীতিকের কারণে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এবং হল বা হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতিটিক্ষণ প্রায়ই হুমকির মুখে । বাবা-মায়ের কোল ছেড়ে পড়তে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীকে কোন না কোন দলে যুক্ত হওয়ার জন্য কঠিনভাবে চাপ দেওয়া হয় ; মানসিক প্রেশার ও শারীরিক নির্যাতন নীরবে সহ্য করতে হয় তাকে।

অস্বীকার করার নয়- জাতির স্বার্থেই সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতি টিকিয়ে রাখা দরকার ; কেননা জাতি এ স্তর থেকে ভবিষ্যতে তুখোড় রাজনৈতিক নেতা পাবে । কিন্তু সেটা এখনকার পরিস্থিতিতে অবশ্যই সম্ভব নয় ততটা। ছাত্ররাজনীতির সোনালী অধ্যায় এখন ইাতহাশ মাত্র।সময়ের আবর্তে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য খন্ড-বিখন্ড হয়েছে, বিভক্তি এসেছে চেতনায়।জাতীয় লক্ষ্যও অনেক সময় ম্রিয়মান হয়েছে।যুগ ও সভ্যতার পরিবর্তনে সমাজের মানুষের মূল্যবোধেরও পরিবর্তন হয় ; কিন্তু সহনশীলতা, আইনের শাসন ও সুশৃংঙ্খল পরিবেশের অভাবে বাঙালী জাতির মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে ।

আবার এভাবেও বলা যায়- মূল্যবোধের অভাবে সহনশীলতা, আইনের শাসন, ও সুশৃংঙ্খল পরিবেশ দিন দিন হারাতে বসেছে। একটা সমাজের মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস, আচরণ, এর উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে সুস্থ্য দেশের মেরুদন্ড। অথচ আজকের দিনে বিষের মত সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে- অন্যায়-অনাচার, দলাদলি, রক্তপাত ইত্যাদি জঘন্য কায্যকলাপ ; আর এ সমস্ত নোংরা রাজনীতিতে ছাত্রদের তারুণ্যকে লুফে নিয়ে তার অপব্যবহার করছে কতিপয় স্বার্থান্বেসি নষ্ট প্রবৃত্তির ব্যক্তি। যাদের কলঙ্কে কলুষিত হচ্ছে পুরো রাজনৈতিক দল।

আবরারের ওপর এই পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যে কারা জড়িত তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত স্থাপন এই সময় খুব প্রয়োজন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এ জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কিছু সংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষ ছাড়া সবাই এজন্য সংগ্রাম করেছেন, সহ্য করেছেন সীমাহীন যন্ত্রণা।এমন বৃহৎ অর্জনকে অক্ষুন্ন রাখতে বা আরও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে দেশের নাগরিক হিসাবে মূল্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে আমাদের দায়িত্ব অনেক ।সন্তান বেড়ে ওঠার সময় প্রত্যেক বাবা মাকে চোখ কান খোলা রাখতে হবে তার সন্তানটি যেন কুলাঙ্গার না হয় , যেন অন্য বাবা মায়ের কোল খালি না করে।নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তি স্থাপন হয় পরিবার থেকেই ।যা মেধাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

লেখক- এলিজা খাতুন

আবরার হত্যার নারকীয় ঘটনায় সরকার প্রধানকে অতীব সোচ্চার হওয়া বাঞ্ছনীয়। নয়তো লাগামছাড়া পিশাচেরা আরো আরো মেধার ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠবে।বর্তমান ছাত্ররাজনীতিকদের ঘিরে যদি রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সাজাতে চায় তবে সেটার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে এখনই নীতিগত বিবেচনায় ছাত্রসংগঠন ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে বৃহৎ সংস্কার ও সুনীতি আনা অপরিহার্য।

কিছু সুবিধাবাদীর কারণে সরকারের ভালো কাজের উদ্দ্যগ ব্যহত হচ্ছে এটা প্রতীয়মান।জাতীয় সংসদের হুইপ ক্যাসিনো অভিযানের বিরুদ্ধে কথা তুলেছেন- কারা দেয় খেলোয়াড়দের টাকা ? এতে নিশ্চয়ই সরকারকে পরোক্ষভাবে হেয় করা হয় ! ঠিক তেমনি আবরার হত্যাকারীদের বাঁচানোর ষড়যন্ত্রে নামবে কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থ-উদ্দেশ্যে। এহেন ধৃষ্টতা রুখে দিতে সরকার প্রধানকে বিনীত অনুরোধ করছি।

অপরাধীরা কোন্ রাজনৈতিক দলের সেটাকে প্রাধান্য না দিয়ে অপরাধীকে “অপরাধী” হিসেবে দেখুন দয়া করে এবং ভবিষ্যতের মেধাগুলোকে নিরাপত্তা দিন।

 

 

 

লেখক : গল্পকার, কবি ও প্রাবন্ধিক । ইমেইল- alizasat335@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

হঠাৎ করেই নেহা কক্করকে চুম্বন

ডেস্ক নিউজ :: একটি রিয়েলিটি শোয়ের অডিশন চলছিল। সেই সময় হঠাৎ করেই ...