গুরুপ্রসাদ মহান্তি-র বৈশাখি গদ্য ‘একলা এসো’

গুরুপ্রসাদ মহান্তিগুরুপ্রসাদ মহান্তি

-একলা এসো

 

একলা এসো। একলাই। এমনটি বললে অনেকে অনেকরকম ইঙ্গিত করতে পারেন। আহ্বানটি যদি পরিণত বয়সের কারও হয়, এবং হয় কোনও যুবতীর প্রতিতাহলে তো কথাই নেই। ইঙ্গিতটি নিয়ে আবার মতভেদও থাকতে পারে। কেউ একে বলবেনমন্দ। কারও মতে, একে অন্যায়ই বা বলতে হবে কেন?

ভালো হোক বা মন্দএকটা ইঙ্গিতপূর্ণ দিক থেকেই যাবে এই একলা আসায়। আসলে একলা আসায় বিশিষ্ট ইঙ্গিতময়তা। বিশিষ্ট আহ্বানে যদি ১লা বৈশাখকে ডাক দেওয়া হয়তবে পার্থিব ইঙ্গিতময়তা মুহূর্তে নস্যাত্ যায়।

একটি নিরীহ আহ্বান অথচ সে ডাকের অন্তহীন ব্যঞ্জনা। কেননা ডাক যে কালকে। মহাকালের একাংশ এই কাল। কালাংশ হচ্ছে দিবস। বাঙালির জীবনে বর্ষগণনার প্রারম্ভিক দিবস ১লা বৈশাখ। তার প্রতি ডাকএসো হে, এসো হে। আসলে পয়লা ব্যাপারটি একবারেই প্রারম্ভিক। এবং প্রথমের একটি বিশিষ্টতা থেকেই যায়। পয়লা প্রেম, পয়লা কবিতার বইপ্রথম সবেরই মাহাত্ম্য আলাদা। বছর শুরুর পয়লা বৈশাখ আসলে একলা। এবং একক। এক আবার অখণ্ডের ঘরের। অখণ্ডের, অসীমের। অনন্তের। তাই ১লা বৈশাখে আদতে অনন্তেরই তো আরাধনা।

অনন্ত অথচ পুরোপুরি মূর্তিহীন নয়। রূপের মধ্যেই বাঙালি অরূপের সন্ধানী। যেমন পরমহংসের কালীরূপে তিনি কালী। অরূপত্বে তিনিই ব্রহ্ম। বাঙালি ১লা বৈশাখকে একলা ডেকে আদতে ব্রহ্মোপাসনাই তো করে চলেছে। আগেও করেছে, এখনও।

একলা পয়লা বৈশাখকে ডাকে বটে, অথচ আহ্বানটি প্রত্যেকের কাছেই বিশিষ্ট। আসলে যার যার কাছে ১লা বৈশাখ আসুক সে যেন তাবত্ রূপ-রস-রঙ্গ সঙ্গে নিয়ে আসে। কণ্ঠটায় অনির্দেশ্য সত্যসর্বে সন্তু নিরাময়া। সত্য উচ্চারণআনন্দ বয়ে নিয়ে এসো হে, সম্পন্নতা নিয়ে এসো হে। সম্বত্সর যেন সুখে কাটে। বাঙালি ব্যবসায়ীরা পয়লায় হালখাতা করেনলক্ষ্য তো সম্পন্নতাই। এবং স্বয়ম্ভরতা। কিন্তু এটিই ঠিক, সবাই মাত্র অর্থার্থীই হয়নি। বাঙালি মেধার চর্চা করেছে, মননের চর্চাও। সংসারে বাঙালি এগিয়ে। গড়ে তুলেছে বঙ্গসংস্কৃতি। সেখানে কত কত নাম এসেছেশ্রীচৈতন্য, পরমহংস, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দআরও কত। প্রতিটি সম্পন্ন নামপ্রত্যেকেই আদতে বঙ্গ সংস্কৃতিকেই করেছেন সম্পন্ন।

এক একটা নামএক এক প্রতিষ্ঠান। সকলেই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। আবার এই স্বকীয়তা বা নিজস্বতায় তো রয়েছে একলা থাকার গৌরব। বন্ধু হে, তাই একের আমন্ত্রণ জানাতে বৈশাখকেও সম্বোধন করেছে বাঙালি ১লা।

অবশ্য লা শব্দটি বিদেশি ভাষায় মহার্ঘ্য। শুধু তাইই বা কেন? লা শব্দে বঙ্গসাহিত্য একেবারেই তো আর বঞ্চিত নয়। ওলো সই তো কখনও কখনও লা সইও হয়েছে। লা নুই বেঙ্গালি লেখার সঙ্গে বঙ্গযোগ প্রতিষ্ঠিত। ন হন্যতের লেখিকা প্রতিষ্ঠা দিয়েছেনবঙ্গের সঙ্গে বিশ্বযোগের। লা শব্দটি সেখানে বিশিষ্টার্থে এসেছে। মির্চা ইলিয়াডের নামও।

বাঙালি পরবে নববর্ষ নব হরষ নিয়ে আসে। আসবে। প্রত্যেকেরই প্রত্যাশা এইরকম। একে অন্যকে নববর্ষে সম্ভাষণ করে। আগে চিঠি ছিল, এখন পরিবর্ত পদ্ধতি। মেসেজ, মেল। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে উপচে পড়া শুভেচ্ছা। ডাক ব্যবস্থা হারাই হারাইচিঠি লেখার অভ্যেস নেই কারও।

অভ্যেসে বদল তো হয়েইছেবদল ঘটেছে অনুষ্ঠানপর্বে। আগে লেখকের পরব ছিল পয়লা বৈশাখ। গরবও। এখন সেই রমরমা আর নেই লেখকের। নামে হাতে গোনা কয়েকটি প্রকাশন সংস্থা নমো নমো করে আচারটি ধরে রাখতে চাইলেও তাঁদের বইপ্রকাশের মহাকাল বইমেলা। এখন বাংলা ক্যালেন্ডারের কদর কমেছে। ক্যালেন্ডার এখন অ্যান্ড্রয়েট সেটেই তো ঘুরছে। পঞ্জিকা অবশ্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। বাঙালির অনেকের কাছেই তা অবশ্য সংগ্রহযোগ্যএর তালিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

বাঙালির হাঁড়িতে অনন্য রন্ধনস্বাদই বা আর মিলছে কোথায়? আগে ভোজনরসিক বাঙালি ভরপেটের সন্ধানী ছিল। বাজার করত, বাড়িতে রান্না চাপত, হরেক কিসিমের। এখন? বাঙালি আহার অর্ডার করতে হয় রেস্টুরেন্টে, হোটেলে। গিন্নিবান্নিরা রাঁধতে জানেন না। অনলাইন অর্ডারে কাঁচকলার কোপ্তা, এঁচোড় দোরগোড়ায় আসবে। বাঙালি গিন্নিরা ১লা বৈশাখ পালনে কিছুটা আরাম বাণিজ্য করতে চাইবেন বৈকি!

তাই একলা এসো পয়লা বৈশাখ। বিশিষ্ট ব্যঞ্জনায়। প্রত্যেকের একলার একলার ঘরে। যৌথ পরিবারে আসার রীতি-রেওয়াজ যে ১লা বৈশাখকে ভুলতেই হচ্ছে এখন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

Rajesh Bojrokontho

৫০০ পেরিয়ে কবিতা পত্রিকা দৈনিক বজ্রকন্ঠ,তোলপাড় বিশ্ব সাহিত্য

স্টাফ রিপোর্টার ::  বাংলা সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করল কবিতা পত্রিকা ‘দৈনিক ...