গুজবে গণপিটুনিতে নারীর মৃত্যু: গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম

তাসলিমা বেগম রেনু

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: সন্তানকে ভর্তির জন্য স্কুলে খোঁজ নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক হতভাগ্য মা। তার নাম তাসলিমা বেগম রেনু (৪০)। শনিবার সকালে রাজধানীর বাড্ডায় এ ঘটনা ঘটলেও এই হতভাগ্য মায়ের পরিচয় মিলে রাতে। নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার লাশ সনাক্ত করেন।

এদিকে এ ঘটনায় নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শোকের মাতম চলছে। নিহতের পরিবারের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রবিবার সকালে নিহতের গ্রামের বাড়ি জেলার রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। তারা এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করেছেন। এক ভাই ও চার বোনের মধ্যে রেনু সবার ছোট।

তাসলিমা বেগম রেনু লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের আলাউদ্দিন মাঝি বাড়ির মৃত আবদুল মান্নানের মেয়ে। তিনি মহাখালীর ৩৩/৩ জিপি জ ওয়ারলেস গেইটে থাকতেন। এর আগে তিনি স্কুলের পাশে আলী মোড় এলাকায় স্বামী তসলিম হোসেনের সাথে পরিবার নিয়ে থাকতেন। দুই বছর আগে পারিবারিক কলহের কারণে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়।

এরপর থেকে সন্তানদের নিয়ে মহাখালীতে বাসা ভাড়া করে থাকতেন। তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসাবে চাকরি করতেন। তার মাহিন হোসেন ও তুবা তাসনিম নামে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

গ্রামের বাড়িতে কথা হয় নিহতের বোন সেলিনা আক্তারের সাথে। তিনি জানান, তাসলিমা ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে ঢাকায় বসবাস করতেন। কয়েক বছর পূর্বে উত্তর বাড্ডা এলাকার তসলিম উদ্দিনের সাথে তার বিয়ে হয়। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। গত দুই বছর আগে পারিবারিক কলহের কারনে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।

তিনি আরো জানান, গতকাল শনিবার তাসলিমার সন্তান তুবা তাসনিমকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য খোঁজ নিতে উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। তিনি ছেলেধরা ছিলেন না। কিন্তু সে সময় স্থানীয়রা তাকে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনি দেয়। আর সেখানেই তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন থাকতে ওই এলাকার লোকজন তাকে পিটিয়ে হত্যা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এর বিচার দাবি করেন তিনি। এখন তার সন্তানদের কি হবে, কোথায় পাবে তারা তাদের মাকে। কাকে তারা আম্মু বলে ডাকবে, কাকেই বা জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। এমন কথাগুলো বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

তাসলিমার চাচাতো ভাই হারুনুর রশিদ ও এলাকাবাসী বলেন, তাসলিমা শিক্ষিত মেয়ে। সে শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়েই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এত অল্প বয়সে সে দুনিয়া থেকে চলে যাবে, তা ভাবতে পারিনা। এ সময় তাসলিমাকে মিথ্যা অজুহাতে যারা মেরে ফেলেছে, তাদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি করেন তারা। যাতে তাসলিমার মত অন্য কাউকে নির্মমভাবে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে না হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রিয়াজ উদ্দিন বলেন, নিহতের লাশ গ্রামের বাড়িতে আনা হচ্ছে। পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। তবে তিনিও এ ঘটনার সুষ্ট বিচার দাবি করে বলেন, ছেলে ধরা গুজব রটনাকারীদেরকে শনাক্ত করে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি দাবী জানান।

এদিকে তাসলিমা বেগম রেনুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বাড্ডা থানায় ৪০০-৫০০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত রেনুর ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর- ৩০।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

এইচএসবিসি পুরস্কার পেল আট প্রতিষ্ঠান

স্টাফ রিপোর্টার ::  দি হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) আট প্রতিষ্ঠানকে ...