গার্লস গাইড শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলিত করে

গার্লস গাইড শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলিত করে
রহিমা আক্তার মৌ :: গার্লস গাইড ও স্কাউট এর এক অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন- ‘গার্লস গাইড ও স্কাউট শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলিত জীবন গঠনের শিক্ষা দেয়। পাঠ্যশিক্ষার পাশাপাশি এ শিক্ষা শিশু-কিশোরদের আত্মপ্রত্যয়ী, পরোপকারী, আত্মনির্ভরশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।’
গার্লস গাইড হলো একটি আন্তর্জাতিক, অরাজনৈতিক, শিক্ষা ও সমাজ সেবামূলক যুবা আন্দোলন। স্বাস্থ্য ও চরিত্ৰ গঠনে মানবিক গুণাবলি বিকাশে এবং একজন বালিকা বা কিশোরীকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই আন্দোলনের সৃষ্টি। এর মূলমন্ত্ৰ হলোঃ সদা প্ৰস্তুত থাকা। যার অর্থ- একজন গাইড, তার মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে এমনভাবে উপযুক্ত ও উপযোগী থাকবে, যাতে করে সে, যে কোনো ধরণের জরুরি পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারে।
২৫-২৭ এপ্রিল তিনদিন যাবৎ বাংলাদেশ গার্লস গাইড কোম্পানি আয়োজনে ক্যাম্পিং ২০১৯ অনুষ্ঠিত হলো বটমলী হোমস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ক্যাম্পিং এর ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন অতিরিক্ত আঞ্চলিক কমিশনার, রাজধানী অঞ্চল, হোসনে আরা বেগম ( স্কুলের হেনা দিদি)। সহকারী ক্যাম্প কমান্ডার লাকী ফ্লোমেন্স কোড়াইয়া। গার্লস গাইডের সদস্যদের মাঝে ব্যাজ/ ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট এর দায়িত্বে ক্যাম্প কমান্ডার হোসনে আরা বেগম।
অনুষ্ঠিত ক্যাম্প বুলেটিন প্রস্তুতকরণে ছিলেন চন্দনা দিদি, শুভ্রা দিদি, সাজেদা দিদি ও ক্যাম্প রেঞ্জাররা। নৈপুণ্য সুচকের দায়িত্বে, হেনা দিদি, সাজেদা দিদি, চন্দনা দিদি, লাকী দিদি, শুভ্রা দিদি, সিনথিয়া দিদি ও শারমিন দিদি। ক্যাম্পের ফায়ার পরিচালনায় স্কুলের গার্লস গাইডের মেয়েরা, সহযোগিতা ও অনুষ্ঠান প্রস্তুতকরণে ছিলেন সুনীতি দিদি, লিজা দিদি। ২৫ এপ্রিল গার্লস গাইডের সদস্যরা রান্নার আয়োজন করে। ২৬ এপ্রিল ও ২৭ এপ্রিলের খাবারের দায়িত্বে ছিলেন লাকী দিদি ও শুভ্রা দিদি।
দীক্ষাদান এর মাধ্যমে ক্যাম্প শুরু হয় ২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকাল আটটায়। ক্যাম্প ফায়ার অনুষ্ঠিত হয় ২৭ এপ্রিল শনিবার বিকেল চারটায়। ক্যাম্প ফায়ারের প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্রদ্ধেয় ফাদার কোমাল কোরাইয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষীকা সিস্টার মেরী সীমা (এস এম আর এ)। স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষীকা সিস্টার মেরী দীপ্তি (এস এম আর এ), প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার ও কার্য নির্বাহ কমিটির সদস্য ড. মারুফী খান। জেলা কমিশনার সেলিনা চৌধুরী। গুলশান থানা মাধ্যমিক একাডেমিক সুপার ভাইজার নাজমুন নাহার। অতিরিক্ত আঞ্চলিক কমিশনার, রাজধানী অঞ্চল হোসনে আরা বেগম। এটি এন বাংলার রন্ধন শিল্পী কাজী আলিয়া। বটমলী হোমস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী, ট্রেজার গুলশান বনানী গাইড জেলা মাহমুদা বেগম আপন। মাসুদা বেগম সেক্রেটারি গুলশান বনানী গাইড জেলা। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষিকা, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা সিস্টার মেরী দীপ্তি (এস এম আর এ)বলেন, “তোমরা নিজেরা মানুষ হও জীবনকে তৈরি করতে শিখ। মনে রাখবে যে শপথ নিয়ে তোমরা গাইডে এসেছো তার অবমাননা যেন না হয়। জীবনে সাফল্য আনতে হলে চেষ্টার কোন বিকল্প নেই। লেখাপড়া যেমন তোমাদের শিক্ষিত করবে, সততা ন্যায়পরায়ণতা তোমাদের সুশিক্ষিত করে তুলবে।”
থানা মাধ্যমিক একাডেমি সুপার ভাইজার নাজমুন নাহার বলেন,” সব গাইডার বালিকা, কিন্তু সব বালিকা কিন্তু গাইডার নয়। আজকাল শুধু লেখাপড়া দিয়ে কিছুই হয় না, নিজের জন্যে দেশের জন্যে তৈরি হতে হবে তোমাদের। মনে রাখবে এখান থেকে কিন্তু নেতৃত্বের সৃষ্টি হয়। নামে মাত্র অনেকে গার্লস গাউডের সদস্য, তারা এর সপথ মেনে চলে না। তবে যে কয়টি প্রতিষ্ঠান গাইড ক্যাম্প করে তাদের মাঝে তোমাদের স্কুল প্রথম দিকেই আছে। তোমরা এগুলোর পাশাপাশি লেখাপড়াও করবে।”
অভিভাবক প্রতিনিধি ওবায়দুর রহমান বলেন, “ভাল কাজ করতে, অন্যের উপকার করতে দীক্ষা নিয়েছ তোমরা। সু নাগরিক হবার দীক্ষা নিয়েছ তোমরা। অতীতে যে ভাবে অবদান রেখেছে তোমাদের স্কুল তোমরাও সেই ভাবে অবদান রাখবে।”
গার্লস গাইড শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলিত করে
স্কুলের গার্লস গাইডের ইতিহাস তুলে ধরেন আঞ্চলিক কমিশনার স্কুলের শিক্ষিকা হোসনে আরা বেগম। তিনি বলেন- “১৯৪৩ সালে পাকিস্তান গার্লস গাইডের আমন্ত্রণে অরফানেন্সের মেয়েদের নিয়ে গার্লস গাইড কোম্পানি  এসোসিয়েশন এর হেড অফিস করাচিতে প্রথম রেজিষ্টেশন করা হয়। ১৯৪৬ সালে সদস্য হয় ২৫ জন। সেই থেকে শুরু হওয়া গার্লস গাইড ২০০৫ সালে রাজধানী অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ গাইড পুরস্কৃত হয়। ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গার্লস গাইডের শিক্ষক হিসাবে স্বর্ণপদক লাভ করি আমি। আমাদের স্কুলে বর্তমানে নয়জন গাইডার আছেন, যারা সব সময় গার্লস গাইডের সদস্যদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।”
গার্লস গাইড কোম্পানির এই ক্যাম্পে তিনদিনই রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি গাইডের মেয়েদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তার মাঝে ছিলো, অগ্নি নির্বাপক প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রাথমিক ধারণা, ফিট মূর্চ্ছা যাওয়া ও জ্ঞান হারানো, রক্তক্ষরণ ও রক্তক্ষরণ বন্ধের প্রতিকার, ক্ষত ও ক্ষতের শুশ্রূষা, পোড়া ও পোড়ার শুশ্রূষা, বিষক্রিয়া /কামড়, হাড় ভাঙ্গা ও অনড়করন, রোগী পরিবহন, মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
স্কাউট ও গার্লস গাইড আন্দোলনের প্ৰতিষ্ঠাতা হলেন, লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল। তিনি জাতিতে একজন ইংরেজ এবং পেশায় একজন সৈনিক ছিলেন। তিনি মেয়েদের নিয়ে স্কাউট আন্দোলন আরম্ভ করার জন্য তাঁর বোন এ্যাগনেস ব্যাডেন পাওয়েলকে অনুরোধ জানান। এতে তিনি উত্‍সাহিত হয়ে এই আন্দোলন শুরু করেন। এরপর তাঁর স্ত্ৰী অলিভ লেডী ব্যাডেন পাওয়েল গাইড আন্দোলনকে ফলপ্ৰসূ করে তোলেন এবং এই আন্দোলনকে সম্প্ৰসারিত করার জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী ভ্ৰমণ করেন। এর উন্নয়নের জন্য এবং এই আন্দোলনটিকে জনপ্ৰিয় করে তোলার জন্য তিনি বিশ্বনন্দিত হন। এরপর আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে এই গার্ল গাইডিং আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশন একটি জাতীয় সংস্থা হিসেবে জাতীয় সংসদের অনুমোদন লাভ করে। ১৯৭৩ সালে এ অ্যাসোসিয়েশনকে মেয়েদের শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানরূপে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়, এবং ওই বছরই এ সংগঠন ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করে। গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় গাইড পরিষদ, আঞ্চলিক গাইড পরিষদ, জেলা গাইড পরিষদ এবং উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় গাইড পরিষদ। বাংলাদেশে ৭টি অঞ্চলের মাধ্যমে গার্ল গাইড কর্মসূচি পরিচালিত হয়। অঞ্চলগুলো হলো ঢাকা শহর, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট। গার্ল গাইড ৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী বালিকা, কিশোরী ও তরুণীর জন্য এমন একটি সার্বজনীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে যেকোন পরিস্থিতির মোকাবেলা ও পরিবর্তনশীল বিশ্বের উপযোগী নাগরিক হতে শিক্ষা দেয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্পূরক শিক্ষা হিসেবে গার্ল গাইড শিক্ষা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত বিষয় হলো গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিকতা ও প্রতিযোগিতা। মেয়েদের বয়সের ভিত্তিতে গার্ল গাইডের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ৪টি শাখায় বিন্যাস করা হয়েছে: ১. হলদে পাখি (৬-১০ বছর), এর মূলমন্ত্র সাহায্য করা; ২. গার্ল গাইড (১০-১৬ বছর), এর মূলমন্ত্র সদা প্রস্ত্তত থাকা; ৩. রেঞ্জার (১৬-২৪ বছর), এর মুলমন্ত্র সমাজসেবা; ৪. যুবনেত্রী গাইড (২৪-৩০ বছর)।
বিশ্বে গার্ল গাইড ও গার্ল স্কাউট পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত: এশিয়া-প্যাসিফিক, আফ্রিকা, ইউরোপ, ওয়েস্টার্ন হ্যামিসফেয়ার ও আরব। এ পাঁচটি অঞ্চলে চারটি বিশ্ব গাইড কেন্দ্র আছে। বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিটি জেলায় গার্ল গাইডিং আছে। এর মূলমন্ত্র সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালবাসা এবং ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসরণ। একজন দীক্ষিত গাইড সারা জীবনই গাইড, যার ব্রত প্রতিদিন অন্তত একটি ভালো কাজ করা। এ ভাল কাজের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা সমাজ উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রবীণসেবা, আয়বর্ধন কর্মসূচি গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজ ও সমষ্টির উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে।
গাজীপুর জেলার বারিপাড়ায় অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ক্যাম্প রয়েছে। সারা বছরে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ক্যাম্পে অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক। ঝাঁক অবকাশ এবং তাবুবাসের মাধ্যমে হলদে পাখি, গাইড, রেঞ্জার, গাইডার এবং কমিশনারগণ সর্বপ্রথম বুঝতে পারেন যে, দায়িত্ব লাভের সুযোগই নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও গুণের পুরস্কার। গাইড শিক্ষা কার্যক্রমের প্রায়োগিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম দৃঢ় করার লক্ষ্যে নেত্রী-সদস্যদের জন্য রয়েছে ৮ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি : হলদে পাখি গাইডার, গাইড গাইডার, রেঞ্জার গাইডার, স্থানীয় অ্যাসোসিয়েশন সদস্যা ও কমিশনার, ক্যাম্প ক্রাফ্ট, ওয়ারেন্ট গাইড ওরিয়েন্টেশন, লোন ট্রেনার ওরিয়েন্টেশন এবং প্রয়োজনে ১ বছর মেয়াদী জুনিয়র ট্রেনিং সার্টিফিকেট কোর্স।
বটমলী হোমস স্কুলের গার্লস গাইডের মেয়েরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে অংশ গ্রহন করে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান নামে মাত্র গার্লস গাইড সদস্য নির্বাচন করেন কিন্তু এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিজেদের অর্জন দিয়ে প্রথম দিকেই স্থান দখল করে আছে।
লেখক : সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক। rbabygolpo710@gmail.com
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

International Museum Day

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস

রহিমা আক্তার মৌ :: ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামসের (আইসিওএস) আহ্বানে ১৯৭৭ সাল থেকে ...