খুলন-৬

মহানন্দ অধিকারী মিন্টু, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি  :: সুন্দরবন উপকূলী আসন খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা উপজেলা)। সংসদীয় আসন ১০৪। একটি পৌরসভা, ১৭টি ইউনিয়নে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ১শত ৯২জন। এর মধ্যে পাইকগাছায় ২লাখ ৯হাজার ২শত ৯৭জন আর কয়রায় ১লাখ ৫৬ হাজার ৮শত ৯৫ জন ভোটার। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণা হয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন।

তবে শেষ মূহুর্তে আসনটিতে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে বিভিন্ন দিক বিববেচনা ও তৃণমূলে প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও অন্তিম সময়ে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকতে কেন্দ্রমূখী থাকায় নির্বাচনী এলাকায় তেমন উত্তাপ পরিলক্ষিত না হলেও স্ব স্ব প্রার্থীদের এগিয়ে রেখে মাঠ গরম করে রেখেছেন রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অনুসারীরা।

প্রার্থী মনোনয়নে সবচেয়ে প্রাধান্য পাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও দীর্ঘ দিন সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় ঐক্যজোট বা জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। এক্ষেত্রে বিএনপির মধ্যে প্রার্থী মনোনয়নে বিশেষ সমস্যা দেখা না দিলেও দর কষাকষি চলছে জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জামায়াতের প্রার্থীতা নিয়ে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মধ্যে শরকিদের নিয়ে সমস্যা না হলেও দলীয় সাবেক, বর্তমান সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি হেভিওয়েট ও তরুণ উদীয়মান একাধিক প্রার্থীর বহর নিয়ে প্রার্থী মনোনয়নে খানিকটা হলেও বেকায়দায় রয়েছে ক্ষমতাসীনরা।

সর্বশেষ গত ১০ম নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচনের বাইরে থাকায় আওয়ামী লীগের প্রাথীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী আলোচনায় বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে। এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন রেকড পরিমান। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে ভুল হলে এ আসনটি আওয়ামী লীগের হাত ছাড়া হবার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ।

এক্ষেত্রে কখনো প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, কখনো সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রশীদুজ্জামান আবার কখনো জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাবুসহ বর্তমান এমপি অ্যাড. নূরুল হকের মনোনয়ন প্রাপ্তির বিষয়টি নিয়ে সর্বত্র আলোচনার ঝড় উঠছে। তবে নিশ্চিত হতে আরো ২ এক দিন অপেক্ষ করতে হবে প্রকৃত পক্ষে আওয়ামী লীগের নৌকার টিকিট কার হাতে উঠছে।

প্রসঙ্গত, কয়রা ইউনিয়ন ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের অ্যাড. স ম বাবর আলী, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী ২য় নির্বাচনে সাবেক স্পীকার অ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী, ১৯৮৬ সালের ৭ মে ৩য় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোমি উদ্দীন আহম্মেদ, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ ৪র্থ নির্বাচনে একই দলের জহুরুল হক, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী ৫ম নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর ৬ষ্ট নির্বাচনে বিএনপি’র শেখ রাজ্জাক আলী, একই বছর ১২ জুনের ৭ম নির্বাচনে আওয়ামীলীগের অ্যাড. শেখ নূরুল হক, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর ৮ম নির্বাচনে জামায়াতের অধ্যক্ষ শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে অ্যাড. সোহরাব আলী সানা ও সর্বশেষ গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই দলের অ্যাড. শেখ নূরুল হক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

গত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৪ বার, বিএনপি ২ বার, জাতীয় পার্টি ২ বার ও জামায়াতে ইসলামী ২ বার করে নির্বাচিত হলেও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এলাকাবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় কারা পাচ্ছেন কোন দলের মনোনয়ন টিকিট? এর আগে দেশের ৪ টি বড় রাজনৈতিক শক্তি মোর্চা ও আলাদা আলাদা ভাবে নির্বাচিত হলেও এবার নির্বাচনে দলগুলো মূলত ২টি জোট ভূক্ত হয়ে নির্বাচন করছে। সেক্ষেত্রে সাধারণ ভোটারদের প্রশ্ন বিএনপি কি পারবে হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করতে? নাকি ৫ম বারের মত আসনটি ধরে রাখবে আওয়ামী লীগ? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও প্রাধান্য পাচ্ছে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি থেকে আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যসহ ১৬জন, বিএনপি থেকে ৬ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ২ জন এবং জামায়াত ইসলামী থেকে ১ জন মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছেন। মোর্চাগত নির্বাচনে বিএনপি বরাবরই আসনটিতে জামায়াতকে ছাড় দিলেও এবার আর ছাড় দিতে নারাজ। তবে এলাকাবাসীর অভিমত আসনটিতে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের অবস্থান অনেক ভালো। সেক্ষেত্রে জোটগত নির্বাচনে জামায়াতকে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী দিলে অবাক হওয়ার থাকবেনা। মূলত বরাবরই আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সাথে জামায়াত প্রার্থীর। সেক্ষেত্রে আসন্ন নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী দিলে পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী না হলে আসনটি ধরে রাখতে বেগ পেতে হবে আওয়ামীলীগকে।

এব্যাপারে পাইকগাছা উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক ও সাবেক প্যানেল মেয়র শেখ আনিছুর রহমান মুক্ত জানিয়েছেন, এই আসনটি মুলত আওয়ামীলীগের। এখানে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা সন্তোষজনক না। সে কারনে আওয়ামীলীগের দলীয় প্রার্থী দেওয়ার জন্য তিনি দলটির সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক এমএনএ শহীদ এম এ গফুরের জেষ্ঠ্য পুত্র আনোয়ার ইকবাল মন্টু বলেন, আওয়ামী লীগের বিকল্প শরীকদের ছেড়ে দিলে হাতছাড়া হতে পারে আসনটি। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাড. শেখ নূরুল হক, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. সোহরাব আলী সানা, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক গাজী মোহাম্মদ আলী, জেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আক্তারুজ্জামান বাবু, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক ডা. মোহা. শেখ শহীদ উল্লাহ, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. রশীদুজ্জামান, ইঞ্জনিয়ার প্রেম কুমার মন্ডল, মনিরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মাওলা, জিএম কামরুল ইসলাম, এস এম বাহারুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান, জি এম মোহসিন রেজা, এস এম শফিকুল ইসলাম ও আলমগীর হোসেন।

বিএনপি’র দলীয় মনোনয়ন কিনেছেন, জেলা বিএনপি’র সভাপতি অ্যাড. এস এম শফিকুল আলম মনা, সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান মন্টু, পাইকগাছা উপজেলা আহবায়ক ডা. আব্দুল মজিদ, কয়রা উপজেলা সভাপতি অ্যাড. মোমরেজুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ শামসুল আলম পিন্টু ও সাবেক ছাত্রদল নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক। জাতীয় পার্টি থেকে দলীয় মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছেন, দলটির জেলা সভাপতি শফিকুল ইসলাম মধু ও পাইকগাছা উপজেলা কমিটির আহবায়ক মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর।

জামায়ায়ে ইসলামীর একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন কিনেছেন, মাও. আবুল কালাম আজাদ। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও পাইকগাছা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাও. শেখ কামাল হোসেন জানিয়েছেন, প্রথম থেকেই আসনটিতে কাজ করে আসছেন তারা। ছিটটি অতীতেও তাদের ছিল। এখান থেকে তারা (জামায়াত) দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। যেহেতু অতীতে এটি জোটের থেকে আমরা নির্বাচন করে আসছি সেকারনে জোটবদ্ধ নির্বাচনে আসনটি তাদের ছেড়ে দেয়া হবে।

এছাড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মাও. নুর আহাম্মদ ও সিপিবির একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন কিনেছেন সুভাষ সানা মহিম। এখন শুধু অপেক্ষার পালা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোট থেকে খুলনা-৬ কাদের প্রার্থী করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here