ব্রেকিং নিউজ

কি করবে এখন কৃষক ?

লেখক- জুঁই জেসমিন

 

জুঁই জেসমিন :: হ্যাঁ কৃষকের মুখে হাসি নেই। ফিকে হয়ে যাচ্ছে কৃষকের চির সবুজ হাসি। অন্তর প্রান্তর আগুনের খেলা। কৃষিই যাদের বেঁচে থাকার ভরসা, সেই কৃষিই আজ হতাশার শিরোনাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোনালি ফসল চেয়ে এক বুক স্বপ্ন কৃষক পরিবারের ঘরে ঘরে। সেই পরিবারের ছোট্ট মেয়েটি ঈদে নতুন জামা না পেলে কেমন হবে। ভাবুন? ছোট্ট মেয়েটির স্বপ্ন। বাবা কথা দিয়েছে নতুন ধান বিক্রি করেই নতুন জামা কিনে দেবে। ভাইটিও একটা নতুন শার্ট আর গেঞ্জির আশায় বসে আছে। আর বউ? সেও কত কাল আয়নার সামনে দাঁড়ায়নি। স্বামী নতুন শাড়ী আনলেই পাড়াপড়শিকে দেখার পর পুলকিত মনে স্নান করে, নতুন শাড়ী ঘোমটা দিয়ে আয়নায় নিজের মুখটা দেখবে। কত কাল পর নিজের মুখটা দেখা হয়, শত শত কৃষকের বউয়ের।

নদী ভাঙ্গনের মতো কৃষক পরিবারের মন স্বপ্ন ভেঙে হতাশায় দোল খাচ্ছে। মুখে হাসি নেই, নেই চঞ্চলতা । ধান বিক্রি করে প্রথমেই ওষুধের দোকানে বকেয়া দেনা শোধ ও ফসল উৎপাদনে যা সার বিষ কীটনাশক ওষুধ বাকিতে নেওয়া হয়, তা পরিশোধ করা লাগে। উৎপাদন খরচের তুলনায় ফসলে উপযুক্ত লাভ আসে না কৃষকের। ফসলে দাম নেই, ন্যায্য মূল্যের জায়গায় উৎপাদন খরচটাও উঠে না। সিংহভাগ অর্জিত অর্থ যেখানে ওষুদের পিছনে চলে যায় প্রত্যেক পরিবারে, সেখানে ভালমন্দ খাওয়াটুকু হয় না। ছেলেমেয়ের পড়া লেখার খরচ, বিদ্যুৎ বিল, ওষুধ বিল, ঋণ শোধ, সব সব মিলে খুব করুণ অবস্থা কৃষক শ্রেণীর।

যেখানে গরুর মাংস ৫ শত টাকা সেখানে কি ৪শত টাকায় এক মন ধান বিক্রি করে ওষুধ, নুন তেল, পিয়াজ, সবজি, কিনে দু’ ছটাক মাংস কিনার অবশিষ্ট থাকে ? থাকে না। যেখানে বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, কৃষিনিভর দেশ। সেখানে সেই কৃষকরা আজ বড় অসহায়। অভাবের পীড়ায় তারা জর্জরিত। তাদের মুখে মাসে দুবারও মাছ মাংস পরে না। এক কেজি ইলিশের দাম হাজার বারোশো টাকা। আর ধানের মন চার শত পঞ্চাশ। কি করবে কৃষক ? দোকানের মাছ আর মাংস দেখে যেন কবি শুকান্তের কবিতার মতো মন ও নয়ন হাজার মানুষের কথা বলে- ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়….

পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। সত্যিই ক্ষুধার রাজ্যে দেশ গদ্যময় হয়ে গেছে, কৃষকের মাথায় হাত। ফসলের প্রাপ্য মূল্য না পেয়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে অন্তত মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতো। নিজ হাতে সোনার ফসল সস্তা দরে তুলে দেওয়া এর চেয়ে কষ্ট আর কি হতে পারে? বর্তমান কৃষকের ছেলে মেয়ে ইলিশের সুস্বাদু স্বাদ কেমন তা তারা জানে না। ইলিশ চোখে দেখা যেন রূপকথার গল্পে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। যেখানে ইলিশ মাছকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালীর সুখকে বলা হতো মাছে ভাতে বাঙালি।

মাছ নেই, ভাতের দাম ঢের বেশি, ধান গম, উৎপাদিত ফসল কল্পনার বাইরে সস্তা। কৃষকের চোয়াল ভেঙে সক্রিয়তা হারাচ্ছে, নেই কোনো উদ্দামতা। যেখানে ফসল উৎপাদনে যাবতীয় সার, বিষ, বীজ, উচ্চ দামে ক্রয় করে ফসল ফলাতে হয় মাথার ঘাম জমিনে ফেলে, সে হারে কৃষক কতটুকু লাভবান হতে পারছে? মোটেও লাভবান হতে পারছেনা! হরলিক্স তো গম দিয়ে তৈরি । কজন কৃষকের সন্তান হরলিক্স খেতে পারে বলতে পারেন?

তাহলে ভাবুন যারা উৎপাদন করে দিনরাত খেটে মরে, তারাই তাদের খুশিমত না পারে কিছু কিনতে, না পারে কিছু ভাল একটা খেতে। ধানের মন বাজারে চারশত পঞ্চাশ টাকা, কদিন বাদেই ঈদ । যে কৃষক একটুকরো ঈদ আনন্দ প্রত্যাশায় আবাদ করলো, ছেলেকে দেবে, মেয়ে জামাইকে নতুন জামা কাপড় কিনে দেবে…

কৃষকদের ঈদ মানেই – মাথায় হাত। পকেটে থাকুক আর না থাকুক মেয়ে জামাইকে দিতেই হবে, সেমাই চিনি কাপড়। শেষমেশ গায়ের ঘাম মুছার জন্য একটা গামছা কিনার সামর্থও জুটেনা। এই হলো বাংলার কৃষকদের অবস্থা এই হলো কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি উন্নয়নশীল বাংলাদেশ। কিন্তু মানুষ এতো আয় এতো পরিশ্রম করাও পরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে উন্নত নয় কেন? কেন উৎপাদন ও আয়ের তুলনায় ব্যয়ের অংক বেড়ে চলেছে? কেন এতো অভাব, এতো হতাশা? কেন মানুষ যে যার চাহিদা মতো ক্রয় করে ভাল মন্দ খেতে পারেনা? কি করবে এখন কৃষক শ্রেণী ?

 

 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী, ঠাকুরগাঁও। jui.jesmin306@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘সব সুখ তোর জন্য’ সিনেমার মহরত

‘সব সুখ তোর জন্য’ সিনেমার মহরত

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: জমকালো আয়োজনে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সব সুখ ...