‘কানটা যেন সত্যিই চিলের কাছে না যায়’

সাজ্জাদুল আলম তনয়সাজ্জাদুল আলম তনয় :: ক্রিকেট! ক্রিকেট!! ক্রিকেট!!! ক্রিকেট নিয়ে আমাদের উন্মাদনা বোধহয় রাজনীতির উন্মত্ততাকেও হার মানায়। কিন্তু যৌক্তিক প্রশ্ন হল কতদিন টিকবে এই উন্মাদনা?

২০০০ সালে বাংলাদেশে ক্রিকেটের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ঢাকার রাজপথ রঙ্গে রঙিন হয়েছিল সেদিন। চারিদিকে খুশি আনন্দের মেলা! একদিনের জন্যে সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দে ভাটা পড়তে বেশী সময় লাগেনি।

যেমন করে এসেছিল ঠিক তেমন করেই ভাগল। তারপর আবার আসলো আরেকটি যুগ। হঠাৎ করেই আবির্ভাব এক তারকার। তিনি বাংলাদেশের প্রাণ সাকিব আল হাসান। বলা যায় তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন জগতে পা রাখে। খেলার মাঠে কর্মীদের চেয়ে দর্শকের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে দিন দিন।

বলা বাহুল্য, আজ ভারতের আই পি এল তাদের দেশে যতটা জনপ্রিয় আমাদের বি পি এল আমাদের দেশে আমাদের নিকট তাঁর চেয়ে কোন অংশেই কম জনপ্রিয় নয়। তবে বিশ্বের ক্রিকেট দুনিয়ায় এই দুই “পিএল” এর জনপ্রিয়তা নিয়ে তুলনা করার আগে যেটা সত্য তা জানা আবশ্যক। ভারতের মিডিয়ার জোর আমাদের চেয়ে বহুলাংশেই বেশী আর তাই যে কোন কিছুতে জনপ্রিয়তা অর্জনের আসল চাবিকাঠি তাদের হাতেই।

২০০৬ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের আগমনের মাধ্যমে ক্রিকেট যে প্রাণ ফিরে পায় তারই সাথে তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম আর মাহমুদুল্লাহ-সাব্বির দের যোগদান এনে দেয় নতুন মাত্রা। যার ধারাবাহিকতা ধরে রাখছেন মুস্তাফিজ আর তাসকিনরা। আমরা হয়ে উঠেছি ক্রিকেট পাগল জাতি। গ্যালারীতে দর্শকের চিৎকার আর চেঁচামেচির শব্দের ব্যাপ্তি সময়ের সাথে সাথেই বাড়ছে। সব শক্তিশালী দেশ  এখন ভয় পায় টাইগারদের।

সাজ্জাদুল আলম তনয়কিন্তু বৈশাখী ঝড় যেমন হঠাৎ এসেই হঠাৎ থেমে যায় তেমনি ক্রিকেটও আমাদের হঠাৎ পাগল বানিয়ে ছেড়ে চলে যাচ্ছেনা তো? সত্যিই ব্যাপারটা চিন্তার বিষয় এবং এসব চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় নানারকম সন্দেহ, জেগে উঠে প্রশ্ন আর উদ্বেগ। যদি এমনটা হয় যে বোর্ড কর্মকর্তারা ক্রিকেটে বরাদ্দ টাকার সদ্ব্যবহার করছেন না? এটা অবাঞ্ছনীয় নয় কেননা পরীক্ষায় ছাত্রের বাজে ফলাফলের পেছনে শিক্ষক মহোদয়ের ভুল থাকতেই পারে। দেখার বিষয় কোনটা ইচ্ছাকৃত আর কোনটা ইচ্ছাকৃত নয়। নাকি ছাত্রেরই আসল সমস্যা?

অনেকেই বলে ক্রিকেটাররা আজ তারকা। তাঁরা এখন খ্যতির চুড়ান্ত পর্যায়ে বসে তারই বিড়ম্বনায় ভুগছেন। তাদের মাসিক কামাইয়ের কথা আর নাই বলি। তবে কি তাদেরও বাঙ্গালীর চিরাচরিত ব্যারামে পেল? যারে “খাইতে দিলে বইতে চায়” আর “বইতে দিলে শুইতে চায়”। ভাববার বিষয় অনেক। যে দেশ দুর্নিতিতে এখনো নজরকাড়া স্থান দখল করে আছে সে দেশে শুরুর কারণটা ঘটে যাওয়া একেবারেই আশ্চর্যজনক হবে না।

সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ভুলও তো থাকতে পারে। উদাহরণসরূপ সদ্য অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজের কথা বলি। ইংল্যান্ডের হয়ে দুই ম্যাচেই ব্যাটিং-এ দশম অর্ডারে নামেন ক্রিস ওকস। যিনি ৫৫ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২২.৯৩ গড় নিয়ে রান সংগ্রহ করেছেন ৬৬৫। অন্যদিকে বাংলাদেশের হয়ে দশম অর্ডারে নামা সফিউল ইসলামের ৫৬ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে রান সংগ্রহ মাত্র ১২৬। তুলনামুলক ভাবে হাস্যকর হলেও সত্য যে তাঁর রানের গড় ৬.৩০। দুর্ভাগ্যবশত দুইজনই প্রকৃতপক্ষে “বোলার”।

সাজ্জাদুল আলম তনয়যদি একবার দুই দলের বোলারদের রানের গড় দেখা হয় তবে গভীর পর্যবেক্ষনে যা লক্ষণীয় হবে তা হল বাংলাদেশের বোলাররা কেবল বোলিং-ই করে যান অন্যদিকে ইংল্যান্ডের বোলাররা সবদিক থেকে থেকে দলকে সাপোর্ট দিতে পারেন যে কোন মুহুর্তে। তাহলে কি আমাদের বোলারদের ব্যাটিং এর ব্যাপারটাও মাথায় রাখা উচিত না? তা না হলে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ২৭১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ২৮৮ রানের মধ্যে অল আউট হয়ে ম্যাচ হারার মত দুঃখ বারবার যন্ত্রনা দিবে আমাদের। ২২৭ রানে ৬ উইকেট পতনের পর ২৬৩ রানে অল আউট হয়ে ম্যাচ হারার পর সাব্বির রহমানের আজীবন মনে থাকবে হয়ত তিনি পারতেন ম্যাচটা জিতাতে যদি ওপাশ থেকে খানিকটা সাপোর্ট থাকতো।

আমরা কখনোই চাইনা ক্রিকেট পাগলা দর্শকে ভরপুর উন্মত্ত স্টেডিয়ামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার বাঘের গর্জনে ভয় পেয়ে যাওয়া বাটলারের মুখে খানিক সময়ের মাঝেই বিদ্বেষের হাসি ফুটে উঠুক স্তিমিত বাঘদের দেখে। আমরা তো এখন ভদ্র জাতি, স্টেডিয়ামে খেলা শেষে খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্য করে বোতল ছুঁড়ে মারি না। তাই বলে ম্যাচ শেষে “জিতলেও তোমাদের পাশে, হারলেও তোমাদের পাশে” লিখে ফেসবুক স্ট্যাটাস আর কতদিন? সময় এসেছে নতুন ভাবে চিন্তা করার। আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রত্নদের খুঁজে বের করার। “চিল তো কান নেয়নি” ভেবে যেন সত্যিই একদিন আমাদের দেখতে না হয় “কানটা চিলই নিয়েছিল”। এটাই হোক সংশ্লিষ্ট সকলের বর্তমান চিন্তার বিষয়।

লেখকের ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যে প্রবেশাধিকার দিবস: সংকটকালে তথ্যে প্রবেশাধিকার

হীরেন পণ্ডিত :: বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারী সময়ে, ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারো ২৮ ...