কাজী লাবণ্য

কাজী লাবণ্য :: দিনের সর্বশেষ সিগারেটটা শেষ করে, গুণে গুণে তিন চুমুক পানি খেয়ে রায়হান নিজকক্ষে ঢুকে যায়। বিদেশি ফিটিংস এর ডোর লকে কখনই শব্দ হয়না। কিন্তু মিমি ঠিক একটা শব্দ পায়। এই নিঃশব্দ শব্দটাই যেন মুক্ত বাতাস নিয়ে আসে মিমির জন্য। শব্দটা পেলেই সে বুকের বাতাসটা ছেড়ে দেয় আর সেটি রাতপাখির ডানায় ভর করে উড়ে যায় চন্দ্রিমা উদ্যানের সবুজ অরন্যে। সেটি উড়ে যায় ঐ দূর নীল নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে, রাত ভোর হয় কিন্তু নক্ষত্রের নাগাল সে পায়না।
বাকি রাতটুকুর মত সে একেবারে মুক্ত স্বাধীন।

সন্ধ্যায় ঝড় হয়েছে।বৈশাখী ঝড়ে বজ্র ছিল। এখানকার ট্রান্সফর্মা বাস্ট হওয়াতে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তাতে আলো বাতাসের সমস্যা নেই। জেনারেটর তো আছেই আবার আইপিএসও আছে। কিন্তু ঝামেলা হল ওয়াইফাই কাজ করে না।
মিমি অপেক্ষা করে।

ওর ঘরজুড়ে প্রচুর বই। মাথার কাছেও বই। একমাত্র এই বইই ওর দিনরাতের সঙ্গী। রায়হান অতি ব্যস্ত মানুষ। ব্যস্ত নিজের কাজ নিয়ে। সে কাজ কর্মের সঠিক খবর মিমিও জানে না। ওদের একমাত্র সন্তান কানাডায় লেখাপড়ায় মগ্ন।বাসায় কাজের লোকজন সহ একা কাটে মিমির দিনলিপি। তবে সে আজকাল আর খারাপ থাকে না। ভালো থাকা শিখে নিয়েছে। উঠে দাঁড়িয়েছে। উঠে দাঁড়ানোর সহায়কগুলির মাঝে আছে বই, আছে বাগান আর বেশ ক’বছর ধরে যুক্ত হয়েছে ফেসবুক।সমস্যা হয়েছে শহর লকডাউন হওয়াতে। রায়হান বাড়িতেই থাকছে। এখন প্রতিদিন শুক্রবার। তার বাড়িতে থাকা মানেই মিমির উপর বাড়তি চাপ।
এখন মিমি পড়ছে পাঞ্জাবী ভাষার খ্যাতিমান লেখক অজিত কৌরের গল্পগ্রন্থ ‘কালো বাতাসের কান্না ও অন্যান্য গল্প’।

এই বইয়ের গল্পের বুনন, বিস্তার, দর্শন, আঙ্গিক, এবং মানবচিন্তার বৃহৎ পরিসরে সে মুগ্ধতা নিয়ে ডুবে আছে। তবে সে যতই ডুবে থাকুক, যেখানেই থাকুক একটা কাজ নিয়মিত করে। শুতে যাবার আগে সে ফেসবুকে একটি পোষ্ট দেয়। যার শিরোনাম “আতাকামা বাগান”।

ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে এই অভিন্ন শিরোনামে লিখে থাকে সে।
তার বন্ধু এবং ফলোয়ারের সংখ্যা অপ্রতুল নয়। তারা মিমির সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের পারিবারিক বয়ানে মুগ্ধ হয়ে নানাবিধ সুললিত মন্তব্যে ভরিয়ে দেয়। কেউ কেউ হয়ত মিমিকে ঈর্ষাও করে। মিমির ছোট ছোট স্ট্যাটাসে থাকে দাম্পত্য সম্পর্কের নানাবিধ টুকরো টুকরো ছবি। প্রেম, মমতা, খুনসুটিতে ভরা সাংসারিক লেখা গুলি সবাই খুব এনজয় করে এবং পাঠকরাও ওর সাথে একাত্ম হয়ে যায়।

আজকের স্ট্যাটাস আগেই লিখে রেখেছে। কেবল পোষ্ট দেবে। চলছে করোনাকাল, মিমি লিখেছে ক’দিন ধরে তারা আলাদা রুমে ঘুমাচ্ছে ‘ফিজিক্যাল ডিস্টেন্স’ মেইন্টেন্সের জন্য। সেখানে ওর হাজবেন্ডের কথা আছে। আলাদা রুমে ঘুমানোর জন্য হাজবেন্ডের আক্ষেপ এবং পাগলামির কথা সুনিপুণ রম্য দক্ষতায় সে ফুটিয়ে তুলেছে। স্যাটায়ার ধর্মী লেখা, পাবলিক খায় ভালো।
অতঃপর ওয়াইফাই এলে মিমি পোষ্ট করল,সুখি দাম্পত্যের গল্পগাথা। রঙিন ফানুশ ফেসবুকের পাতায় উড়ছে। ওয়াও ইমো, লাভ ইমো পড়ছে, কমেন্ট আসছে।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। জানালায় বৃষ্টিভেজা দেবদারুরা মাথা আঁচড়াচ্ছে।

পাশের রুমে রায়হান অপেক্ষা করছে। সময় যাচ্ছে। এখন সে বিছানায় যাবে। সব কিছু তার ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা। অপেক্ষা ব্যাপারটাই বড় বিশ্রি। তার অভিধানে অনেক শব্দের মত অপেক্ষা শব্দটিও নেই। অতঃপর অপেক্ষার অবসান হয়। নেট চালু হয়।
মোবাইল হাতে নিয়ে সে পড়তে থাকে। একবার না একাধিকবার পড়ে, একাজটি তার নিত্যদিনের একটি কাজ। কেন সে করে তা নিজেও জানেনা। মানুষের মনোজগৎ বড় বিচিত্র। যার সাথে গত একযুগ ধরে কোন সম্পর্ক নেই, তার পোষ্ট পড়ার জন্য সে ঘুম বাদ দিয়ে অপেক্ষা করে।

মিমির বন্ধু তালিকায় যে নিয়মিত এবং সবচেয়ে সুন্দর আবেগময় মন্তব্য করে সে পাপিয়া নামের বন্ধুটি। এবং মাঝে মাঝে মিমির কাছে ওর দাম্পত্যের, ওর পরিবারের নানাবিধ কথা খুঁটিয়ে জানতে চায়, অবশ্য রসিকতার সাথে। সেটির আড়ালে আছে একযুগ ধরে আলাদা রুমে ঘুমানো মিমির সম্পর্কহীন স্বামী রায়হান।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here