শামীম আহমেদ :: রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে তারা বিশ্বের প্রথম করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেছে। দুই মাসেরও কম সময়ের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শেষে রাশিয়া এটি যারা নিতে আগ্রহী তাদেরকে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন তার এক মেয়ে ইতিমধ্যে এই ভ্যাক্সিন নিয়েছে, এবং তিনি দাবি করেছেন এটি সকল প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ধাপ পার করেছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে রাশিয়ার এই ভ্যাক্সিন ক্লিনিকাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপ শুরু করবার আগেই ব্যবহারিক পর্যায়ে ছাড়পত্র দিয়ে ভুল করছে। উল্লেখ্য ক্লিনিকাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপেই মূলত বড় সংখ্যক জনসংখ্যার উপর ভ্যাক্সিন প্রয়োগ করে এর কার্যকারিতা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রাশিয়া বলেছে, বর্তমান মহামারীর সময়ে তারা সুনির্দিষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে যেকোন দীর্ঘসূত্রিতা এড়িয়ে গিয়েছে, কিন্তু ভ্যাক্সিনের মানের সাথে কোন সমঝোতা করেনি।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শীতল যুদ্ধ চলছিল, সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর তা আক্ষরিক অর্থেই শীতল হয়ে যায়। গত তিন দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে চীনের নাম যত শোনা গেছে রাশিয়ার নাম তত শোনা যায়নি। ভারত, চীন, ব্রাজিল নানা ক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিশালী করে যুক্তরাজ্য, জার্মানী, ফ্রান্সের কাতারে নিজেদের নিয়ে আসে। অন্যদিকে রাশিয়া এই সময়ে বৈশ্বিক ক্ষমতার লড়াইয়ে অংশ না নিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে মজবুত করেছে, এবং গত এক দশকে আবার নিজেদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত পুতিনের সামাজিক পুঁজিবাদ নীতির কারণে।

ফলশ্রুতিতে সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া আবার তাদের ক্ষমতার প্রকাশ শুরু করেছে। সবার আগে করোনাভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করা তাই রাশিয়ার জন্য ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি নিদর্শন বলেও গণ্য হচ্ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) কিংবা প্যান-এমেরিকান হেলথ অর্জানাইজেসন (পাহো) রাশিয়ার এই ভ্যাক্সিনকে নিরাপদ ভাবছে না, কিন্তু তাতে রাশিয়া খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর জাতিসংঘ গঠন করা হয়েছিল বৈশ্বিক সামরিক উত্তেজনা প্রশমন করে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কিন্তু এটি এখন পরিষ্কার যে জাতিসংঘ অনেকাংশেই তাতে ব্যর্থ হয়েছে, যার অন্যতম কারণ তাদের অর্থনৈতিক সাহায্য মূলত আসে পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকেই।

একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গত বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য দূর্যোগে কার্যকরী নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উষ্মা ও অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দেবার জন্য ব্যাপারটা অনেকটাই খেলো হয়ে গেছে, কিন্তু স্বাস্থ্য নীতি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেই ভাবছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছে। এমতাবস্থায় প্রচলিত ক্লিনিকাল ট্রায়ালের নানা ধাপ এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের প্রটোকল মেনে ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে রাশিয়া সারা বিশ্বকে কিছুটা নাড়া দিয়েছে। এই ভ্যাক্সিন যদি কার্যকরী হয়, তাহলে তৃতীয় ধাপের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের বর্তমান প্রচলিত ধারা অনেকাংশেই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যতই উড়িয়ে দিক না কেন রাশিয়া ইতিমধ্যে অন্যান্য দেশ থেকে ১০০ কোটি ভ্যাক্সিন বিক্রি করার কার্যাদেশ পেয়েছে। বার্ষিক ৫০ কোটি ভ্যাক্সিন বানানোর চুক্তি ইতিমধ্যেই কার্যকরী হয়েছে, যার জন্য রাশিয়া নিজের দেশের বাইরে ব্রাজিলেও এই ভ্যাক্সিন উৎপাদনে যাবে শীঘ্রই। রাশিয়া জানিয়েছে যদিও তারা সীমিত আকারে ক্লিনিকাল ট্রায়াল করেছে, কিন্তু সহসাই তারা আরব আমিরাত এবং ফিলিপিন্সে বড় আকারের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে যাচ্ছে। প্রায় ৯ লক্ষ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী এবং ১৫ হাজার মৃত্যুর পর বিশ্বের প্রথম করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিন আবিষ্কারকে রাশিয়া যুগান্তকারী বলে মনে করছে। সোভিয়েট ইউনিয়ন এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটা বোনা বানিয়ে ১৯৫৭ সালে যেমন পৃথিবীর প্রথম স্যাটেলাইট উতক্ষেপন করে মহাকাশ জয়ে এগিয়ে গিয়েছিল, ঠিক তেমনই অন্য সবার আগে এই ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে আবারও বিশ্ব ক্ষমতার মানচিত্রে নিজেদের নেতৃত্বের হুংকার দিল বলেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। রাশিয়া এই ভ্যাক্সিনের নাম দিতে যাচ্ছে “স্পুটনিক ভি”।

মাত্র ১০% ভ্যাক্সিন ক্লিনিকাল ট্রায়ালের চূড়ান্ত ধাপ অতিক্রম করতে পারে, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এই আশংকাকে উড়িয়ে দিয়েছেন রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন। তিনি বলেছেন, তাদের ভ্যাক্সিন নিরাপদ এবং শক্তিশালী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ব্রাজিলকে বলেছে চূড়ান্ত ক্লিনিকাল ট্রায়াল সম্পন্ন না হলে রাশিয়ান এই ভ্যাক্সিন উৎপাদনে অংশগ্রহণ না করতে। কিন্তু এটি এখন পরিষ্কার যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর রাশিয়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতা এখন প্রশ্নের সম্মুখীণ।

বিশ্বের বেশীরভাগ ভ্যাক্সিন বিশেষজ্ঞ রাশিয়ার এই ভ্যাক্সিন নিয়ে সতর্ক মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। তারা প্রচলিত এবং গ্রহণযোগ্য ধাপ অনুসরণ না করেই এর উৎপাদনকে সঠিক কাজ নয় বলে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, ইউ এস ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেসন (এফডিএ) এবং ইউরোপিয়ান মেডিসিন্স এজেন্সি (এমা) যদি মহামারীর কথা মাথায় রেখে কিছু ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করার অনুমোদন দিতে পারে, তাহলে রাশিয়ার ক্ষেত্রে তা মেনে না নেবার কোন কারণ থাকতে পারে না।

এখন দেখার বিষয় রাশিয়ার এই ভ্যাক্সিন কতটা কার্যকরী হয় তাদের নিজেদের মানুষের উপরে। বর্তমানে রাশিয়ার যেসব জনস্বাস্থ্য কর্মী করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়েছেন, তারাই প্রথমে এই ভ্যাক্সিন নেবার সুযোগ পাচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে ১০০ কোটি ভ্যাক্সিন বানানোর কার্যাদেশ পাওয়া এটি নির্দেশ করে যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চাইতে অনেক দেশই এখন রাশিয়ার উপর বেশী ভরসা রাখতে শুরু করেছে।

ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের এই যুদ্ধ দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্ব আবার নতুন একটি উত্তেজনার পরিমন্ডলে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ যতটা না কোন মহামারীর বিরুদ্ধে, তার চাইতে অনেক বেশী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার একে অপরের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধ জয়ের প্রস্তুতিস্বরূপ। এই নতুন যুদ্ধের ডামাডোলে জাতিসংঘে কিংবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি দাঁতহীন বাঘে পরিণত হতে যাচ্ছে? সময়ই তা বলে দেবে।

 

 

লেখক: ডক্টরাল রিসার্চার, সোশাল এন্ড বিহেভিয়ারাল হেলথ সায়েন্টিস্ট, ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টো। ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here