সারা দেশের থানাগুলোতে দায়ের হওয়া মামলার ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর অপরাধের যে পরিসংখ্যান তৈরি করেছে, তাতে দেখা যায়, গত বছর সারা দেশে ৬ হাজার ৫৫৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ দেশে দৈনিক গড়ে ১৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

পাশাপাশি শিশু নির্যাতনের ঘটনাও পাঁচ বছর ধরে বেড়ে চলছে।বাড়ছে বাল্য বিয়ের মতো জঘন্য অপরাধ। গত বছর শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল আড়াই হাজারের বেশি। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৬৩।

যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি পর্নোগ্রাফিকেও একটা বড় কারণ মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।

গত বছর দেশে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৯ হাজার ৭৩৩টি। এর মধ্যে আড়াই হাজার সিঁধেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০১৯ সালে মোট চুরির ঘটনা ছিল ৯ হাজার ৩১৯টি।

২০২০ সালে দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ৯৭৮টি। আর ছিনতাই (দ্রুত বিচার আইনে মামলা) ৮৭১টি। এর মধ্যে আগের বছরের তুলনায় ছিনতাই বেড়েছে ৩৪০টি। আর দস্যুতা বেড়েছে ৮২টি।

ছিনতাইকারীদের হাতে কেউ কেউ মারাও গেছেন। গত ৫ মে রাজধানীর কমলাপুরে বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে একটি কার থেকে এক দুর্বৃত্ত রিকশা আরোহী সুনীতা রানী দাসের গলায় ঝোলানো ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে মারা যান।

অবশ্য চুরি, ছিনতাই ও দস্যুতার সব ঘটনায় থানায় মামলা হয় না। মামলার বাইরে থাকা ঘটনা এই হিসাবে যুক্ত হলে সংখ্যাটা আরও বাড়বে। এর মধ্যে দস্যুতা প্রকারান্তরে ডাকাতি। গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরে দিনেদুপুরে তিন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট পরে চুয়াডাঙ্গায় সোনালী ব্যাংকের উথলী শাখায় ঢোকে। তারা ব্যাংক ঢোকে এবং পিস্তল বের করে ব্যাংকের ব্যবস্থাপকসহ সবাইকে জিম্মি করে প্রায় ৯ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানের মতে, করোনাকালে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অভাবের তাড়নায় কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় পারিবারিক সহিংসতাও বাড়ছে। আবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি হয়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

আগের তুলনায় না বাড়লেও ২০২০ সালে দেশে সাড়ে তিন হাজারের বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৫৩। তবে করোনাকালে বেশ কয়েকটি নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোতে পরিবারের সদস্য বা স্বজনেরাই জড়িত। স্ত্রী, সন্তান বা মা-বাবাসহ পরিবারের ছোট্ট শিশুকে পর্যন্ত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। করোনাকালে নানামুখী দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতাকে এ জন্য দায়ী মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।

করোনাকালে বা বিভিন্ন সময়ে সরকার লকডাউন বা বিধিনিষেধ দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিলেও মাদক চোরাচালান ও বিক্রি বন্ধ হয়নি। পুলিশের হিসাবে গত বছর ৭৩ হাজারের বেশি মাদকদ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১ লাখ ১১ হাজারের মতো।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ২০২০ সালে নারী নির্যাতন, খুন, ডাকাতি, অপহরণ, পুলিশ আক্রান্ত, অস্ত্র আইনে, বিস্ফোরক আইনের মামলা তুলনামূলক কম হয়েছে। গত বছরে সব ধরনের অপরাধে দেশে মোট মামলা হয় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি। এর আগের বছর ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪টি।

করোনার সময় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক  বলেন, বর্তমানে মহামারির সময় ঘরবন্দী থেকে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতা অনেকে বেড়ে গেছে। জীবনমানের অবনতি হয়েছে। মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করছে। এ কারণে নানা অপরাধ বেড়েছে। তাঁর মতে, করোনাকালে মানুষ আইনি সুবিধা (লিগ্যাল অ্যাকসেস) কম পাচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় দুর্বল ব্যবস্থাপনা মানুষকে আরও নাজুক করেছে। এ অবস্থায় আইনের সুরক্ষার বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here