করোনায় বন্দি জীবন

মেহেরুন নেছা রুমা

মেহেরুন নেছা রুমা :: যে সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছি তা চিরকাল মনে রাখার মতো একটি অধ্যায়। এই যুদ্ধকালের সমাপ্তি কবে হবে, মানুষের জীবনের উপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে তা অনুমান করা কঠিন।

করোনাকাল আমার মনের ভেতর যেরকম মহামাতম সৃষ্টি করেছে, এযাবৎকালের মধ্যে অন্য কোনকিছুই এমনটা করতে পারেনি। এমনিতে ঘরপ্রিয় মানুষ আমি, খানিক অবসরে লেখাপড়া সঙ্গে থাকলে আমার ঘরে আমিই রাজরানী। করোনা আমার সেই চিরচেনা আমাকে উলোটপালট করে দিয়েছে। অফুরন্ত অবসরেও সময়গুলো কোন কাজেই আসছে না। না পারি একটা লাইন লিখতে, না পড়তে। অথচ এই আমি হাতে বই পেলে আর কিছুর প্রয়োজন মনে করতাম না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার ভেতরের আমি’কে হারিয়ে ফেলছি। হারিয়ে ফেলেছি প্রিয় সব মুহুর্তগুলো, প্রিয়মুখ, প্রিয় সময়, প্রিয় সান্নিধ্য । মনের ভেতর কেবল হারিয়ে যাওয়া আর হারিয়ে ফেলার ভয়।

হয়তোবা সময় এবং পরিস্থিতি আমার মনের এই হাল করে দিয়েছে। দিনের পর দিন ইন্টারনেট না থাকলেও যেন কিছুই আসে যায় না। ফেসবুকে একবার চোখ বুলাই না। প্রায় দুইমাস হল একটা পত্রিকার পাতা চোখে দেখি না। পাই না দেখে কিনা জানি না। হয়তো পেলেও পড়া হত না। টিভির সামনে ভুলেও বসা হয় না, যদিও এখানে বিটিভি ছাড়া কিছু নেই। যা দেখা না দেখা সমান। গ্রামের বাড়ি, আকাশে মেঘ জমলেই বিদ্যুৎ চলে যায়, মুঠোফোনে চার্জ থাকে না দিনের পর দিন। ভুলে আছি সময়, কত তারিখ, কি বার, এমনকি কয়টা বাজে তাও যেন আজ ভুলতে বসেছি। কতদিন বাড়ির বাইরে বের হই না। বাহ্যিক লকডাউন নয়, আমার মনটাই লকডাউন হয়ে গিয়েছে।

বাড়ি এসেছিলাম মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে। সপ্তাহ খানেক থেকে ঢাকা ফিরে যাব এমনটাই চিন্তা ছিল। সেভাবেই নিজের এবং বাচ্চার প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসা। কিন্তু আমি ফিরে যাওয়ার আগেই দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হলে আমার আর ঢাকা ফেরা হয় না। ক্রমেই লকডাউনের সময় বাড়তে থাকে আর কমতে থাকে আমার ধৈর্য। বাবা মায়ের সাথে থাকলেও কোন এক অস্থিরতায় আমার মনের বেহাল দশা কাটে না! কবে যাব আমার সেই ছোট্ট বাসায়, নিজের লেখার টেবিল, বইয়ের তাকে সাজানো বইগুলোতে ধূলো জমে আছে, ছোট্ট বারান্দায় রোদের সঙ্গে খুনসুটি, বিকেল হলে ছাদে যেয়ে আকাশ দেখা, ছোট্ট বাবুকে নিয়ে সন্ধ্যাবেলা গলির মাথায় চিনাবাদাম খুটতে খুটতে হেঁটে চলার সেই দিনগুলো যেন মহাকালের অতল গহবরে হারিয়ে গিয়েছে!

এরই মধ্যে ঘটে গেল আরও কত কি। বাড়ি আসার প্রায় একমাস পর ছোট বাচ্চার জ্বর হলো। যথারীতি করোনাভয়ে আমার গলা শুকিয়ে এলো। মনের মধ্যে যে কী ভয়াবহ তুফান শুরু হল তা কেবল আমিই জানি। দিনরাত ভুলে গিয়ে বাচ্চার দেখভাল করলাম, ওষুধ খেয়ে আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনজনের দোয়ায় দুইদিনেই ছেলে পুরোপুরি সুস্থ। কিন্তু ৪/৫ দিন পর নিজের শরীরের ভাব দেখে আবারও আঁতকে উঠলাম। জ্বর, সাথে কাশি দেখে আমার প্রাণ শুকিয়ে যায়। বাবা-মাও দুশ্চিন্তায় অস্থির।

তখন মেহেন্দিগঞ্জ (বরিশাল) বাজারে লকডাউন। গ্রামে প্রচার হয়েছে কেউ বাজারে গেলেই পুলিশ মেরে বেহুশ করে দিচ্ছে। এই ভয়ে কেউ বাজারে যাচ্ছে না। রাত বাড়তে থাকে, বাড়ে আমার দুশিন্তাও। রাতে যদি ওষুধ আনাতে না পারি, যদি কাশি বেড়ে যায় ঘুমাতে পারব না, বাচ্চার ঘুম হবে না, জ্বর বাড়লে ছেলেকে কে দেখবে এসব চিন্তায় থানার ওসি সাহেবকে কল দিয়ে বসলাম যেন আমাকে সাহায্য করেন। তিনি খুব আন্তরিকতার সাথে আমার বিষয়টা শুনলেন এবং আশ্বাস দিলেন ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। রাত দশটায় দেখি একজন অচেনা যুবক আমার লিখে দেয়া সব ওষুধ নিয়ে বাড়িতে হাজির। কৃতজ্ঞতার সহিত লোকটার উল্লিখিত ওষুধের মূল্য পরিশোধ করলাম, কিন্তু পুলিশের নিঃস্বার্থ সেবার মূল্য হয়তো পরিশোধ করতে পারব না কোনদিন।

সেই রাতে পুলিশকে যখন কল করেছিলাম তিনি আমাকে স্বভাবত দেশময় করোনা পরিস্থিতির কারনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি ঢাকা থেকে আসছি কিনা এবং আমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জেনে তিনি মনে করলেন আমার করোনা টেস্ট করানো প্রয়োজন। তাই হয়তো সে নিজ দায়িত্ব আমার টেস্ট এর ব্যবস্থা করলেন। যদিও আমার আত্মবিশ্বাস ছিল এটা সাধারণ ফ্লু হবে, তবুও মনের ভয় কারো কাছে প্রকাশ করিনা- হলেও হতে পারে, কেননা কোন উপসর্গ ছাড়াও অনেকেরই আক্রান্ত হওয়ার খবর পাচ্ছি।

৩ দিন পর সকাল এগারোটার দিকে হঠাৎই আমাদের বাড়িতে একটি এম্বুলেন্স আসে। তাতে পিপিই পরিহিত ৫/৬ জন মানুষ যখন বাড়িতে প্রবেশ করে আশে পাশের মানুষ যেন মৃত্যুদূত দেখছে এমন আতংকে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। শুনেছি আমাদের টিউবওয়েলে পানি নিতে আসতেছিল পাশের বাড়ির এক নারী। ওই পিপিই পরা লোকদেরকে দেখে সে নাকি বাগানে বেহুশ হয়ে পড়েছিল। তারপর রাস্তায় ভিড় জমে গেল আমাদের বাড়িতে কি হচ্ছে দেখার জন্য।

মুহুর্তেই পুরো মেহেন্দিগঞ্জ খবর রটে গেল মাস্টার বাড়িতে করোনা পাওয়া গেছে, আমার টেস্ট এর স্যাম্পলে নেয়ার আগেই আমাদের ঘরের প্রত্যেকের মুঠোফোন বেজে উঠতে থাকল পাল্লা দিয়ে। সবার একই কথা রুমার নাকি করোনা হয়েছে, এম্বুলেন্স আসছে। টেস্ট করতে যারা এসেছিলেন তারা আমাকে দেখেই বললেন ইনশাআল্লাহ আপনার রেজাল্ট নেগেটিভ আসবে চিন্তা করবেন না। তাদের দলে দুইজন পুলিশ আর ডাক্তার সহ বাকি তিন জন ছিলেন। একসাথে ৫ জন সাদা ধবধবে পিপিই পরিহিত মানুষ দেখে বাড়ির মানুষের মুখও রক্তশুন্য হয়ে গেল। তাদেরকে সাহস দিতে আমি নিজেকে সাভাবিক রাখতে চেষ্টা করলাম। যেন এটি কিছুই নয়। মা কান্না করতে থাকলেন, ভাবছেন যদি আমার করোনা হয়েই যায় আমাকে যদি নিয়ে যায় হাস্পাতাল।

কেননা তারা দেখেছেন বিদেশে এভাবেই নিয়ে যাচ্ছে। আমি চেয়ারে বসে তুমুল ঘামতে থাকলাম। জ্বর নেমে যাওয়ার জন্য নাকি মনের উদবিগ্নতায় তা জানি না। আর মনে শুধু ছোট তাইরানের কথা এসে গলার কাছে কান্নাগুলো যেন দলা পাকাতে থাকলো। আমি গেলে ওর কি হবে! আর কিছু ভাবতে পারলাম না।

এসব লিখে বা বলে বোঝানোর নয় তাই আর লিখছিনা। এদিকে মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল, ঢাকা সহ বিদেশ থেকেও আমাদের কল আসতে থাকলো। সবখানে ছড়িয়ে গেল আনিস স্যারের মেয়ে রুমার করোনা হয়েছে, কেউ বলে মাস্টার বাড়ির সবাইকে এম্বুলেন্স এ বরিশাল নিয়ে গেছে। এমনকি দু একজন মরেও গেছে এরকম খবর শুনে আবার আমার আত্মীয় স্বজনরা কান্নাকাটি করে কল দিতে থাকলেন। কেউ কেউ ফেসবুকেও আমাকে নিয়ে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন। যারা এসেছিলেন তারা টেস্ট শেষে তাদের পরিহিত পিপিই আমাদের বাগানে খড়পাতা জ্বেলে আগুনে পুড়ে ফেললেন। কিন্তু চারদিকে রটে গেল আমাদের বা আমার করোনা হওয়ার কারনে জামা কাপড় সব পুড়িয়ে দিয়ে গেছে।

যাই হোক আমি অপেক্ষা করতে থাকি টেস্ট এর রেজাল্টের। ৩য় দিন রাত ৯ঃ৩০ এর দিকে আমাকে কল করে জানানো হয় রেজাল্ট নেগেটিভ। আমার শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এই রেজাল্ট নিয়ে কারো ভাবনা নেই। খবর যা রটার তা রটে গিয়েছে আগেই।এখনো সেই খবরের রেশ বয়ে বেড়াচ্ছি।

এদিকে প্রায় দুইমাস বাড়িতে আছি। আর ভালো লাগে না। এই বন্দি জীবন আমার সমস্ত অনুভবের উপর বিষাদের ছায়া লেপে দিয়েছে। স্থবির হয়ে যাওয়া মন নিয়ে রোজ ঘুম থেকে জেগে ভাবি আজ কি শুনব কোন ভালো খবর? কিন্তু পৃথিবী থেকে যেন ভালো খবর হারিয়ে গিয়েছে! আর আমি অনাদিকালের এক ভাঙামন নিয়ে যেন ভালো কিছু হবে এই আশায় প্রহর গুণে যাচ্ছি।

 

 

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হবে

মো: মিজানুর রহমান :: আসলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাবের জন্য দীর্ঘকালীন প্রভাব ভুলে যাই ...