করোনায় দেশের অর্থনীতির ক্ষতি ও চ্যালেঞ্জ

মোঃ শাহীন

মোঃ শাহীন :: বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর নাম শোনেনি বিশ্বে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারী করোনা ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারী ঘোষণা করেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে ভাইরাসটি উৎপত্তি হয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে পুরো বিশ্ব স্থবির হয়ে আছে। থমকে আছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম।ফলে বিশ্বের অর্থনীতি অপূরনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এ ক্ষতি এড়াতে পারে না ।করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ৫ দশমিক ৮ট্রিলিয়ন থেকে ৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ কোভিড-১৯ এ ক্ষতির অঙ্ক হতে পারে ৫লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। যা বৈশ্বিক জিডিপির ৬ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ হবে।

.

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক অর্থনীতি নিয়ে প্রকাশিত “পটেনশিয়ান ইকোনমি অব কোভিড-১৯ ” শীর্ষক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে করোনা জনিত ক্ষতির পরিমাণ দাড়াবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি থেকে ২১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে করোনা মোকাবেলায় বিধিনিষেধর কারণে সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ কমবে। করোনা ভাইরাস বিশ্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়াসুয়াকি সাওয়াদা বলেন -নতুন পূর্বাভাস থেকে থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে কোভিড-১৯ এর একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা জোড়ালো হয়ে ওঠার আশংকা তৈরি হওয়ায় দেশে দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুলো ব্যাপকহারে সুদ কমানো সহ আর্থিক পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

.

কোভিড-১৯ এর আক্রমণে বাংলাদেশে সরকারিভাবে কয়েক ধাপে লকডাউন দেয়া হয়। দেশের দোকান-পাট, শিল্প কারখানা, সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। দেশের পুরো অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যাংক, বীমা, শিল্প, বন্দর সহ সব কিছুর কর্মতৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর সীমিত পরিসরে খুলে দেয়া হয় কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান, হাট বাজার, দোকান-পাট।

.

কোভিড-১৯ মোকাবিলায় শিল্প শ্রমিকদের বেতনের জন্য ২ শতাংশ সুদে ৫হাজার কোটি টাকা একটি তহবিল গঠন করা হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাত গুলো হলো- তৈরি পোশাক খাত, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, চামড়া, চা, কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য ও কৃষি খাত। লকডাউনের ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল সব ধরনের কার্যক্রম। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা করোনা ভাইরাস। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য বন্ধ থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ বিশ্বের যে সব দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ব্যাপক চাহিদা ছিল তা এখন হ্রাস পেয়েছে। বাতিল করা হয়েছে অনেক অর্ডার। বন্ধ রাখা হয়েছে অনেক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল। ফলে বিমান খাত ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যা দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতির প্রভাব ফেলে।

.

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ এর কারণে আমাদের প্রায় কোটি প্রবাসী হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক প্রবাসী মারা গেছে।বিদেশে কর্মরত অসংখ্য শ্রমিক তাদের কর্ম হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। বন্ধ রয়েছে প্রবাসীদের সকল ব্যবসা বানিজ্য। বন্ধ রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক নেয়া। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে।প্রবাসীদের আয়ে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৫ শতাংশ যা খুবই আশানুরূপ ছিল। দেশের ভিতরে ও বাহিরে অসংখ্য শ্রমিক কাজ হারিয়েছে। ফলে আমাদের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আমাদের দেশে রপ্তানিতে চামড়া শিল্প একটি অন্যতম লাভজনক খাত। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে অন্যতম এ লাভজনক খাতটি।বন্ধ রয়েছে সব ধরনের চামড়া রপ্তানি। ফলে দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

.

পাট শিল্প ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম একটি খাত। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের পাট শিল্প ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।বাংলাদেশের চা শিল্পও এক সময় রপ্তানিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতো। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে এসব খাত গুলোর আমদানি রপ্তানি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে।

.

দেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গুলো ছিল নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস। কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ থাবার কারণে এসব শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক মানুষ কাজ হারাচ্ছে। ফলে বেকারত্ব হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। দেশের ট্রুরিজম ও সেবা খাত গুলো বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফলে এ খাতে ব্যাপক ক্ষতি মুখে পড়বে দেশ।বাংলাদেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় খাত ছিল পোল্ট্রি খামার ব্যবসায়। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে যা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অনেক পোল্ট্রি খামার ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যা দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপক চাপের মুখে ফেলবে।

.

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন- কোভিড-১৯ এর কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেরই জিডিপি ১০ শতাংশের বেশি আর্থিক ক্ষতি হবে। আমাদের যদি এর অর্ধেকও ক্ষতি হয় তাহলে ১ লাখ কোটি টাকার উপরে আর্থিক ক্ষতি হবে। আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১ লাখ কোটি টাকা কম আদায় হবে। করোনা সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের সরকার আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ সরকারও ইতোমধ্যে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বড় বড় যে সকল প্রকল্পের কাজ চলমান ছিল কোভিড-১৯ এর কারণে তা ধীর গতিতে চলছে। এসকল প্রকল্পে আর্থিক ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে। ফলে আমাদের অর্থনীতিতে আরও খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। বড় বড় প্রকল্পসহ করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নতুন প্রয়োজনীয় প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জিং হবে।

.

ব্রিটেনভিত্তিক বিখ্যাত ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট মন্তব্য করেছে, করোনার এই আগ্রাসনের কারণে এ বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে সাড়ে ৩ শতাংশ। কিন্তু আগেভাগে এটা প্রত্যাশা করা হয়েছিল সাড়ে ৭ ভাগ। সুতরাং করোনা পরবর্তী কালে এই অর্থনীতি আগের অবস্থাই ফিরিয়ে আনা হবে প্রধান কাজ। কারণ অর্থনীতিকে বাঁচাতে না পারলে দেশকে বাঁচানো অসম্ভব হবে। করোনা পরবর্তী বাংলাদেশে সরকার ও জনগণ এক হয়ে কাজ করবে, সেটা যত বেশি নিশ্চিত করা যাবে করোনার এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠা তত ত্বরান্বিত হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা থাকবে আমাদের অর্থনীতিকে যত দ্রুত সম্ভব আগে অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। আমাদের অভ্যন্তরীণসহ বৈদেশিক বাণিজ্যের সাথে সুষম উন্নয়ন আমাদের অর্থনীতিকে করোনা পরবর্তীকালে আরো শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখাবে।

.

.

লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

One comment

  1. I’m feeling lucky to say that, Today, I found something special for me. Many thanks for this.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বৃষ্টি মানে মানবজীবনে অন্যরকম অনুভূতি

এম.আর.লিটন: বৃষ্টি মানে মানবজীবনে অন্যরকম অনুভূতি । যেমন টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম ...