ব্রেকিং নিউজ

করোনায় ডাক্তারদের নিরাপত্তা এবং কিছু কথা

 

নূর কামরুন নাহার :: আমার জা একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে। গত ২৫ মার্চ থেকে সেটা বন্ধ। কারণ ওখানে যে ডাক্তাররা বসেন তারা ২০ তারিখের পর থেকে বসছেন না। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি। এই দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থার বিষয়ে জানি। ডাক্তাররা বসছেন না প্রাইভেট প্যাকট্রিস করছেন না, এটা অবশ্যই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা তাদের আছে। আমরা বুঝতে পারি তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই হয়ত বসছেন না।

গত কয়েকদিন ধরেই দেশে আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনা রোগী নয় কিন্তু সাধারণ রোগেরও চিকিৎসা হচ্ছে না। হাসপাতালগুলো রোগী নিচ্ছে না। অনেকেই বলছেন যে, দেশের নামকরা বেসরকারি হাসতাপালগুলোর আইসিইউগুলোও নাকি এখন রোগী নিচ্ছে না। এমন কি জরুরি বিভাগও সেভাবে কার্যকর নেই। এই হাসপাতালগুলো বলছে তাদের অন্য রোগীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই তারা এমনটি করেছে। কোনো-কানো হাসপাতাল নোটিশ দিয়ে দিয়েছে কাশি, সর্দির রোগী তারা চিকিৎসা করবেন না। তারাও এটা করেছেন অন্য রোগীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে।

সেটাও আমরা বুঝতে পারছি। আমরা দেখেছি পাবলিক হাসপাতালগুলোর ডাক্তাররা কর্মবিরতি করছেন উপযুক্ত নিরাপত্তার সামগ্রীর জন্য ।অবশ্যই ডাক্তারদের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তারপরই তাদের সেবা পাবার প্রশ্ন উঠে। অবশ্যই তাদের এই কর্মবিরতি যুক্তিযুক্ত। আমরা মিডিয়ায় এখন দেখছি পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) এসেছে। ডাক্তারদের দেয়া হচ্ছে। আলাদা করে হাসপাতাল ও হাসপাতালে আলাদা ইউনিট চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্তু তারপরও দেখছি করোনার কারণে কয়েক হাসপাতাল ঘুরেও অন্য রোগীর জন্যও আত্মীয়রা আইসিইউ পাননি। রোগী মারা গেছেন। সাধারণ রোগের চিকিৎসাও দারুন ভাবে ব্যহত হচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। করোনাতো পরের কথা।
করোনা অবশ্যই একেবারেই অন্য একটা বিষয়।এটা নিয়ে উন্নত বিশ্বই হিমসিম খাচ্ছে আর আমাদের মতো একটি জনবহুল এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি তো অবশ্যই ব্যাপক সমস্যার বিষয়। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ বা দ্বিমত কারোরই নেই।

ডাক্তাররা অবশ্যই এই দেশে নানা সীমাবদ্ধতায়ও সেবা দিয়ে থাকেন। এটা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। এজন্য তারা ধন্যবাদ পারারও যোগ্য। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো পেশার বিরুদ্ধে বলা নয়। আমার অনেক আপনজনও ডাক্তারী পেশায় আছেন। কিন্তু এই যে বিদ্যমান পরিস্থিতি যেখানে সাধারন রোগীরাও চিকিৎসার সেবার জন্য ভোগান্তিতে আছেন সেখানে আমার কয়েকটি প্রশ্ন-

এক. পাবলিক হাসপাতালের ডাক্তারদের পিপিই সরকার দেবেন। অবশ্যই নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ডাক্তাররা সেবা দিবেন না। তাদের পিপিই ও অনান্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

দুই . বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে পিপিই কি সরকার দেবেন? কেন দেবেন? যদি সরকার সেখানে চিকিৎসার ইউনিট খোলেন তাহলে অবশ্যই দিবেন। তা না হলেও কি দেবেন?

তিন. করোনা যেহেতু খুবই সংক্রামক এবং এর চিকিৎসা এখনো অজ্ঞাত তাই সব বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক এই রোগের সেবা দিবে না। সব হাসপাতালেও করোনার চিকিৎ’সা হবে না। এটাই স্বাভাবিক কিন্তু অন্য রোগের চিকিৎসার জন্য এগুলো কেন সেবা দেবেন না?

চার. অন্য রোগের সেবা দিতে গেলেও করোনা রোগী চলে আসতে পারে, সেই জন্য অন্য রোগের সেবার ক্ষেত্রেও এখন পিপিই ব্যবহারের প্রয়োজন পড়তে পারে। যদি তাই হয়, তবে কেন সেই পিপিই ক্লিনিক বা হাসপাতাল সরবরাহ করবেন না। বাংলাদেশে প্রাইভেট হাসপাতাল ব্যয়বহুল, আমরা কে না জানি। রোগীর থেকে যদি টাকাই নেয়া হয়, তবে কেন তারা ডাক্তারদের পিপিই দেবেন না।

পাঁচ. যারা প্রাইভেট প্যাকটিস করেন তাদের পিপিই কে দেবে? সরকার কি দেবে? কেন দেবে? তারা তো যথার্থ ভিজিট নেয়ার বিনিময়েই রোগী দেখেন। তারা যদি রোগী দেখে আয় করতে পারেন, তবে তাদের এই আয়ের জন্য (যদিও রোগী দেখা সেবাও বটে) কেন তারা নিজেদের টাকায় পিপিই কিনবেন না?

ছয়. সবার মানসিক শক্তি এক নয়, পিপিই পাবার পরেও কোনো ডাক্তার প্রাইভেট প্যাকট্রিস না করতে পারেন। তিনি হয়তো এটা করতে চান না। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বলার কিছু নেই ব্যক্তিস্বাধীনতা সবার আছে। কিন্ত হাসপাতালে ক্লিনিকে যারা কাজ করেন তারা কি দিনের পর দিন রোগী না দেখে থাকতে পারেন? তাদের কি ব্যক্তিইচ্ছার বাইরেও সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে না?

সাত. আমাদের দেশের ডাক্তাররা কি রোগীদের চিকিৎসা করেই একটা স্বচ্ছল জীবন পেয়েছেন না ? প্রাইভেট প্যাকট্রিস আর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেই ভালো আয় করেছেন না ? এটা কি অস্বীকার করতে পারবেন? তাহলে এখন এই সংকটকালে রোগীর প্রাইভেট চিকিৎসায় কেন পিপিই কিনতে পারবেন না? প্রয়োজন হলে রোগীর কাছ থেকে সামান্য বাড়িয়ে নিন। কিন্তু চিকিৎসা কেন করা হবে না?

একজন ডাক্তার তৈরি করতে পরিবারের অনেক ত্যাগ, অনেক কষ্ট, আর বিনিয়োগ থাকে। যারা পাবলিকে পড়েন তাদের জন্য রাষ্টেরও বিনিয়োগ থাকে। অবশ্যই পরিবার চাইবে তার সন্তানের এবং তার এই আপনজনের নিরাপত্তা। আমরাও চাই ডাক্তারসহ সকলের নিরাপত্তা। ডাক্তারদের নিরাপত্তা দেয়া যেমন তাদের অধিকার, তেমনি নাগরিক হিসাবে চিকিৎসা পাওয়াও আমাদের অধিকার। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সমঝোতা নেই। আমাদের ডাক্তাররা আমাদের সম্পদ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাও নিশ্চিত হোক। মানুষ মরণশীল- মরবেই। তবে কেউ এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে চিকিৎসা ছাড়া মারা যাক আমরা তা চাই না।

 

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক। 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নোবেলের বিরুদ্ধে ভারতে মামলা দায়ের

ডেস্ক নিউজ :: ভারতীয় টিভি চ্যানেল জি বাংলার রিয়্যালিটি শো ‘সারেগামাপা’তে অংশ ...