ব্রেকিং নিউজ

করোনায় ঘর-বন্ধি: যা করণীয়

শৌল বৈরাগী :: পৃথিবী আজ থমকে গেছে। না, কোন যুদ্ধ, খরা‚ভূমিকম্প বা কোন সুনামী নয়। তবে এটা সুনামীর থেকেও বেশী ব্যাপৃত। সুনামী বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে হয়তো কোন নির্দিষ্ট ভূ-খন্ড বা এলাকা থমকে যায়, জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু করোনা নামক ভাইরাসে গোটা বিশ্ব-ই থমকে আছে। চিকিৎসক-নার্স নিরলস পরিশ্রম করে চলছেন অসুস্থ্য মানুষকে সুস্থ্য করার জন্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরাও গবেষণা করে যাচ্ছেন প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক ঔষধ আবিষ্কারে। কতদিনে তা সম্ভব হবে সে নিশ্চয়তাও কেউ-ই দিতে পারছে না। মাত্র ৩ মাসে পৃথিবীকে স্তব্দ করে দিয়ে কয়েক লাখ মানুষকে অসুস্থ করে কেড়ে নিয়েছে অর্ধ লক্ষেরও বেশী প্রাণ। কোন দেশই অন্য কোন দেশকে সহায়তা করতে পারছে না, কারণ সবাই নিজেদের সামাল দিতেই ব্যস্ত। করোনা বিস্তারে রোধ ঘটাতে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবেও নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। এরমধ্যে অন্যতম লকডাউন বা সাধারণ ছুটি। লক্ষ্য একটাই যেন সবাই নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করেন এবং সামাজিক দূরত্ব নীতি মেনে চলেন। এক কথায় আমরা বলতে পারি হোম কোয়ারেন্টাইন। হোম কোয়ারেন্টাইন বা লকডাউন বা সাধারন ছুটি যাই বলি না কেন এর মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন এসেছে। হঠাৎ অভ্যাস পরিবর্তনের ফলে ব্যস্ত মানুষগুলোর বিশেষতঃ দীর্ঘ সময় বাসায় থাকায় শরীর ও মনের উপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বারবার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য কি করতে হবে সে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ ও বাস্তবতার অনুসরনে এই দীর্ঘ সময় ঘরে আবদ্ধ থাকার জন্য যা করণীয়ঃ

১. ছেলেমেয়েদের করনীয়ঃ স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় ছেলেমেয়েদের স্বাভাবিক অভ্যাসে একটি বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিদিনকার নিয়ম-কানুন উলোট-পালোট হয়ে গেছে। এখন তাদের আর নাই সকালে ঘুম থেকে উঠার তাড়ণা, নেই স্কুলে যাওয়ার ব্যস্ততা। তাদের দীর্ঘক্ষণ ঘরে অনেকটা অলস সময় কাটাতে হয়। নাই কোন শারিরীক কসরত। স্কুল-কলেজে বন্ধু/বান্ধবদের সাথে আলাপ, আড্ডা, গল্প, হাসি-তামাশা এগুলো আর করতে পারছে না। যা তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্দস্ত ও ওজন বৃদ্ধি করে তুলবে। এ অবস্থায় তাদের শারিরীক ও মানসকি স্বাস্থ্য ঠিক রাখাতে পিতা-মাতাদেরকে তাদের ব্যস্ত রাখার জন্য সময় দিতে হবে, গল্প করতে হবে, হাসি-তামাশা করতে হবে, মুভি, ভিডিও ইত্যাদি দেখতে দিতে হবে। অর্থাৎ কোনভাবেই যেন তারা একাকীত্ব বোধ না করে এবং হাসি খুশি থাকে। প্রয়োজনে পিতামাতার সাথে ঘরের কিছু কাজে অংশগ্রহণ করাতে হবে। তবে তা যেন কোন ভাবেই তাদের জন্য কাজ নয় বরং খেলা হিসেবে হয়। সহপাঠীদের সাথে ভিডিও বা মোবাইল এ কথা বলার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও শারীরিক কসরত হয় এমন কিছু খেলা ঘরের মধ্যে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে কোন ভাবেই তারা যেন বন্ধু-বান্ধবদের অনুপস্থিতি বুঝতে না পারে। সব সময় তাদের হাসিখুশি রাখার কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এতে তারা বিষন্নতা বা দুঃশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখতে পারবে এবং শারিরীক ও মানসিক ভাবে সুস্থ্য থাকবে।

২. স্বাস্থ্য সম্মত ও প্রোটিনযুক্ত খাবারঃ করোনার এখনো পর্যন্ত কোন চিকিৎসা নাই, এজন্য করোনা প্রতিরোধে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা শরীরে একান্ত প্রয়োজন। তাই খাবার তালিকায় স্বাস্থ্যসম্মত, প্রোটিন ও ভিটামিনযুক্ত খাবার রাখতে হবে। এতে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং করোনা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে।

৩. আ্যলকোহল ও ধূমপান থেকে বিরত থাকাঃ যাদের আ্যালকোহল ও ধূমপানের অভ্যাস আছে তারা ঘরে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে এগুলোর প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে যে, যারা আ্যালকোহল ও ধূমপান করে করোনা তাদের ক্ষেত্রে বেশী শক্তিশালী। তাই আ্যালকোহল ও ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা থেকে বিরত থাকতে হবে বা যতটা সম্ভব কমিয়ে দিতে হবে।

৪. শারীরিক ব্যয়ামঃ দীর্ঘদিন বাসায় অলস সময় কাটানোয় সুস্থ্য লোকদের যেমন শারীরিক সমস্যা হতে পারে ঠিক তেমনি যারা হার্ট, ডায়াবেটিকস্ ইত্যাদি রোগে ভুগছেন তাদের জন্য আরো বেশী ক্ষতি হতে পারে। অসল সময় কাটানো এবং দীর্ঘদিন বাসায় থাকা শরীরের অর্গানগুলোর সচলতায় সমস্যা হতে পারে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যাক্তিকে দিনে কমপক্ষে ৩০ মিনিট এবং শিশুদের কমপেক্ষে ৪০ মিনিট ব্যয়াম করতে হবে। এক নাগাড়ে ৩০ মিনিট এর বেশী একই পজিশনে থাকবেন না। বার বার পজিশন পরিবর্তন করতে হবে। এতে শরীর-মন দু’ই ভাল থাকবে। বাসার মধ্যে ইয়োগা, ভিডিও ছেড়ে নাচ (ড্যান্স) করা, বাসায় তেমন জায়গা থাকলে হাঁটা চলা করা, উঠ-বস করা, বুক ডন দেয়া ইত্যাদি নানা ভাবে ব্যয়াম করা যেতে পারে। এগুলোতে শিশুদের, বয়স্কদের ও নারীদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম হিসেবে ঘরের বিভিন্ন কাজ করা যেতে পারে। যেমনঃ ঘর ঝাড়ু দেয়া, ঘর মোছা, বইয়ের সেলফ পরিষ্কার করা, ফ্যান পরিষ্কার করা ইত্যাদি।

৫. মানসিক স্বাস্থ্য ও দৃঢ়তা ঠিক রাখাঃ যে বৈশ্বিক দূর্যোগ চলছে তাতে সবারই দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। আর এর মধ্যে নানা ধরণের দুঃশ্চিন্তা মাথায় আসে এবং মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। নিজের মধ্যে নিজে অসহায় হয়ে পড়ে। চিন্তা করে পরিবারের লোকদের কিভাবে নিরাপদে রাখা যায়, অর্থনৈতিক চিন্তা, খাবারের চিন্তা, চাকরীর চিন্তা, খাবারের সংকট, ভবি দূর্ভিক্ষের কথা, ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা ইত্যাদি। এগুলো একজন মানুষকে অবশ্যই মানসিকভাবে দূর্বল করে দেয়। এসব থেকে দূরে রাখতে সব সময় নিজেকে কোন না কোন কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। যেমনঃ সংসারের কাজে নিয়োজিত করা, বই পড়া, সুযোগ থাকলে বাসায় অফিসের কিছু করা, ইন্টারনেটে পৃথিবী ঘুরে বেড়ানো, বই পড়া, পরিবারের সদস্যদের সাথে বেশী বেশী গল্প করা, হাসি তামাশা করা, ইনডোর বা অন লাইনে খেলা করা, টেলিফোনে বা ভিডিও কলে কলিগ ও বন্ধুদের সাথে বেশী বেশী কথা বলা ইত্যাদি। এগুলোর মধ্য দিয়ে দুঃশ্চিন্তাগুলো দূরে রাখা যায়। এছাড়াও সারাক্ষণ টেলিভিশনে একই খবর বার বার না দেখে দিনে দু’একটি চ্যানেলে যা বিশ্বাসযোগ্য এমন খবর দেখা। টেলিভিশনে কমেডি ভিডিও বা সিরিয়াল দেখেও মানসিক দুঃশ্চিন্তা দূর করা যায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিজেকে স্থির রাখা। কারণ মনে রাখতে হবে স্থিরতা একটি বড় মেডিসিন।

৬. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত সাতটি ষ্টেপ অনুসরণ করাঃ (১) বার বার হাত ধোয়া, (২) হাত দিয়ে মুখ, নাক, চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা, (৩) হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু বা হাতের কনুই ব্যবহার করা, (৪) জন সমাগম স্থান ও যাদের হাঁচি-কাশি আছে তাদের নিকট হতে নিজেদের দূরে রাখা, (৫) অসহনীয় অনুভব করলে নিজ বাসায় অবস্থান করা, (৬) যদি জ্বর, কাশি এবং বেশী শ্বাস কষ্ট হয় তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবেন এবং (৭) অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য নিউজ দেখবেন।

এসব কিছুর পরেও আশার কথা হলো এই করোনা নামক ভাইরাস পৃথিবীব্যাপী সব মানুষকে এক করে তুলেছে, সবাইকে পরিবারের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। একটি মাত্র ভাইরাসের বিরুদ্ধে সব রাষ্ট্র যুদ্ধ করছে। সবাইকে নিজ নিজ সৃষ্টি কর্তার আরো বেশী সান্নিধ্য লাভের সুযোগ করে দিচ্ছে। আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যাচ্ছে এই একটি ছোট ভাইরাস। প্রকৃতি মুক্ত দূষন মুক্ত হচ্ছে। পৃথিবী হয়তো একদিন এ সংকট থেকে মুক্ত হবে কিন্তু যে শিক্ষা আমরা পেলাম তা কি আমরা ভবিষ্যতে ইতিবাচক কাজে লাগাতে পারব? এ প্রশ্ন সকলের কাছে ভবিষ্যতের জন্য ছেড়ে দিলাম।

আতঙ্ক নয়, সচেতন থাকি। আসুন ঘরে থাকি – পৃথিবী করোনা মুক্ত করি।

 

 

লেখক: সমাজ উন্নয়ন কর্মী

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি: রাষ্ট্র প্রধানের লেখালেখির অনন্য পদরেখা

ছাইফুল ইসলাম মাছুম :: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় ...