ব্রেকিং নিউজ

করোনার একাল ও সেকাল

কৃষ্ট মোহন সিংহ :: দই আমরা কমবেশি সবাই পছন্দ করি। সামান্য দই জরন দিয়ে আমরা অনেকটা দই তৈরি করে ফেলি। দই চুড়া বাঙালির প্রিয় খাবার। আর দই তৈরির অন্যতম উপাদান হলো ব্যাক্টেরিয়া গাঁজন। উপকারী ও অপকারী দুই ব্যাক্টেরিয়া প্রকৃতিতে বিদ্যমান। জীবের খাদ্যহজমে, রোগ প্রতিরোধে, মৃত জীব কোষকে গলিয়ে ফেলা ইত্যাদি উপকারি ব্যাক্টেরিয়ার কাজ। কলেরা, টাইফয়েড, প্লেগ ইত্যাদি ছড়ানো অপকারী ব্যাক্টেরিয়া করে থাকে। এই রোগগুলি পানি বাহিত, কীটপতঙ্গ, ইদুর, শুকর, বাদুর, পাখি, মশা মাছি, পঁচা জিনিস বা বাসি খাবারের দ্বারা বিস্তার লাভ করে।
করোনা বা কোভিড২০১৯ হলো এক প্রকার ভাইরাস। অতি ক্ষুদ্র জৈব কোষ যা সাধারণ অনুবিক্ষণ যন্ত্র দ্বারা দেখা যায় না। ভাইরাস প্রাণিদেহে বংশবিস্তার করে কিন্তু জড়পদার্থের উপর পড়লে কয়েক ঘন্টা জীবিত থাকে। হাঁচি কাশি, থুথু, লালা ইত্যাদির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। আর একারনেই মুখে মাস্ক ব্যবহার করা ও বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া জুরুরি। অতিক্ষুদ্র হওয়ার কারণে ভাইরাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
যা হোক আজ  ৪ এপ্রিল ২০২০।  যে প্রসঙ্গ নিয়ে লিখতে বসেছি সেটা হলো করোনাভাইরাস যুদ্ধে ত্রানসামগ্রী বিতরণ, তর্কবির্তক ও সেলফি তুলা বিষয়ে। জনদরদী ব্যক্তিবর্গ থেকে সরকার কর্তৃক পর্যন্ত ত্রানসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত আছে এবং চলবে। নিঃসন্দেহে এটি প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু অনেকের প্রশ্ন এটি  কতদিন চলবে এবং সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ত্রান বিতরণ কিভাবে সম্ভব?
অতীতের ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় এটার ধাক্কা নূন্যতম ছয় মাস কিবা এক বছর। তাই একজন জনদরদী ব্যক্তি যদি ছয় মাস কিংবা এক বছর ত্রান বিতরণে ভীরের মধ্যে থাকে এবং ছবি তুলে ফেসবুকে এবং টিভি খবরে প্রকাশ করে  তাহলে তিনি  করোনা আক্রান্ত হবেন কিনা প্রশ্ন আপনার কাছে। খুশিতে লোকালয়ে যাব আর ছবি তুলব এটা করা যাবে না। তিন ফুট সামাজিক দুরত্ব  কেন একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি মারলে দশ ফুট দুরে এই ভাইরাস  ছড়াতে পারে।
আবদ্ধ ঘরের ভিতরেও মিটিং, গল্পগুজব এবং ত্রান সামগ্রী  বিতরণ করা যাবে না কেননা শ্বাস প্রশ্বাসেও এটি ছড়ায়।  আমেরিকার মত উন্নত দেশগুলোতে করোনা বেশি ছড়ার কারণ হলো বদ্ধঘরে এসি যুক্ত বিলাসবহুল শপিংমল। বাংলাদেশে আমরা খোলামেলা বাজারে কেনাকাটা করি। আর তাই এটা দ্রুত ছড়াতে পারে না। আর আমেরিকা, স্পেন, চীনের মত দেশে শপিং মলে ঢুকতে দরজার বোতাম চাপতে হয়, বিল পরিশোধ করতে কম্পিউটারের কীবোর্ড চাপতে হয়, ট্রেনের টিকেট, এটিএম বুথসহ সব স্থানেই হাতের আঙুল লাগাতে হয়। শত শত লোক একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে। আর এই হাত সহজে মুখে চোখে নাকে চলে যায়।
সম্প্রতি ভারতে দিল্লির একটি বড় মসজিদে ৬৭ টি দেশের ২০৪১ জন দেশি বিদেশি নিজামুদ্দিন  অনুসারী তাবলীগে জমায়েত হয় এদের মধ্যে চীন দেশ থেকে ৯ জন এসেছিল। তাবলীগ শেষ হওয়ার পরও অনেকে মসজিদের ভেতরে থেকে যায়। সেখানে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি থাকার কারণে সবাই আক্রান্ত মনে করা হচ্ছে। প্রায় ৩০০ জনের করোনা পজেটিভ ধরা পরে এবং ৭ জন মারা যায়। ঐ তাবলীগে বাংলাদেশের ৪৯৭ জন ছিল এদের মধ্যে ৩ জন করোনা পজেটিভ। এর অন্যতম কারন হলো একটি ঘরের ভিতরে এক সাথে ঘুমানো, শ্বাস প্রশ্বাস আদান প্রদান করা,  এক গ্লাসে পানি পান, গণসৌচাগার, বাথরুম ব্যবহার করা ইত্যাদি।
এখন আপনার প্রশ্ন – তাহলে কি ত্রানসামগ্রী বিতরণ করব না? ছবি তুলব না? তুমিতো নিজে পারনা আবার অন্যের সমালোচনা কর কেন? – ইত্যাদি প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।  বাছাধন নিম্নে কিছু সুপারিশ লক্ষ্য করো।
ত্রানসামগ্রী বিতরণে কিছু সুপারিশ :
১) আপনি যদি জনদরদী ধনী ব্যক্তি হয়ে থাকেন, আপনার যদি অনাহারীকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছে থাকে, হাতলে স্থানীয় মেয়র, পৌরচেয়ারম্যান বা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করুন।  উনার কাছে চাহিদা লিস্ট আছে। কে এ সপ্তাহে পেয়েছে কে এবং কোন স্থানে পায়নি। তিনি মেম্বার বা কাউন্সিলর দ্বারা লিষ্টটা নিবেন। ধরুন আপনি সামর্থ্য অনুসারে ৫০ জনকে ১০ কেজি করে  চাল দিতে পারবেন। তখন চেয়ারম্যান শুধু অতি চাহিদা এলাকায় ৫০ জন পরিবারের লিষ্ট করবে এবং শুধু নির্দিষ্ট দিনক্ষণে উক্ত ৫০ পরিবারের কর্তা (বয়ষ্ক) ব্যক্তি ছাড়া কেউ আসবে না। উক্ত সময়ে দাতা, জন প্রতিনিধি এবং গ্রাহকগণ উপস্থিত হবেন। সবাইকে নির্দিষ্ট দুরত্বে দাঁড়িয়ে একজনকে ত্রান প্রদান অবস্থায় ছবি তুলবেন।  বাকিজন নির্দিষ্ট স্থানে রাখা ব্যাগ (পোটলা) নিয়ে যাবে। কোন নেতা, পাতি নেতা,  চৌকিদারও নিজ হাতে ত্রানসামগী তুলে দিবে না কিংবা কাছে গিয়ে ছবি তুলবে না। সকলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করবেন। এখানে উল্লেখ্য যে,  ত্রানকর্তা যদি পছন্দনীয় কোন অভাবি ব্যক্তির (তার নিজ এলাকার)  নাম দিতে চান তাহলে ৫/১০ জনের নাম দিতে পারেন। ত্রানসামগ্রী বিতরণের ছবি প্রচার ও প্রকাশ দাতাগণকে উৎসাহী করে তুলে।এর উদ্দেশ্য হল ত্রান সামগ্রী বিতরণে কোন ঝগড়া মারামারি এবং কারো মনে দুঃখ হলো না। এতে করে জনপ্রতিনিধি, জনদরদী দাতা ব্যক্তি এবং গ্রহীতা সু্রক্ষা থাকলো।
২) সরকারি অনুদান এবং স্থানীয় দান একত্রে  সমহারে বিতরণ করা যেতে পারে। ধরুন এক এলাকায় ১০ টি পরিবার দিনে আনে দিনে খায়। এক পরিবারে ৫ জন সদস্য আর অন্য পরিবারে ৭/১০ জন সদস্য থাকতে পারে।  এক্ষেত্রে প্রতি এক সপ্তাহে ৫ জনের পরিবারে ১০ কেজি এবং ১০ জনের পরিবারে ২০ কেজি চাল বা অন্যান্য কিছু পেতে পারে। এভাবে পর্যায়ক্রমে চলবে। বাইরে কোন স্থানে রাস্তা ঘাটে রিক্সাওয়ালা বা পথচারী কে এলোমেলো ভাবে ত্রানসামগ্রী বিতরণ করা সঠিক নয়। গতকাল টিভি খবরে দেখলাম মেয়রের সামনে ত্রান সামগ্রী নিয়ে হাতাহাতি মারামারি। এতে আমরা সবাই অরক্ষিত থাকবো এবং কেউ বার বার পাচ্ছে আর কেউ পায় না। তাছাড়া অনেকে Lockdown  ভঙ্গ করে রাস্তায় বের হচ্ছে ত্রান পাওয়ার আশায়।
৩) স্থানীয়  দলীয় নেতা, সচেতন ব্যক্তি এবং মেম্বার চেয়ারম্যান  কর্তৃক (বিবেচনায় যারা পেতে পারে)একটি তালিকা করে নিতে হবে। নির্ধারিত পরিবারের ভোটার আইডি ফটোকপি নিতে হবে (বড় পাতায়) ।  ফটোকপির পিছনে সদস্য সংখ্যা লেখা থাকবে। কোন দিন কে কতটুকু পেল তা লিখা থাকবে। সেখানে উভয়ের স্বাক্ষর থাকবে। ত্রান সামগ্রী উত্তোলনের দিনে গ্রহীতা আইডি কার্ড সাথে আনবে। গ্রাম মহল্লা পাড়া অনুসারে তালিকা খাতায় লিপিবদ্ধ করে নিতে হবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদে এমন তালিকা অনুসারে দেওয়া হয় । তবে এক্ষেত্রে উক্ত এলাকার মেম্বার মোবাইলে বা  বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে আসবে যে তোমাদেরকে (তালিকাবদ্ধ)  ওমুকদিন এতটার সময় ত্রান দেওয়া হবে।
৪) রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রান সামগ্রী বিতরণ করাও বিপদজনক।  যেহেতু করোনা ভাইরাস অতি মহামারি (pandemic).  কারণ এতে অনেকে ভাববে – ভিক্ষা চাই না মাগো, করোনা সামলাও। তবে বাড়ি বাড়ি গেলেও ভিতরে প্রবেশ না করে মেইন গেটে ত্রানের পোটলা  রেখে আসা যায়।
৫) সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে বা অনেকের দাবি সেনাবাহিনী কর্তৃক ত্রানসামগ্রী বিতরণ করা হোক। ভালো তবে এলোমেলো ভাবে কোনটাই সম্ভব না।
এখন আমরা দেখি  করোনা কেন দীর্ঘস্থায়ী হবে:
সম্প্রতি উহান প্রদেশে Lockdown সীমিত করা হয়েছিল।  বাইরের লোকজন শহরে আসা শুরু করল। ৪ এপ্রিল আবার করোনা শনাক্ত হলো। করা হলো দ্বিতীয় বার Lockdown।  মানে দই জরন দিয়ে যারা দই বানায় তারাই একথাটা বুঝতে পারবে।
অতীত ইতিহাস ঘেঁটে দেখি :
১৭২০, ১৮২০, ১৯২০ আর ২০২০ সাল। কি বিভৎস শতাব্দী। যারা সৃষ্টিকর্তা মানেন না তারাই দেখুন ১০০ বছর পর পর কি হতে পারে?
১) ১৭২০ সালে বুবোনিক প্লেগ ইউরোপে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পরে। দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এক লক্ষ লোক মারা যায়। ধারনা করা হয় যে,  মাছির দ্বারা এই ব্যাক্টেরিয়া ছড়িয়ে পরে।
২) ১৮২০ সালে থাইল্যান্ডে প্রথম কলেরা মহামারি আকারে দেখা দেয়। ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন সহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পরে এবং লোক মারা যারা এক লক্ষেরও বেশী। ধারণা করা হয় নদীর দুষিত পানি পান করে এটা ঘটেছিল।
৩) ১৯২০ অতি ভয়াবহ শতাব্দী। প্রায় ১০ কোটি লোক মারা যায় স্প্যানিশ ফ্লুতে।  এটি ছিল ভয়াবহ  ভাইরাস বা ইনফ্লুয়েঞ্জা যা উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে উৎপত্তি হলেও   বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পরছিল।  অল্প বয়সী এবং বৃদ্ধরাসহ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) লোক আক্রান্ত হয়েছিল। স্থায়িত্ব ছিল ছিল ১৯১৮ জানুয়ারী টু ১৯২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মানে দু বছর। এ ভাইরাসটি অনেক বার জিনগত ভাবে পরিবর্তন হওয়ার কারণে ছিল খুব ভয়াবহ এবং প্রতিষেধক তৈরি করা দুষ্কর ছিল  । পরে ধারণা করা হয়েছিল মাস্ক ব্যবহার করলে এত ক্ষতি হতো না।
৪) ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস যা গোটা বিশ্বকে ঘরে আবদ্ধ করে ফেলেছে। মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না বিশ্বের নেতৃবৃন্দ,  ডাক্তার, নার্স, খেলোয়াড়, শিল্পীসহ খেটে খাওয়া মানুষ। আক্রান্ত ব্যক্তির  হাঁচি কাশি শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পরছে। আক্রান্ত ২০২ দেশের ২ কোটি মানুষ আর মৃত্যু অর্ধকোটির বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলেও ৫০ হাজার চীনা অধ্যুষিত একটি অঞ্চলে কেউ এখনও করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি।  এর কারণ হলো,  চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাস উৎপত্তি হলে এবং বিশ্বে ছড়িয়ে পরার জন্য তারা আক্রোশের মুখে পরতে পারে ভেবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ঐ অঞ্চলের  চীনা প্রবাসীরা ঘর থেকে বের হয়নি। অথবা উহানে Lockdown পদক্ষেপ গ্রহন করার কারনে বিস্তার ঠেকানো নীতি গ্রহন করেছে তারা।

লেখক, কৃষ্ট মোহন সিংহ

তাই  Lockdown, Home quarantine, Isolation, Using Mask, regular hand washing ছাড়া উপায় দেখছি না। বৃহত্তর কল্যাণে আমরা সবাই ত্যাগ স্বীকার করি। কষ্ট করি, অন্যকে বুঝাই নিজে বুঝি। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দেওয়া আইন মেনে চলি। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, প্রধানমন্ত্রী ও ২/৫ মন্ত্রী,  সচিব বা সাংবাদিক  মিলে এসি রুমে বৈঠক করবেন না। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলাপ হতে পারে।

লেখক : প্রভাষক (যুক্তিবিদ্যা), সরকারি শহীদ আকবর আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয, বালিয়াডাঙ্গী, ঠাকুরগাঁও।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

করোনা বিষয়ে প্রশ্নোত্তরসহ সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান

ঢাকা :: জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতির এবং প্রকৃত অবস্থার তথ্য মানুষের কাছে লুকানো ...