আগামী ৩ জুন ২০২১ তারিখে জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে ২০২১-২২ অর্থবছরে আরও বড় উন্নয়ন বাজেট দেবে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২১-২২ সালের বাজেটে চলতি বাজেটের চেয়ে অন্তত ৮ ভাগ বেশি বরাদ্দ থাকবে। তবে কমতে পারে বরাদ্দের খাতের সংখ্যা। সম্পতি পরিকল্পনা মন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে এমনটাই মনে হয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী বলছেন, মহামারির পর অর্থনীতি চাঙা করতে বড় এডিপি দরকার, দরকার বড় ধরণের কর্মসংস্থান, তাই স্বাভাবকভাবেই বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। এগুলো সবই আশাজাগানিয়া।

বিভিন্ন মহল থেকে এবারের বাজেটকে ‘বেঁচে থাকার বাজেট’ উল্লেখ করে এ বাজেটে সরকারকে স্বাস্থ্য বিশেষতঃ জনস্বাস্থ্য খাতে আরও গুরুত্ব দেয়ার আহবান জানানো হচ্ছে। দুর্যেোগময় এ সময়ে দুঃস্থ ও পিছিয়ে থাকা মানুষের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধির অনুশীলন উন্নয়‌নে কতটা বরাদ্দ র‌য়ে‌ছে; নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং হাইজিন (ওয়াশ) খা‌তে বরাদ্দ আগের থেকে বাড়বে কিনা- বিষয়গুলি আর একটু খ‌তি‌য়ে দেখলে হয়ত উত্তর মিলবে।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমন মহামারী -আকারে ছড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতের চ্যালেঞ্জ অনেকগুনে বেড়ে গেছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাভাবিক কারণেই দেশের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবীটিও জোরালো হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেটে ওয়াশখাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার গুরুত্ব একেবারে স্পষ্ট।

২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে বরাদ্দ বিষয়ে ইতোমধ্যেই ওয়াশ সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি সংস্থাসমূহ, বিভিন্ন নেটওয়ার্কসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টরা আলোচনা শুরু করেছে। বাজেট বরাদ্দ বিষয়ে ওয়াশ সেক্টরের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।

২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ও আমাদের প্রত্যাশা

বর্তমান কোভিড-১৯ মহামারি/অতিমারি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের উপর বিরূপ প্রভাব ফেললেও প্রান্তিক এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ওপর এই প্রভাব অনেক বেশি। ঝুঁকিতে থাকা এই জনগোষ্ঠীর জন্যে, তাদের যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় বাজেট ২০২১-২২ কী থাকছে?

কোভিড–১৯ কে একটি সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই – এটি ভয়ানক মহামারি, সেটা বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশের জন্য বর্তমান এ সময়ে এবং মহামারী-পরবর্তীকালেও স্বাস্থ্যবিধিকে অন্যতম নীতি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যবিধি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এটা সময়েরও দাবী।

ওয়াশ খাতে বরাদ্দ গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১০৭.৯৬ বিলিয়ন টাকা বেড়ে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ১২২.২৭ বিলিয়ন টাকায় উন্নিত হয়েছিল, যা প্রশংসনীয়। করোনা পরিস্থিতিতে এ খাতে আরও বেশি পরিমাণে বিনিয়োগের প্রয়োজন। গত অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে রাখা ১০০ বিলিয়ন টাকার থোক বরাদ্দ স্বাস্থ্যবিধি উন্নয়নে ব্যবহার হয়েছে এমন তথ্য উপাত্ত আমাদের কাছে নেই। আমরা আশা করি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ বিষয়ক সুস্পষ্ট বরাদ্দ ও নির্দেশনা থাকবে।

গত মার্চ (২০২১) মাসেই স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজী পেপার ২০২০-২২ : রিসপন্স টু কোভিড ১৯ আউটব্রেক থ্রু ওয়াটার স্যানিটেশন এন্ড হাইজিন ইন্টারভেনশনস’ নামক একটি কৌশলপত্র চুড়ান্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জাতীয় এ কৌশলপত্র অনুসরণে কোভিড ১৯ প্রতিরোধে জরুরী পদক্ষেপসমূহ এবং সরকারের মধ্যবর্তী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ৮৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৭,২১৭ কোটি টাকা) অর্থায়নের প্রয়োজন। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে প্রায় ২৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (২,৫৩৩ কোটি টাকা)(৩৫%) ও বিদেশী সহায়তাসহ অন্যান্য উৎস থেকে ৫৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৪,৬৮৪ কোটি টাকা) (৬৫%) সংস্থানের পরিকল্পনা বলা হয়েছে।

নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। কাউকে পিছনে রেখে নয়, সকলের জন্য সবসময় টেকসই ও মানসম্পন্ন নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা বর্তমানে দেশের জন্য একটি অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ে এসডিজি ল্যাডারে উল্লিখিত সংজ্ঞা ও ইন্ডিকেটরসমূহ সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে দ্রুত অস্পষ্টতা দূর করতে না পারলে লক্ষ্য অর্জন বিলম্বিত হবে|

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধির অনুশীলন উন্নয়‌নে পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতের চ্যালেঞ্জ অনেকগুনে বেড়ে গেছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাভাবিক কারণেই দেশের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) পরিস্থিতির উন্নয়নসহ জনস্বাস্থ্য খাতে আরও গুরুত্ব দেয়া বিশেষভাবে জরুরী।

২০২০-২১ – মহামারীকালের বাজেট
কোভিড-১৯ মহামারীকালে নানা চাপের মধ্যেও আমরা দেখেছি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বড় বাজেট দিয়েছে সরকার। গতানুগতিক বাজেটের ধারা থেকে সরে এসে সরকারের অগ্রাধিকারের কাঠামো সর্বোপরি মানুষের জীবন আর জীবিকা- দুই কূলই রক্ষা করার কথা মাথায় রেখেই এ বাজেট দেয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারী গোটা দুনিয়ার চেনা-জানা অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হয়েছে, লকডাউনে আয়হীন-কর্মহীন হয়ে পড়া কোটি মানুষের খাওয়ানোর জন্য রাখতে হয়েছে অর্থ। এভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেড়েছে ব্যয়ের বড় বড় অংক।

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে বড় অঙ্ক বরাদ্দ করা হয়েছে, তা কীভাবে ব্যয় হবে, তার দিক-নির্দেশনা না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা মাস্ক পরার মত বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও করোনা প্রতিরোধে জরুরি স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) খাতটিতে যথাযথ বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) খাতে ২০২০–২০২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ একেবারেই কম ছিল।

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট বিষয়ে শেষ কথা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ কর্তৃক জারিকৃত (২৬ এপ্রিল ২০২১) এবারের বাজেট পরিপত্রে ২০২১ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রাক্কলন এবং ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রক্ষেপণ প্রণয়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিস্তারিত অর্থনৈতিক কোড অনুযায়ী বাজেট প্রাক্কলন ও প্রক্ষেপণ প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। নির্দেশনায় মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসমূহকে দেশের মধ্যমেয়াদি কৌশলগত উদ্দেশ্য ও লক্ষমাত্রাসমূহ অর্জন এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২০-২০২৫)  ২য় প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় (২০২১-২০৪১) অন্তর্ভুক্ত নীতি ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাজেট প্রণয়ন বিষয়ক সরকারী এ নির্দেশনায় দারিদ্র্য নিরসন সহায়ক কর্মকান্ডে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে প্রদেয় সেবার মান ও পরিমান বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে কোভিড-১৯ এর আলোকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলিতে স্বাস্থ্যবিধির (হাইজিন) অগ্রাধিকার ও ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশগুলি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে মহামারী প্রতিরোধের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এবং দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া এলাকায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সামগ্রিক অবস্থা উত্তোরণে জনস্বাস্থ্য এবং মহামারী প্রস্তুতির এক অত্যাবশ্যক হাতিয়ার হিসাবে স্বাস্থ্যবিধি (হাইজিন) ও ওয়াশকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো ও নায্যতা নিশ্চিত করা জরুরী।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু দু’টিই ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় স্বাস্থ্য এবং ওয়াশ খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ খাতে জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দের বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে। বর্তমান অবস্থায় দেশের পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন পরিস্থিতির উন্নয়নের বিষয়টিও জরুরিভাবে সামনে এসেছে। এরই প্রেক্ষিতে শহর-গ্রামের বরাদ্দ বৈষম্য দুর করাসহ কোভিড মহামারী মোকাবেলায় সঠিক স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিকরণ হোক বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার।

লেখকঃ হাসিন জাহান, কান্ট্রি ডিরেক্টর ও রঞ্জন কুমার ঘোষ, এডভোকেসি স্পেশালিস্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here