ব্রেকিং নিউজ

ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে

স্টাফ রিপোর্টার :: ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আস শামস জগলুল হোসেন তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মোয়াজ্জেমের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল জামিন নামঞ্জুর করেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে মোয়াজ্জেমকে শাহবাগ থানা থেকে আদালতের হাজতে আনা হয়। দুপুর ২টার পর হাতকড়া পরানো ছাড়াই তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এ সময় আদালতে উপস্থিত শতাধিক আইনজীবী চিৎকার করে তাঁকে হাতকড়া পরাতে বলেন। মোয়াজ্জেম প্রথমে কাঠগড়ায় দাঁড়াননি। আইনজীবীরা সমস্বরে তাঁকে কাঠগড়ায় ওঠানোর দাবি জানান। এ সময় ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তিনি আসামির কাঠগড়ায় উঠতে বাধ্য হন। মোয়াজ্জেম টিশার্ট ও চোখে কালো চশমা পরে এজলাসে ঢোকেন। আইনজীবীদের চিৎকারে তিনি চশমা খুলতেও বাধ্য হন।

মোয়াজ্জেমের জামিনের আবেদন করেন তাঁর আইনজীবী মাসুমা আক্তার। জামিনের বিরোধিতা করেন মামলার বাদী ব্যারিস্টার সুমন। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল জামিন নামঞ্জুর করেন।

ভিডিও ধারণের কথা বের হলো আইনজীবীর মুখে : মোয়াজ্জেমের পক্ষে শুনানিতে তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওসির কোনো আইডি থেকে ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ভিডিওটি ছড়ানো হয়নি। সজল নামে এক সাংবাদিকের আইডি থেকে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। ওসির কোনো অপরাধ নেই। তাঁকে জামিন দেওয়া হোক।

এ সময় ডিজিটাল আইনে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বিচারকের উদ্দেশে বলেন, ‘মামলাটি দায়েরের পর আপনি তদন্তে পাঠান। পিবিআই তদন্ত করে ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আপনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০ দিন আগে পরোয়ানা জারি করলেও ওসি পালিয়ে ছিলেন। আপনার আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে তিনি পালিয়ে ছিলেন। আইনের লোক হয়ে আইন ও আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।’

একপর্যায়ে অ্যাডভোকেট ফারুক আহমেদ আসামিপক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম পলাতক ছিলেন না। তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাননি। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেছেন। হাইকোর্ট চত্বর থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু বলা হচ্ছে বাইরে থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘ওসি সাহেব আপনার ট্রাইব্যুনালে আসতে নিরাপত্তা পাননি। তাঁকে বাইরে বের হলে মিডিয়াকে ফেস করতে হয়। অনেককে ফেস করতে হয়।’

এ সময় বিচারক প্রশ্ন করেন, ‘একজন পুলিশ অফিসার সিকিউরিটির অভাব বোধ করেন? তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?’ আইনজীবী ফারুক বলেন, ‘একজন ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করেছেন। আর আসামি শেয়ার করেছেন।’ বিচারক প্রশ্ন করেন, ‘রেকর্ডিং কে করেছে?’ আইনজীবী বলেন, ‘আসামি করেছেন।’ বিচারক প্রশ্ন করেন, ‘কেন করেছেন?’ আইনজীবী উত্তরে বলেন, ‘এ ধরনের মামলা অনেক সময় কম্প্রোমাইজ হয়। অনেক সময় বাদী মামলা প্রত্যাহর করে নেয়। এ কারণে ভিকটিমের সঙ্গে কথোপকথন…।’

এ পর্যায়ে বিচারক বলেন, ‘আপনি তাহলে অ্যাডমিট করছেন যে ভিডিওটি ওসি সাহেব রেকর্ডিং করেছেন?’ এ সময় আইনজীবী বলেন, মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। বিচারক বলেন, ‘আপনি আমার প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ অথবা না বলেন।’ আইনজীবী তখন অন্য কথা বলেন। তিনি বলতে থাকেন, আসামিকে জামিন দেওয়া হলে তিনি পালাবেন না—ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি মো. নজরুল ইসলাম শামীম জামিনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। ট্রাইব্যুনাল এক মিনিটের মধ্যে আদেশ দেন, ‘জামিন নামঞ্জুর।’

অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানি ৩০ জুন : গতকালই এই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলসংক্রান্ত প্রতিবেদনের জন্য শুনানির দিন ধার্য ছিল। মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করায় এখন মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় আগামী ৩০ জুন অভিযোগ গঠন বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

গত রবিবার হাইকোর্টে জামিন আবেদন জানিয়ে বের হলে শাহবাগ এলাকা থেকে মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল তাঁকে ফেনীর সোনাগাজী থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। সোনাগাজী থানার পুলিশ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে। গত ২৭ মে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন এই ট্রাইব্যুনাল। তার আগের দিন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মোয়াজ্জেমের অপরাধসংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

নুসরাত জাহান রাফির গায়ে দুর্বৃত্তরা আগুন দেওয়ার কয়েক দিন আগে সে থানায় গেলে তার বক্তব্য ভিডিও করেন ওসি মোয়াজ্জেম। পরে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে গত ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সুমন এই মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, পিবিআই সদর দপ্তরের সিনিয়র এএসপি রিমা সুলতানা তদন্ত প্রতিবেদনে বলেন, নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর তাকে থানায় জেরা করার দৃশ্য নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করে তা প্রচার করার মাধ্যমে ওসি মোয়াজ্জেম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।

মামলার আরজিতে বলা হয়, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে মাদরাসার অধ্যক্ষ তাঁর অফিসের পিয়ন নুরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রী নুসরাতকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি।

আরজিতে আরো বলা হয়, যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে যাওয়ার পর সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসির কক্ষে আরেক দফা হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল নুসরাতকে। নানা রকম কুরুচিপূর্ণ প্রশ্ন করা হয় মেয়েটিকে। অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সে মারা যায়।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মেঘনার ভাঙনে নিঃস্ব রামগতি-কমলনগর উপজেলার লাখো মানুষ

মেঘনার ভাঙনে নিঃস্ব রামগতি-কমলনগর উপজেলার লাখো মানুষ

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:: মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও ...