এলিজা খাতুনের গল্প ‘বৃত বাতাস’

এলিজা খাতুন

এলিজা খাতুন :: পদ্মপাতার গলা শুকিয়ে আসছে।জল নেই একফোঁটা।জলের বোতলটা ব্যাগে নিতে ভুলে গেছে ।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হয়েছে, গন্তব্য সেখানে। জলপিপাসার কথা বাবাকে জানায়। ট্রাভেল ব্যাগের হাতল ধরিয়ে পাতাকে প্লাটফরমের বেঞ্চে বসিয়ে বাবা যায় টিকিট আর জলের বোতল কিনতে।

অল্পক্ষণেই বাবা এসে পাতার হাতে জলের বোতল সহ তালপাতার একটা হাতপাখা ধরিয়ে ব্যাগ তুলে ট্রেনের দিকে এগোয়। পেছনে হাঁটে পদ্মপাতা।যাত্রীর ভিড় ঠেলে এক বগি থেকে আরেক বগিতে যাবার কসরত কম নয়। কোনভাবে সিটে এসে বসে। জানালার পাশে বসেই পাতা রডে মাথা ঠেকায়। প্রচন্ড গরমে মাথা পাক খাচ্ছে পাতার।

সামনের সিটে বসা একটি সুদর্শন যুবক।ভদ্র মার্জিত যুবকের বিনয়ী অভিব্যক্তি যে কারো চোখে পড়ার মতো। বাবার ক্ষেত্রেও  ব্যতিক্রম হয়নি; জিজ্ঞাসা করেই ফেললো কী নাম? কোথায় যাবে?  এভাবে ধীরে ধীরে আলাপ ঘনিয়ে আসে।

বাবার প্রশ্নে পাতার জানা হয় বর্ষণ সম্পর্কে।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স, একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে গেছিলো। ইন্টারভিউ হয়নি।কয়েকমাস পূর্বে ছাঁটাই হওয়া শত শত কর্মী গেট অবরোধ করে ছিল। শূন্য পদগুলোতে নতুন লোক নিয়োগ হলে নাকি তাদের চাকরী ফিরে পাবার সম্ভাবনাটুকু শেষ হয়ে যাবে।তুমুল বিরোধিতার মুখে কর্তৃপক্ষ ইন্টারভিউ স্থগিত করেছে।তবে উঁচু পোস্টেগুলোর জন্য খুব শিঘ্রই আরেকটা ডেট দেবে এ-আশা নিয়ে বর্ষণ বাড়ি ফিরছে। বাবার মুখেও পাতার ভর্তি সংক্রান্ত নানা কথাও শোনে বর্ষণ।

ইতোমধ্যে পাতা মাথাটা আরেকটু হেলে দিয়েছে জানালায়।ভার্সিটি ক্যাম্পাস সম্পর্কে অনেক গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে পাতার অন্যমনষ্ক মুখে তাকাচ্ছে বর্ষণ। শুধু বাতাসের জন্যই কি জানালায় এভাবে মাথা দিয়েছে মেয়েটা? নাকি অন্য কোন অসুবিধা! ভ্রমণে উৎফুল্লতা থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়!

ট্রেন চলছে ছন্দে, মৃদু বাতাসে চুল উড়ে পাতার কপালে পেলবতা বাড়িয়েছে। বাবার সাথে এত কথা চলছে অথচ পাতার ভ্রুক্ষেপ নেই এতটুকু! বোঝাই যাচ্ছে মেয়েটা ঠিক এখানে নেই। অন্য কোন ভাবনায় আছে। সত্যিই পাতা ভাবছে তার ফেলে আসা ছোট্ট কামরাটার কথা। জানালাবিহীন খাঁচা তবু কেমন মায়া জাগে তাতে।হোস্টেলের ঘরগুলো হয়তো বড় বড়, জানালা আছে নিশ্চই। এসব নানা ভাবনা।

ট্রেনের গতি কমছে। গতির পরিবর্তন সামলাতে পারেনা পাতা। জানালায় মুখ বাড়ায়। ট্রেন থামতেই বাবা নেমে যায় কমলালেবু কিনতে, লেবুর ঘ্রাণে নাকি গা গুলানো ভাব কাটে। জল ছাড়া কিছু ওঠেনা পেট থেকে, ঘেমে কাহিল আবস্থা। একটু ইতস্ত হলেও, বর্ষণ পাখাটা হাতে নিয়ে পাতার মাথায় বাতাস দিতে দিতে বলল- “একটা এভোমিন খেয়ে নিলে সমস্যা হতোনা” পাতা নিরুত্তর। বর্ষণ দ্যাখে পাতার ঘামসিক্ত মুখ। বাবা না ফেরা পর্যন্ত বাতাস নামে পাতার মাথায়। বাইরে চারপাশটা গুমোট; ঝড়ের আভাস দেখেছে পত্রিকায়।

হুইসেল বাজতেই ট্রেন চলতে লাগে। বাবা ফেরে না। পাতাকে চিন্তিত দেখে বর্ষণ বলল- “চিন্তা করবেন না, নিশ্চয়ই অন্য বগিতে উঠে পড়বেন তিনি” পাতাও তাই ভাবে। এমন শান্তনার বাণী কখনও শোনা হয়নি পাতার।বর্ষণ বাবার জায়গাটিতে এসে বসে। পুরুষযাত্রিদের ভিড় ঠেলে আসা থেকে যেন বাঁচাচ্ছে পাতাকে। পাতা অবাক হলেও অনুভব করে বর্ষণের প্রতি ওর কেমন ভরসা জন্মেছে।

প্লাটফরম ছাড়িয়ে অনেক দূরে, ট্রেন ছুটছে দুরন্ত। লোকালয়, দোকানপাট ছেড়ে সবুজ ঘন ঝোপঝাড়, সারিসারি গাছ আর মাঠের পর মাঠ সরে সরে যায় দুপাশে.. ঝড় উঠেছে ইতোমধ্যে। জানালায় বাতাসের ঝাপটা শুরু হয়েছে। পাতার চুল উড়ে বর্ষণের মুখে এলামেলো স্পর্শ দেয়। বর্ষণের মনে বিস্ময় জাগায় বাতসের প্রবাহ; ঝড়ের এ এক অজানা পেলবতা, নতুন করে চেনা।বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে নিসর্গে ডুবে ডুবে ট্রেন চলছে। বুনো ঝোপঝাড় জঙ্গল ছিঁড়ে প্রবল বাতাস এসে পাতার গাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে বর্ষণের দিকে বয়ে যাচ্ছে।ভ্রমণের ভাঁজে ভাঁজে যেন এক মাতাল বিস্ময় গেঁথে যাওয়া! বাতাসের মদিরায় দুটি হৃদয় এভাবে কতক্ষণ কেটেছে টের পায়নি কেউ।

ট্রেনের ধীরে গতিতে সম্বিত ফেরে। রাজশাহী স্টেশন, বর্ষণ নেমে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে হতে পাখাটা ধরিয়ে দেয় পাতার হাতে। ভাষাহীন বিষন্নতায় পাতার চোখজোড়া স্থির হয় বর্ষণের চলে যাবার দিকে।  “পদ্ম ওঠ্, নামতে হবে” বাবার এ কথায় পদ্মপাতা উঠে এগোয়। প্লাটফর্মে নেমে ডানে বামে সামনে পেছনে দূরে পাতা খোঁজে একটু আগেই ক্ষণকালের-অতিআপন মুখখানা।

হঠাৎ পাখার তালপাতা-ডাঁটায় গোঁজা চিরকুট দেখে চমকিত হয়। ছোট্ট ভাঁজ খুলে দেখতে যায়, ঠিক এমন মুহূর্তের দমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নেয়  চিরকুটটা। এলোপাথারি উড়তে উড়তে রেললাইনের দূরে গিয়ে হারায়, বোধহয় পাথরের খাঁজে । তীর্যকভাবে আসা বৃষ্টির ঝাপটা প্লাটফরম ভিজিয়ে দিচ্ছে, আর একটা বুনো বাতাস যেন উদ্বেলিত করে বয়ে গেলো পাতার হৃৎপিন্ড বরাবর।

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

‘সাইমন জাকারিয়া নিরপেক্ষ গবেষক নন’

ডেস্ক রিপোর্ট ::  সরলপুর ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটি নিয়ে সম্প্রতি বাংলা একাডেমির ...