ব্রেকিং নিউজ

এলিজা খাতুন’র “বর্গামাটি”: মাটিঘেঁষা মানুষের গল্প, শিকড়ের গল্প

এলিজা খাতুনপ্রত্যয় হামিদ :: ‘বর্গামাটি’, ‘গন্ধশিশি’ ও ‘চকমকি পাথর’ তিনটি গল্প নিয়ে এলিজা খাতুনের গল্পগ্রন্থ- “বর্গামাটি”। লেখক তিনটি গল্পেই সমাজের মাটিঘেঁষা মানুষের বিশ্বস্ত চিত্র নিরপেক্ষভাবে তুলে এনেছেন সন্ধানী পাঠকের জন্য।

শিরোনামে থাকা গল্প “বর্গামাটি” গ্রামীণ সরল জীবনের ভাঁজে ভাঁজে জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা কিছু কীটকে যেমন তুলে এনেছে, একইভাবে অসহায় মানুষের প্রতিদিনকার জীবনসংগ্রামকে খুব নিষ্ঠার সাথে চিত্রায়ন করেছে। মাটি, মাটির মা, তার বাবা রইস- হাজার বছরের নিপীড়িত বাংলাকে প্রতিনিধিত্ব করে।

মাটি নেই যাদের, তারা অন্যের মাটি বর্গা নেয়, চাষ করে, ফসল ফলায়। বর্গা দেয় কারা? যাদের অনেক মাটি আছে। কিন্তু বর্গামাটি- গ্রন্থের ‘বর্গামাটি’ গল্প ঠিক সেই বিশ্বাসের সাথে পাঠককে সামনে এগিয়ে নিলেও, গল্পের শেষে এই চিন্তাস্রোতকে যেন উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়। গল্পের ট্রাজেক্টরি লাইনের এক বিশাল কার্ভ গল্পকে পুনঃপাঠে উদ্বুদ্ধ করে। গল্পটি চিন্তাকে শুধু খোরাকই জোগায় না, তাকে হুলফোটানোর ক্ষমতা দিয়ে পাঠকের মস্তিষ্কে ছেড়ে দেয়। মাটিহীন একজন দরিদ্র মানুষ, রইস, শেষ পর্যন্ত অজান্তেই বর্গা দেয় তার মাটিকে- তার মেয়েকে। অর্থনৈতিক, সামাজিক বৈষম্য-বঞ্চনার প্রবল ও চিরন্তন চিত্র বর্গামাটি। গল্পের চরিত্রদের সংলাপে উত্তরবঙ্গের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আঞ্চলিক ভাষা-সম্বলিত এই গল্পে ‘মাটি’ নিয়ে গল্পকারের যে শব্দদ্বৈতনা, তা-ও এ গল্পের একটা সাবলীল অলংকরণ।

গল্পের শেষে এসে মাটির একটা সংলাপ যেন পাঠককে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়- “তুমি সারা জীবন পরের মাটিতে বর্গা খাট্যাছো। এবার তোমার মাটিকে বর্গা থুয়্যা যাও আব্বা।” — ভূমিহীন রইস কি হঠাৎই ‘মাটি’র মালিক বনে যায়! মাটি ঘোষণা দেয়- …“ তোমার সংসারে এখন থাইক্যা অভাব হব্যেনা।”

‘বর্গামাটি’ গল্পটি কলেবরে একটু দীর্ঘ মনে হয়েছে ; তবে এটা লেখকের নিজস্ব ধাঁচে গতিশীল থেকেছে শুরু থেকে শেষ অব্দি এবং পাঠ্যভ্রমণে বিরতি বা অমনোযোগীতার সাথে পাঠকের কোনভাবে পরিচয় ঘটেনা। এখানেই লেখকের মেধা ও সুচিন্তার ছাপ মেলে।

‘গন্ধশিশি’ পারিপার্শ্বিক নৈমিত্তিক দৃশ্য সম্বলিত একটা চমৎকার গল্প। সমাজে বিত্তবান ও সম্পদশালীদের দ্বারা বিত্তহীনদের প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত, কোনঠাসা হয়ে জীবন প্রবাহের ছবি ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়ে নিঁখুতভাবে তুলে ধরা লেখকের অসাধারণ দক্ষতা । গল্পের নৈপুণ্যে মনে হয় লেখক খুব কাছে থেকে স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন দৃশ্যপটগুলো । এই গল্পটিতেও একটা পাঞ্চলাইন আছে (তবে, গল্পকার সেই পাঞ্চলাইন দিয়েই যদি গল্পটা শেষ করে দিতেন, পাঠক তার চমকের রেশটা নিয়েই গল্প থেকে বের হয়ে আসতে পারতেন!)। ‘যত দোষ নন্দঘোষ’ বলে যেমন একটা কথা আছে, তেমনি আরেকটি বহুল প্রচলিত কথা- যা কিছুই হারাক, ‘গিন্নি বলে কেষ্ট বেটাই’ চোর। আম্বিয়ার উধাও হয়ে যাওয়াকে সবাই নেহাল কাজির বাড়ির পাশের খেটে খাওয়া কুদ্দুস মিঞার কাজ বলে বিশ্বাস করতেই পারে ! কিন্তু লেখক এখানে তার টুইস্টের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। আম্বিয়া ফিরে এসে কেমন চমকে দেয়, থমকেও দেয় ! এদিকে- “কপালি নিজের ঘরে ফিরে দরজার পাল্লাটা ভিড়িয়ে কুমকুমকে বুকের মাঝে নিল, সেই সাথে প্রাণ ভরে দীর্ঘশ্বাসও। নিশ্চিন্ত ঘুমে চোখ বুজে এল কপালির।”

বাস্তবতা যে সাধারণ ভাবনা, প্রচলিত হিসেবকে কঠিন-সুন্দর করে তুলতে পারে, ‘গন্ধশিশি’-র মাধ্যমে তা-ই আবিষ্কৃত।

এলিজা খাতুন

এলিজা খাতুন

বর্গামাটি-র তৃতীয় গল্প ‘চকমকি পাথর’। একজন নারীর বিচ্ছিন্ন, একক সংগ্রামের চিত্র, একই সাথে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে পারিবারিক, সামাজিক চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন যাপন ; পরবর্তীতে জয়ী হওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ ও সম্ভাবনার দরজায় পা রাখা ; এ কাজটাও করতে হয়েছে যে নারীকে(রেণুকা), তারও নিজেকে প্রাপ্য সম্মানের অধিকারী করে তোলা। একদিকে তার প্রতি তার স্বামীর, আত্মীয় পরিজনের, সমাজের অবহেলার চূড়ান্ত রূপায়ণের আভাস, অন্যদিকে মেয়ে অরণী’র একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত– এই যুগপৎ রূপ-রেখার প্রতিবিম্ব “চকমকি পাথর” পাঠককে আন্দোলিত করে। গল্পরেখায় একটা অসামান্য টুইস্ট পাঠককে শেষ বিচারে হাসিমুখেই বই বন্ধ করার সুযোগ দেয়। রেনুকা তার স্বামীর রেখে যাওয়া খাম থেকে ডিভোর্সের চিঠির পাশাপাশি মেয়ের আয়ের টাকা ও ভবিষ্যত আয়ের অর্ডার লেটার পায় একই সময়।

“অর্ডারের চুক্তিপত্র এবং মোজাম্মেলের রেখা যাওয়া ডিভোর্স পেপার- দুটোতেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে”—- সাক্ষর করার সিদ্ধান্তের যে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ রেণুকার চিন্তার মাঠে ! -ভাগ্যকে এখানে বেশ পরিণত মনে হয়েছে ; সে কেবল জীবন থেকে ছিনিয়েই নেয়নি, বিনিময়ে ফিরিয়ে দিয়েছে, ফিরিয়ে দেয় পুরোটাই(নাহ, আরও বেশি) নিষ্ঠা ও শ্রমের দামে।

বর্গামাটি পড়ার সময় পাঠক একটা চুম্বক টান অনুভব করবেন ; সেই টানে তিনি বইটির একেবারে শেষ পৃষ্ঠা অবধি আসবেন কোন রকম বিরতি ছাড়াই।ঋদ্ধ হবে পাঠকের পঠন অভিজ্ঞতা। নিজের চেনা সমাজকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে চাওয়া, জীবন ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে বিশেষভাবে দেখার সামগ্রিক আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করতে “বর্গামাটি”র গল্পসমূহ সমৃদ্ধ বলবো। গল্পকার এলিজা খাতুনের জন্য শুভ কামনা।

 

 

 

লেখক: কবি, গল্পকার, শিশু সাহিত্যিক।

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

দেড় বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষার্থীরা

দেড় বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষার্থীরা

রওশন আলম, গাইবান্ধা প্রতিনিধি :: বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় দেড় ...