এরশাদ সাহেব ও কিছু স্মৃতি

এরশাদ সাহেব ও কিছু স্মৃতি

জি এম কামরুল হাসান :: রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা ও বৈধ-অবৈধ এসব কিছু বিষয়ে না গিয়ে একজন ব্যক্তি এরশাদ ও আমার ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেস্টা করছি।

সৈয়দপুর টু রংপুরঃ

১৯৯৬ সাল। জেল থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন। এর পর উনি নিজ পৈত্রিক নিবাস রংপুরে আসলেন। সেদিন সৈয়দপুর বিমানবন্দর হতে রংপুর ৩০ মিনিটের পথ হয়ে গেলো কয়েক ঘন্টার!পথের দু’ধারে দাঁড়িয়ে লাখ- লাখ নারী পুরুষের ঢল! সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত -গভীর রাত,মা বোন বৃদ্ধ- আবাল বৃদ্ধা বনিতা হাতে তাদের কুপি – হারিকেন-টর্স যার যা ছিলো তাই দিয়ে আলোকিত করেছিলো পথ সেদিন। মুখে ধ্বনিত হচ্ছিলো “মোর ছইল ঘরত আলছে” সেদিনের সেই ঢল ঠেলে যখন তিনি পৈত্রিক নিবাসে পৌছুলেন তখন তার চোখে মুখে যে অভিব্যক্তি আমি দেখেছিলাম সত্যি ভোলার নয়। আর রংপুরের মানুষের সেদিনের সেই উচ্ছাস বিরল এবং ব্যতিক্রম!এমন জনপ্রিয়তা খুব কম নেতার ভাগ্যেই জুটে।

সাইকেল তুমি পাবেনা দেখ কস্ট না করলে বড় হবে কিভাবেঃ

আমার এক বন্ধু নাম রুমেল প্রায়ই আমাকে বলতো দোস্ত এরশাদ সাহেব কে বলে আমার একটা সাইকেল নিয়ে দে, আমার আর হাটতে ভালো লাগেনা।বাড়ীর অবস্থাও বালো না। একদিন এরশাদ সাহেব রংপুর এলেন যথারীতি ওকে সহ কয়েকজন মিলে উনার বাসায় গেলাম একসাথে চায়ের ফাঁকে রুমেল বলে ফেললো স্যার আমার একটা সাইকেল লাগবে। উনি একটু বিশ্ময়ের চোখে তাকালেন এবং বল্লেন ” এই ছেলে আবার বলো কি বল্লে” ও বল্লো স্যার আমার কলেজে যেতে অনেক কস্ট হয় তাই আমার একটা সাইকেল দরকার। উনি বল্লেন ” তুমি জান আমি এই বাসা থেকে কারমাইকেল কলেজ যেতাম পায়ে হোটে, প্রায় ছয় কিলোমিটার, আর তুমি আসছ সাইকেলের জন্যে? সাইকেল তুমি পাবে না, কস্ট না করলে বড় হবে কি ভাবে??আজ থেকে টিউশনী করবে, একটা সাইকেল কিনতে কয়টাকা লাগে? আমি তোমাকে ওটা দিতে পারতাম বাট দিবোনা,কস্ট করো একদিন বুঝতে পারবে কেন আমি দিলাম না।”একসাথে চা শেষ করে কিছু বিষয়ে কথা শেষ করে চলে আসার সময় উনি রুমেলের মাথায় হাত রেখে বল্লেন” মন খারাপ হয়েছে? মন খারাপ করোনা বড় হবে” সেদিনের কথা গুলো আজও ভাবি উনার কস্টের জীবন। শুনেছি সেদিন বড় ছেলে হিসেবে ভাই বোনদের মানুষ করতে তাঁর ত্যাগের কথা সত্যিই স্বরনীয়।

তুমি এখানে? কখন এলে?

১৯৯৭ সালে এরশাদ একবার রাজশাহী টাউনহলে দলের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে গিয়েছিলেন। মন্চে উঠবেন এমন সময় প্রচন্ড ভিড় ঠেলে উনার সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম, উনি দেখেই “তুমি এখানে? কখন এলে? ” সালাম দিলাম আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন বল্লেন”এতোদূর থেকে এসেছ” পাশ থেকে এ্যাডঃফজ্বলে রাব্বী (এখন সংসদের ডেপুটি স্পিকার)বলে উঠলেন স্যার আপনার ভবিষ্যৎ।
এরশাদ বল্লেন থাকো সার্কিট হাউজে কথা হবে।সেই অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় রাব্বী সাহেব বলেছিলেন আমাদের স্যার জীবনে কোন খানে এক লাখ টাকার কম অনুদান দেন নাই। কথা শোনা রইলো, পরের অংশে বাকিটা বলছি।

পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে বল্লেন তোমার খবর আছেঃ

একবার রংপুরের আক্কেলপুর ক্লাব কতৃক আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্ট এর ফাইনাল খেলা আক্কেলপুর মাঠে।বলে রাখি এখান থেকে এরশাদ সাহেবের নতুন বাড়ী পল্লীনিবাস ঠিক অল্প একটু দূর। সেই খেলায় একটা সুন্দর মন্চ করা হয়েছিলো সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন এরশাদ সাহেব।সাথে জি এম কাদের, রাঙ্গা, রব্বী সাহেব সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সেই খেলার ধারা বর্ণনা দেবার জন্য আমার বন্ধ বিপ্লব এবং ওর বড় ভাইরা আমাকে নিয়ে গেলো। এরশাদ সাহেব যখন বক্তব্য রাখবেন ঠিক তখন আমার মনে পড়েগেলো রাজশাহী টাউন হলে রাব্বী সাহেবের বক্তব্যের কথা। যথা মনে পড়া তথা প্রয়োগ। ঘোষনা কারছি, এখন বক্তব্য রাখবেন এবং খেলার শুভ উদ্বোধন করবেন রংপুরের কৃতি সন্তান সাবেক রাষ্টপতি পল্লীবন্ধু হোসাই মোহাম্মদ এরশাদ, তবে তাঁর বক্তের আগে উপস্থিত সূধী আপনাদের একটা তথ্য দিয়ে রাখি গত কয়েক মাস আগে রাজশাহী টাউন হলে এক অনুষ্ঠানে শুনেছি আমাদের প্রধান অতিথি তাঁর জীবনে কখনো এক লক্ষ টাকার কম কোন অনুদান দেননি। তো আজকে নিশ্চয় এই আক্কেলপুর ক্লাব এক লক্ষ তো অনুদান পাবেই নিশ্চয়ই আরও বেশি পেতে পারেন। তখন উপস্থিত দর্শক সারিতে করোতালি আর করোতালি, এরশাদ সাহেব ডায়াসে দাঁড়াবার সময় আমার পিঠে একটা আদর করে থাপ্পড় দিলেন আর বল্লেন “তোমার খবর আছে,আমি কি এখন প্রেসিডেন্ট আছি” এর পর বক্তব্যের শুরুতেই বল্লেন “উপস্থাপক যেভাবে বল্লো আর আপনারাও যেভাবে করোতালি দিলেন তাতে মনে হলো কিছু একটা না করলে ভোটতো সব ওর দিকেই চলে যাবে। আচ্ছা আমি তো এখন আর রাষ্ট্রপতি নেই তারপরও আমার ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে ৫০০০০/- টাকা আক্কেলপুর ক্লাব কে অনুদান ঘোষনা করছি।” সবাই হাতে তালি দিয়ে স্বাগত জানালো।বক্তব্য দিয়ে নামার সময় আমাকে বল্লেন তুমি তো দারুন উপস্থাপনা করো।

কারমাইকেল কলেজে ৯০ বছর পূর্তিতেঃ

সেবার কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ৯০ বছর পূর্তিতে গেছি রংপুর। মূল গেট ঢুকে একটু সামনে যেতেই দেখি এরশাদ সাহেব উপস্থিত। যথা রীতি কাছে গেলাম সালাম দিতেই বুকে জড়িয়ে নিলেন।কুশালাদি বিনিময়ের পর সবার সামনে বেশ মজা করেই আমাকে বল্লেন “আমার কলেজে তোমার কি? তুমি কেন এসেছ? ” আমি তো অবাক! একটু হেসেই বল্লেন কেমন হলো অভিনয়টা। সেই অনুষ্ঠানের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন উনি। আমরা দেখেছি সারাদিন তো ছিলেনই রাত ১২ টা পর্যন্ত উনি উপস্থিত থেকে সব তদারকি করেছেন একজন অভিভাবকের মতো।

এরকম বেশ স্মৃতি ছিলো আমার তাঁর সাথে। তবে ব্যক্তি জীবনে অন্য এক মানুষ ছিলেন। দোষ গুনে মানুষ। অনেক ভুল থাকলেও কিছু ভালো গুন ও ছিলো, ভালো কাজ ও ছিলো। মহান আল্লাহতায়ালা সব ভালো জানেন।আমি তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।আমিন।

 

 

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, আমার মা ফাউন্ডেশন। 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আরাফিন আকাশের ‘অভিমানী তুমি’

স্টাফ রিপোর্টার :: নতুন গানের মিউজিক ভিডিও নিয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হচ্ছেন ...