এক জেলাতেই সাড়ে তিন’শ কোটি টাকার সুপারির ফলন !

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: উপকূলীয় অঞ্চল লক্ষ্মীপুরের ‘লক্ষ্মী’ হিসেবে পরিচিত অর্থকরী ফসল সুপারির এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া সুপারি উৎপাদনে উপযোগী। এ জনপদের এমন কোনো বাড়ি নেই যে বাড়িতে সুপারি গাছ নেই।

এ ছাড়াও বিশাল-বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে সুপারি বাগান। সুপারির বাগান করে উৎপাদন করা হচ্ছে শত-শত কোটি টাকার সুপারি। অর্থকরী এ ফসলকে ঘিরে এ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। উৎপাদিত এ ফসলের বাজার দর ভালো থাকায় সুপারি চাষে আগ্রহ বাড়ছে এখানকার মানুষের।

জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আবুল হোসেন জানান, লক্ষ্মীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে ৬ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে। আর এসব বাগানে এ বছর উৎপাদিত হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ টন সুপারি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ৩ হাজার ৩২৮ টন, রায়পুর উপজেলায় ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ৭ হাজার ৪০০ টন, রামগঞ্জ উপজেলায় ৮৯০ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৩৩১ টন, কমলনগরে ২৬৫ হেক্টর জমিতে ৩৭১ টন ও রামগতি উপজেলায় ৪০ হেক্টর জমিতে ৭০ টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছে। ফলে এ মৌসুমে উৎপাদিত সুপারির বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে তিন’শ কোটি টাকা হবে বলে ধারনা করছেন সংশ্ল্লিষ্টরা।

এ বছর মৌসুমের শুরুতেই সুপারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন হাট-বাজারে সুপারি ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। স’ানীয় বাজারে সুপারির চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় চাষেও আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

সংশ্ল্লিষ্টরা জানান, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সুপারী গাছে ফুল আসে। পরে এ ফুল থেকে সৃষ্ট সুপারী পুরোপুরি পাকে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে। মূলত কার্তিক মাস আর অগ্রহায়ণ মাসেই সুপারীর ভরা মৌসুম। তবে এবার সময়ের আগে বাজারে এসেছে সুপারি। আশ্বিন মাসের শেষের দিকে বাজারে আসতে শুরু করে সুপারি।

এখন জেলার প্রতিটি বাজারেই প্রচুর পরিমাণে সুপারি আসতে দেখা গেছে। এখানকার সুপারির প্রায় ৭০ ভাগ নদীনালা, খালডোবা, পুকুর ও পানিভর্তি পাকা হাউজে ভিজিয়ে রাখেন স’ানীয় ব্যবসায়ীরা। আর ৩০ ভাগ সুপারি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ ছাড়াও রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এ বছর কাঁচা-পাকা সুপারির ভালো দাম পেয়ে খুশি চাষী, গৃহস্থ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। লক্ষ্মীপুরে সুপারির প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র না থাকায় অনেক সময় কৃষকরা সুপারির ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।

জানা যায়, সুপারী গাছ একবার রোপণ করলে তেমন কোনো পরিচর্যা ছাড়াই টানা ৩৫-৪০ বছর ফলন দেয়। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশী আয় করা যায়। সুপারি বাগানে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কিংবা রোগ-বালাই কম থাকায় এ অঞ্চলের কৃষকরা সুপারি চাষের দিকে বেশী ঝুঁকেছেন। এ বছর মৌসুমের শুরুতেই সুপারি বিক্রির প্রধান মোকাম সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর শহর, দালাল বাজার, চর রুহিতা, ভবানীগঞ্জ, মান্দারী, দত্তপাড়া, জকসিন, চন্দ্রগঞ্জ, রায়পুর উপজেলা শহর, হায়দরগঞ্জ বাজার, সোনাপুর, দেনায়েতপুর, খাসেরহাট, মোল্ল্লারহাট, রামগঞ্জ উপজেলা শহর, কাঞ্চনপুর বাজার, করপাড়া বাজারসহ জেলার প্রতিটি বাজারে সুপারীকে ঘিরে চলছে জমজমাট ব্যবসা। এখানকার প্রতিটি বাগানে সুপারি পেকে হলুদের মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে। বাগানে-বাগানে এখন পাকা সুপারির হলুদ রঙয়ের সমারোহ, মাইলের পর মাইল পাকা সুপারির হলুদ রঙয়ে চেয়ে গেছে। তাঁতে হাঁসি ফুটেছে সুপারির বাগান মালিকদের মুখে। গাছ থেকে সুপারি সংগ্রহ, ভিজিয়ে রাখা এবং বাজারজাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন সুপারি চাষীরা।

কয়েকজন সুপারি চাষী জানান, সুপারি গাছের পরিচর্যা ও রক্ষণা-বেক্ষণে স্থানীয় কৃষি অফিসের সহযোগিতা এবং তদারকির কারণে গাছে রোগ-বালাই কম ও ফলন বেশি হয়েছে। গাছ রোপণ ও সুষ্ঠু রক্ষণা-বেক্ষণে কৃষি বিভাগের আন্তরিক প্রচেষ্টার কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নে লক্ষ্মীপুরে এ অর্থকরী ফসল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে বলেও জানান তারা ।

স্থানীয় কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা নিজেদের চাহিদামতো সুপারি স’ানীয় পাইকারদের কাছ থেকে সংগ্রহ করছেন। এ বছর প্রতি পোন সুপারি (৮০টি) মাণভেদে ৯০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, প্রতি কাউন (১২৮০টি) সুপারি ১৫০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

লক্ষ্মীপুর জেলা সুপারি ব্যবসায়ী ও বাগান মালিক এসোসিয়েসান এর সভাপতি মো করিম খান ও সাধারন সম্পাদক ফয়েজ আহম্মদ জানান, সারা দেশে সুপারি ভিজিয়ে প্রক্রিয়া করনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন জামেলা হয় না। কিন্তু আমাদের লক্ষ্মীপুরের প্রশাসনকে কিছু অসাধু লোক ভূল বুঝিয়ে আমাদের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট করে হয়রানী করা হয়। আমরা এই ধরনের হযরানীর হাত থেকে রেহাই পেতে চাই। তাহলে বাগান মালিকরা সুপারির আরো ভালো দাম পাবে। এ অঞ্চল সুপারি কেন্দ্রীক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করবে।

লক্ষ্মীপুর কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. বেলাল হোসেন খান বলেন, এখানকার মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। সুপারি বাগান করার মধ্য দিয়ে এখানকার কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। সঠিক সময়ে সুপারি চাষীরা সঠিক পরিচর্যার কারনে এবার এ জেলায় সুপারির বাম্পার ফলন হয়েছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার কাঁচা-পাকা সুপারির দাম কিছুটা বেশি। এতে ভালো দাম পেয়ে খুশি চাষীরা।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

১২ নভেম্বরের স্বজন হারানোর কান্না আজও থামেনি

শিপু ফরাজী,চরফ্যাশন প্রতিনিধি :: ভয়াল ১২ নভেম্বর। ১৯৭০ সনের এই দিনে পৃথিবীর ...