ব্রেকিং নিউজ

‘এই দিনতো দিন নয়’

একেএম জসীম উদ্দিন

একেএম জসীম উদ্দিন :: ইফ যদি ইজ হয় বাট কিন্তু হোয়াট কি আন্ডার নীচে হ্যাজ আছে চাবি ইংরেজী কী? ছোটকালে এ প্রশ্ন করে অনেককে ভড়কে দেয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্ত আজ কিছুদিন নিজেই ভড়কে আছি। করোনা নামের এক অতি ক্ষুদ্র ভাইরাস আমাদের জনজীবন থমকে দিয়েছে। সবাই এখন স্বেচ্ছা ঘরবন্দি হয়ে স্বশ্রম কারাদন্ড ভুগছে। যা না হওয়ার তাই হচ্ছে সব। মাস কয়েক আগে আমাদের চোখ ছিল খবরের পাতায়, চোর পুলিশ আর সাপ লুডু খেলায়। একে একে আমরা দেখলাম, জিকে শামীম- খালেদ গংদের বাহারি কায় কারবার, ক্যাসিনোর রোশনাই, রাজপ্রাসাদে সম্রাট এর ঝকমারি, ভোল্টভরা সোনার ঝকঝকানি, সংগী সাথীসহ সুরে সুরে পাপিয়ার জলকেলি।

অভিযান, গ্রেফতার, কেস কাছারী আরও কত কি? ভাবলাম দেশ বুঝি এবার আলোর দিশা পেল, কিন্তু কোথায় কি? কোথাকার এক “করোনা” সারা বিশ^কে নাস্তানাবুদ করে এখন চেপে ধরেছে আমাদেরও, এ ‘বলা’ দেখাও যায় না, কার মধ্যে যে আছে তাও বুঝা যায়না। প্রত্যেকদিনই সংক্রমন আর মৃত্যুর খবর বোকাবাক্সে দেখি আর বোকার মত তাকিয়ে থাকি, ভয়ে কুঁকড়ে যাই এই বুঝি এলেন তিনি আমারও দ্বারে। শুরুতে দেশব্যাপী দারুন কড়াকড়ি থাকলেও সংক্রমন বাড়ার সাথে সাথে কড়াকড়ি উধাও, তাই আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছিনা। কাজলের কৌতুকের মত অবস্থা “নাইত পাইত কি খাইত দিল সাইন কত্তি পারলাম না”। কেউ কেউ বলে করোনা মহামারি দিয়ে প্রকৃতি নাকি প্রতিশোধ নিচ্ছে।

প্রকৃতিকে আমরা প্রচুর জালাতন করেছি, প্রতিবেশের ধার ধারিনি, পরিবেশের উপর যা ইচ্ছা অত্যাচার করেছি তাই প্রকৃতির এই আক্রমন। কেউ বলেন সৃষ্টিকর্তার দেয়া শাস্তি। কালে কালে মানব জাতির উল্টা পাল্টা কাজের জন্য অনেকবারই এই মহামারি এসেছে, মানুষকে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা কখনোই ঐসব শিক্ষা গ্রহণ করিনি, এবারও করবোনা। কারণ, ইতিহাসের বড় শিক্ষা, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। তবে তাই সই, করোনা থেকে নিব না কোনদীক্ষা, কাগজের পাতায় থাকুকনা তার শিক্ষা! করোনা ফিরে গেলে আমরাও ফিরে যাবো আগের চেহারায় ।

কয়েকদিন আগে টিভি চ্যানেলে দেখছিলাম কক্সবাজার সৈকতের কাছাকাছি সাগরের নীল জলে ডলফিন দাপাদাপি করে জল ছিটাচ্ছে, মনের খুশিতে খেলা করছে। কি সুন্দর দৃশ্য! আমি তো বহুবাব গিয়েছি এ সৈকতে কই কখনোতো দেখিনি এমন নীল জল, ডলফিন এ জলে আসে এটাওতো শুনিনি কোন কালে। প্রকৃতি কি হঠাৎ করে উদার হয়ে গেল? কি এমন পুণ্য করেছি যার জন্য উত্তাল সাগরের জলরাশি এত নির্মল, স্নিগ্ধ মনোমুগ্ধকর? ঘটনা আর কিছুই না ‘অতিশয় ক্ষুদ্র করোনা’, সারাবিশ্বের তথাকথিত মানবসম্প্রদায়কে ঘরে ঢুকিয়ে প্রকৃতিকে কিঞ্চিত স্বাধীনতা দিয়েছে। আর তাতেই প্রকৃতি হয়ে উঠেছে আরও সবুজ, সাগরের জল হয়েছে আরও স্বচ্ছ ও নীল, পাখীর কিচিরমিচির গেছে বেড়ে, পঙ্গপালও নাকি আসছে ধেয়ে সীমানা ছেড়ে।

ইতালী না কোথায় যেন এক প্রজাতির ঈগল বাসা বেঁধে ডিম পেড়েছে যে ঈগল ১৯৩৭ সালের পর আর দেখা যায়নি। ভেনিসের খালগুলির মাছ নাকি এখন খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। জানিনা ঢাকার আশে পাশের নদী বা ঝিলগুলোর চেহারা কিছুটা কি ফিরেছে? নাহ্ তা বোধহয় আর সম্ভব না, আমরা মানুষরা নিজেদের বাঁচাতে, নাহ্ বাঁচাতে নয়লালসা মিটাতে গিয়ে পরিবেশ ও প্রতিবেশের সব খেয়েছি, নদী খেয়েছি, খাল ভরেছি, বন উজাড় করেছি, পাহাড় কেটেছি, উদরপুর্তির আয়োজন করতে জমির প্রান খেয়েছি, সভ্যতায় গা এলাতে প্রানহীন শহর গড়েছি। তাইতো ঝিলের জল তেল চিটচিটে কালো, মানুষ নেই ভালো।

আমাদের ভাবটা এমন, আমরা মাটি খুঁড়ে পানি তুলবো, গ্যাস উঠাবো, তেল বের করবো নীচের পৃথিবী’র কি হলো তাতে আমাদের কি? আমরা যতখুশী ইঞ্জিন চালাবো, গ্রীন হাউসের বারোটা বাজাবো তাতে কারকি? আমরা নদী নালা খাল, বিল চাইকি নীল সমুদ্রও প্লাটিকে সয়লাব করে দেব, কার কি বলার আছে?কিন্তু আমার ভাবনা অন্য জায়গায়, যিনি আসমান জমিন, সাগর পাহাড়, মহাশূণ্যসহজাগতিক সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, মানুষ সহ সব জীব জানোয়ার কীট পতঙ্গকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, সেই মহা অধীশ্বরের ভাবনা কি? তিনিতো মানুষসহ প্রকৃতি, প্রতিবেশ ও পরিবেশ সব কিছুরই মালিক। আমরা মানুষরা তাকেও কি ভূলতে বসেছি? যদি তিনি শিক্ষা দিতেই চান দোষেরতো কিছু হবে না। ছোটকালে বইতে পড়েছিলাম জীব আর অজীব এ দু’ধরনের উপাদান নিয়ে পৃথিবী গঠিত, সাথে রয়েছে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন উপাদান। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় অণুষঙ্গের সমন্বয়েই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের এ সুন্দর পরিবেশ। একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের জন্য অজীব ও জীব প্রতিটি উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ভারসাম্যই নাকি আজকে কঠিন ঝুঁকির মধ্যে।

বিশেষজ্ঞ ব্যাক্তিরা বলেন, কাংখিত ভারসাম্য না থাকার কারনেই নাকি জীববৈচিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, জলবায়ুর চরিত্র বদলে যাচ্ছে, পৃথিবী গরম হয়ে যাচ্ছে, সমুদ্র উচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘন ঘন বন্যা হবে, ঝড় জলোচ্ছাস হবে, সাগরের কাছাকাছি এলাকা পানির নীচে তলিয়ে যাবে, ফসলের ক্ষেতে লবন ঢুকবে, ভুমিকম্প, বেশী বেশী টর্নেডো ও নদীভাঙ্গন হবে। আমি সাধারণ মানুষ এত কঠিন কথা বুঝিনা, কিন্তু গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম শহরের অবস্থা যা দেখছি তাতে পরিবর্তন বুঝতে আর বাকী নেই। চট্টগ্রাম শহরের উঁচু এলাকা বাদ দিলে আর সব এলাকায় বাসা বাড়ীর গ্রাউন্ড ফ্লোর এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। পাড়ার রাস্তাগুলো উচু হতে হতে এ অবস্থা, আগ্রাবাদ এর কিছু এলাকায়তো শুনি জোয়ারভাটা হিসেব করে চলতে হয়।

দেশে এখন বড় বড় কাজ হচ্ছে, পদ্মা সেতু হচ্ছে, উড়াল সেতু’য় ঢাকা ছেয়ে যাচ্ছে, মেট্রোরেল এঁেকবেঁকে পথ খুঁজে নিচ্ছে, কর্ণফূলির নীচে ট্যানেল হচ্ছে। এসব দেখে বুকটা ফুলে উঠে, আমাদের দেশটাও খুব তাড়াতাড়ি ছবিতে দেখা অন্যান্য দেশের মত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা মানুষরাতো ঠিক হচ্ছি না! কর্ণফুলি ট্যানেলের কাজে নিয়োজিত এক ইঞ্জিনিয়ার এর সাথে কথা হচ্ছিল কিছুদিন আগে, জিজ্ঞেস করেছিলাম ট্যানেল এর খবর কি? বলছিলো পলিথিন খুড়তে খুড়তেইতো জান কাবাব হয়ে যাচ্ছে, মূল কাজ আর কি আগাবে? এবার বুঝলেনতো ঘটনা কি, আমাদের বাসা বাড়ীর আবর্জনাসহ শহরের তামাম পলিথিনের প্যাকেট, চিপস্-বিস্কুটের বাহারি মোড়ক সবার গন্তব্য ঐ কর্ণফুলি। সুতরাং অভাগিনির দু;খের কথা কেউ শুনে না। পরিচ্ছন্নতার নীতি কেউ মানেনা সুতরাং যা হবার তাই হচ্ছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাগরিক জীবনে পানি ঢুকে যাচ্ছে।

কক্সবাজারে সাগর জলে ডলফিন এর নাচানাচি দেখে যতনা খুশী হয়েছি তার চেয়ে বেশী ব্যাথিত হয়েছি ফেসবুকে বানরের লাশের সাড়ি দেখে। করোনা কালেই ঘটেছে এ ঘটনা। আমারই মত দু’পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা কোন মানুষ বিষ দিয়ে তাদের এ হাল করেছে। আমরা মানুষরাতো অঘটন ঘটন পটিয়সী! যারা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তাদের মানুষ বলা কি ঠিক হলো? যাগগে আমি ছাপেষা মানুষ, কে মানুষ কে মানুষ নয় এ বিচার করার আমি কেউ নই। কিন্তু যা ঘটলো তার ব্যাখ্যা কী। আমরা তথাকথিত মানুষরা যারা সৃষ্টির সেরা জীব বলে নিজেদের দাবী করি তাদের এ হেন আচরণের কারণ কী? আমরা কি ভাবতে বসেছি যে, এই পৃথিবী শুধুই আমাদের, আর সব আমাদের পদানত। আমরা যেভাবে ভাববো সেভাবেই হবে সবকিছু। মানুষ ছাড়া পৃথিবীতে আর যা কিছু আছে তারাওতো এ পৃথিবীরই অংশীদার। সারভাইবেলিটি অফদি ফিটেস্ট বলে বলে ন্যায় অন্যায় না ভেবে তাদের উপর আমরাকি কেবল অত্যাচারই করে যাবো?

জানি, এমনটা হয়তো কোনদিনই হবেনা, তারপরও তর্কের খাতিরে যদি বলি, তারা মানে প্রকৃতি ও প্রতিবেশ যদি কোন দিনবিট্রে করে তাহলে কি হবে? সূর্যদেব যদি বলে আমি তাপ দিয়ে সব পুড়িয়ে দেব, মাটি যদি বলে আমি আর ফসল ফলাবো না, বৃক্ষরাজি যদি বলে আমি আর অক্সিজেন ছাড়বো না, পশুপাখী যদি বলে আমি আর বনে জংগলে থাকবো না, মেঘ যদি বলে আমি আর বৃষ্টি হয়ে ঝরবো না, পাহাড় যদি বলে আমি আর খুঁটি হয়ে থাকবো না, পর্বত যদি বলে আমি আর দাড়িয়ে থাকবো না। তাহলে আমাদের দশা কি হবে? ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনা, চোখে দেখা যায় না তার আক্রমনেই আমরা দিশাহারা।

সুতরাং এই দিনতো দিন নয় আরও দিন আছে! মানুষের একলা চলোর এ নীতি ছাড়তে হবে। ভাবতে হবে প্রকৃতি ও প্রতিবেশ আমার ঘর আমার দেশ। নিজের পাশাপাশি প্রকৃতি ও প্রতিবেশেরও যত্ন নিতে হবে। তাহলে পৃথিবী টিকে থাকবে আমরাও টিকে থাকবে, টিকে থাকবে আমাদের অতি প্রিয় প্রজন্ম। ভালো কাজ শুরু করার জন্য প্রত্যেকদিনই শুভদিন। তাই শুক্র মঙ্গলের অপক্ষো না করে আসুন, আজ থেকেই প্রকৃতির যত্নে নেমে পড়ি।

 

 

 

লেখক: উন্নয়ন কর্মী, পরিচালক এডাব। [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষ্যে “আওয়ার রোড টু ফ্রিডম”

স্টাফ রিপোর্টার :: হেরিটেজ ট্রাভেলার এলিজা বিনতে এলাহি নির্মাণ করেছেন ট্রাভেল ডকুমেন্টরি ...