উপকূলের পথে পথে ‘স্বপ্ন নিয়ে’

আরিফ চৌধুরী শুভ :: স্বপ্ন দেখতে কে না ভালোবাসে? মানুষের স্বপ্ন বিচিত্র। কারো স্বপ্ন নিজের জন্যে আবার কারো স্বপ্ন পরের জন্যে। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। কেউ স্বপ্ন দেখে অন্যের মুখে কিভাবে হাসি ফোটানো যায়। কেউ স্বপ্ন দেখেন আমাদের চারপাশের পরিবেশটাকে কিভাবে সুন্দর করা যায় বেঁচে থাকার জন্যে। হয়তো এমন পরিকল্পনা থেকেই সংগঠনটির নাম রাখা হয়েছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ১৩ অক্টোবর (২০১৭) বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সংগঠনের উদ্বোধন করেন। ‌‘মানবতার কল্যাণে’ শ্লোগানে নানা উদ্যোগ ও সামাজিক কাজ নিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার উপকূলীয় রামগতি উপজেলার পথে পথে এখন দেখা মেলে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সংগঠন। সংগঠনের নামের সার্থকতাই তার সামাজিক কাজের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রমাণীত।

যেভাবে শুরু হয়েছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’র পথচলা…

গত বছর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রামগতির প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল প্রফেসর এ.টি.এম আইব মডেল স্কুল ও লম্বাখালী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা কলাগাছ দিয়েই শহীদ মিনার বানিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের দৃশ্য প্রথম চোখে পড়ে সংগঠনটির সদস্যদের। ফেসবুকে কলাগাছের তৈরি সেই শহীদ মিনারের ছবি দেখে শিক্ষার্থীদের আক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করেন সংগঠনের সভাপতি আ হ ম ফয়সল। বন্ধুরাও সাড়া দেন ফয়সলের প্রস্তাবে। চার বন্ধু নিয়ে গড়ে তোলেন ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সংগঠন। নিজেদের উদ্যোগেই শিক্ষার্থীদের বানিয়ে দেন কংক্রিটের একটি শহীদ মিনার।

গত একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঐ সকুলের স্কুলে শিক্ষার্থীরা প্রথম কংক্রিটের শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ভাষা শহীদদের। ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সংগঠনের পক্ষ থেকেও নতুন শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকা থেকে ছুটে যান সভাপতি আ হ ম ফয়সল, সাধারণ সম্পাদক মীর তানভীর আহমেদ, সদস্য সচিব ও প্রধান সমন্বয়ক আশরাফুল আলম হান্নান, আইটি সমন্বয়ক পারভেজ অনিক। শহীদ মিনার পেয়ে শিক্ষার্থিদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক জুড়ে।

সেই পথচলাই শুরু চলছে এখনো। একটু সহানুভূতি ও একটু ভালোবাসা নিয়েই বিভিন্ন সময় উপকূলের অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায় এই সংগঠনের সদস্যরা। গত রমজানের ঈদে ঈদ সামগ্রী, দারিদ্র শিক্ষার্থী, পথশিশু ও নদীভাঙ্গা মানুষের মাঝে ঈদের পোষাক বিতরণ করেছে সংগঠনটি।

রামগতি উপজেলার চর আলগী ইউনিয়নের চর নেয়ামত গ্রামের হতদরিদ্র ঘরের প্রতিবন্ধী ও  আলেকজান্ডার আলীয়া মাদ্রাসার ফাজিল (ডিগ্রী) শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহিনুর বেগম মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারান গত চার মাস আগে। ‘স্বপ্ন নিয়ে’ প্লাটফর্ম শাহিনুর বেগমের একটি কৃত্রিম পা সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে।

উপকূলের পরিবেশ দূষণ রোধ করতে আলেকজান্ডার ও রামগতি বাজারের মেঘনার তীরে বিভিন্ন স্থানে ময়লার বক্স বসিয়েছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ঈদের ছুটিতে নদীর তীরে ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের বক্সে ময়লা ফেলতে উদ্ধুদ্ধ করাসহ ময়লা পরিষ্কারের জন্য শ্রমিক নিয়োজিত করে তারা। সচেতনাতায় প্লেকার্ডগুলোও সবার নজর কাড়ে।

রোদ বৃষ্টি ঝড় উপকূলের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন সঙ্গি। উপকূলের শিক্ষার্থীদের এই কষ্ট কিছুটা দূর করতে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ ছাতা। গত ২৫ আগস্ট লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বড়খেরী ইউনিয়নের রামগতি আছিয়া বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী হাতে পেল এই ছাতা। ছাতা পেয়ে আনন্দিত অনেক শিক্ষার্থীই খুশি হয়ে বলেন, আমাদের জন্যে খুবই উপকার হলো এই ছাতা। অনেক দূর থেকে আসি আমরা। আজ থেকে আমাদের আর বৃষ্টি ভেজাতে পারবে না। রোদেও পুড়তে পারবে না।

সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাটি যেন দিনকে দিন আরো বেশি অনুভব হতে লাগলো এই সংগঠনের সদস্যদের কাছে। কিন্তু অন্যরাও কি এভাবে চিন্তা করেন? রোদ বৃষ্টি ঝড় থেকে শুধু শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করেননি তারা, গত ২৬ আগস্ট রামগতির রিক্সা চালকদেরও দেওয়া হয়েছে একটি করে রেইনকোর্ট। রেইনকোর্ট পেয়ে রিক্সাচালকদের  হাসিমুখগুলোই বলে দিচ্ছে তাদের মনের ভাষা। অনেকেই আপ্লুত এই অল্পতেই। খুবই স্বল্প প্রাপ্তি তবুও এমন উল্লাসিত চিরচেনা হাসি খুব সহজেই দেখা যায় না খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোর মুখে। যে হাসি লুকিয়ে থাকে অন্তরের গহীনে, সে হাসি এক বারের জন্যে হলেও বের করে আনতে পেরেছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। আপাতত তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে নিজেদের ঈদকে স্বার্থক মনে করছেন ‘স্বপ্ন নিয়ে’।

পারিবাকি, সামাজিক, ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা ব্যস্ততার পাশাপাশি সমাজের এই মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবার সময় কিভাবে পান সেই বিষয়ে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ সংগঠনের সভাপতি আ.হ.ম ফয়সলের সরল অভিব্যক্তি, আমাদের কাজ সমাজের জন্যে। আমাদের দায়বদ্ধতাও সমাজের জন্যে। কারন আমরা এ সমাজেরই মানুষ। এই সকল মানুষগুলোকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্যে কে কি করবে বা করছে সেটি আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়, কিন্তু আমরা চেষ্টা করি কিভাবে সমাজের অবহেলিত মানুষগুলোকে সন্তুষ্টিত করা যায়। তাদের মুখে হাসি ফোটানো যায়। আমাদের কাজকে আরো বেশি এগিয়ে নিতে আমরা সবার সহযোগিতা চাই। আমাদের আরো বেশি আর্থিক সহযোগিতা দরকার। আরো বেশি সেচ্চাসেবী দরকার।

একদিন এই সমাজের চিত্র বদলাবে। বদলাবে প্রতিটি মানুষের জীবন চিত্র। বদলাবে বাংলাদেশ। সমাজ তখনই এগিয়ে যাবে যদি সমাজের মানুষগুলো এগিয়ে যায় নিজ থেকে। এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেয় পবিত্র মনে এবং কাজ করে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে। আপাতত উপকূলের মানুষগুলোকে বিভিন্নভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় অব্যাহত ‘স্বপ্ন নিয়ে’। ভাঙ্গা গড়ার উপলকূলের জীবনে পথে পথে আজ যে ‘স্বপ্ন নিয়ে’। এই ‘স্বপ্ন নিয়ে’ হয়তো একদিন এগিয়ে যাবে  বাংলাদেশ।

 

 

 

লেখক: উদ্যোক্তা ও অন্যতম সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন। প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন (জাপাআ)।শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (মাস্টার্স), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

পায়রা বন্দর নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সচিব

স্টাফ রিপোর্টার :: নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী রবিবার (২৫ ...