ব্রেকিং নিউজ

উচ্চ শিক্ষা করমুক্ত হলো, কিন্তু শিক্ষা বাণিজ্য কি বন্ধ হলো?

আরিফ চৌধুরী শুভ :: ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রথম কনসল নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ওয়াটারলুর যুদ্ধে পরাজিত হন শুধু মাত্র শিক্ষিত ও দক্ষ প্রতিপক্ষ সেনা সদস্যদের রণকৌশলের কারণে। এ আপসোস তাকে আমৃত্যু করতে হয়েছে। পরাজয়ের নামতা গুণতে গুণতে একসময় সিদ্ধান্ত পাল্টালেন বোনাপার্ট। বিশ্বসামরাজ্যে নিজেকে পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য বোনাপার্টের সামনে তখন একটি মাত্র পথই খোলা ছিল। আর সেটি হল যুদ্ধ জয়ের জন্য শিক্ষা-দিক্ষায় উন্নত রণকৌশল সম্পন্ন একটি বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলা। সেই উদ্দেশ্য থেকেই নেপোলিয়ন ওয়াটারলুর যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রজাদের সামনে প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন, ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি শিক্ষিত জাতি দিবো’।

শিক্ষা যে একটি জাতিকে অমূলক পরিবর্তন এনে দিতে পারে এবং সুযোগ করে দিতে পারে বিশ্ব নেতৃত্বের, তা ঠিকই বুঝেছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। বিশেষ বিল পাশ করে শিক্ষাকে ফ্রি ও বাধ্যতামূলক করেছিলেন তার দেশের নাগরিকদের জন্য। সামরিক খাতের চেয়ে শিক্ষাখাতেও বরাদ্ধ বাড়িয়েছেন অন্তত ১০ গুণ। মুসলিম শাসকদের মধ্যে ফিরোজ শাহ তুঘলক (১৩৫১-৮৮) তার রাজকোষ থেকে শিক্ষাখাতে ১ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। মুসলিম শাসকরা বিদ্যা অর্জনকে নিজেদের জন্মগত অধিকার মনে করতেন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের বিরাট অংশ এতে ব্যায় করতেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দিতে এসে এখনকার শিক্ষিত শাসকেরা হাঁটছেন তার ঠিক উল্টোপথে। শুধুমাত্র রাজস্ব ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষার বাণিজ্যকরণের মহাউৎসবকে বৈধতা দিতে শিক্ষার উপর কর বসানো হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের সংবিধানে শিক্ষা প্রতিটি নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে বলা আছে। সরকার একদিকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার কথা বলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করছেন, অন্যদিকে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষার বাণিজ্যকরণের বৈধতা দিতেই শিক্ষার উপর কর বসিয়েছেন ২০১০ ও ২০১৫ সালে।

কর দিয়ে উচ্চ শিক্ষা নেয়াতে যে কোন আনন্দ নেই এবং তা নৈতিকতা বর্হিভূত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা তা ঠিকই বুজেছেন, কিন্তু রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের নিউরণে সেটি ঢুকেনি। উচ্চ শিক্ষার সহজলভ্যতা না করে, বরাদ্ধ বাড়িয়ে গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি না করে বরং বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে চিন্তা করেছেন সরকার। কার সন্তান কত দামি স্কুলে কত বেশি বেতনে পড়াশুনা করছে, তাই গর্বের বিষয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। এমন অহেতুক গর্ব যারা করেন, কেবল তারাই শিক্ষা করের সমর্থক ছিলেন। শিক্ষার বাণিজ্যিকরণে তারা এখনো মদদ দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে লাভের অংকের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নওয়াব আবদুল লতিফ কিংবা হাজী মোহাম্মদ মহসিন যদি এ যুগে বেঁচে থাকতেন, শিক্ষা করের প্রতিবাদে তারাও কি চুপ থাকতে পারতেন? ২০১৫ সালের বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষায় কর বসানোর প্রতিবাদে চুপ থাকেননি। নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে কর ঠেকিয়ে দিয়েছেন। এ আন্দোলন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের রক্তে রাজপথ লাল হয়েছে। মার খেতে হয়েছে, গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, পালিয়ে থাকতে হয়েছে, উপবাস থাকতে হয়েছে। পুলিশের গুলিতে আহত শিক্ষার্থীদের উদ্ধারে এগিয়ে আসা শিক্ষকরাও বুলেটবিদ্ধ হয়েছেন রাজপথে। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগটি পর্যন্ত ছিল না শিক্ষার্থীদের। আন্দোলন থামাতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়।

একদিকে মারমুখি পুলিশ ও সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠন, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সমর্থন সরকরকে; উভয় সংকটে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের বিকল্প কিছু চিন্তা করেনি। যে প্রজন্ম ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯ কিংবা ৭১ দেখেনি, সে প্রজন্ম দেখেছে ২০১৫। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রাজপথের চিত্রই সরকারের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য করেছে তখন। কর না তোলা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়েনি। এমন শিক্ষার্থী সমাজকে নিয়ে আমরা নি:সন্দেহে গর্ব করতে পারি। স্বপ্ন দেখতে পারি সেই বাংলাদেশকে নিয়ে যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র ও নিরক্ষরমুক্ত শতভাগ ফ্রি শিক্ষার সুযোগ থাকবে। শিক্ষা হবে আনন্দের। শিক্ষা হবে উৎকর্ষের এবং সর্বজনের।

অহিংস, সুস্থ ও সংস্কৃত ধারার যে আন্দোলন করেছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী, তাতে সরকারকে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে ভাবতে পজিটিভ বার্তা দিয়েছে। রাজপথই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে পরিণত হয়েছে। অর্পিত কর তুলে না নিলে শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছেড়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাবে না বলে যে প্রতিজ্ঞা করেছে, তাতে ভীষণ বিপদে পড়ে গেছেন সরকার। তারা ফিরেও যায়নি ক্লাসে। সরকার যত কঠোর হয়েছে, শিক্ষার্থীদের স্লোগানের ভাষাটাও পাল্টে গেছে ঠিক ততটা কঠিন ভাবে। যে মুখে উচ্চারিত হয়েছে ‘ভ্যাট দেব না গুলি কর, শিক্ষা আমার অধিকার’ সে মুখেই লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হলো ‘এই মুহুর্তে খবর এলো, ভ্যাটমুক্ত শিক্ষা হলো’।

বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা করমুক্তের আজ ৫ বছর হলো। ১৪ সেপ্টেম্বর সেই খুশির দিন। আমি আনন্দিত এমন একটি শিক্ষা আন্দোলনের উদ্যোক্তা হতে পেরে। ২০১৫ সালের ১৪ মে ‘উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাটের ইঙ্গিত’ শিরোণামে গণমাধ্যমে প্রথম চিঠি পাঠিয়ে ছিলাম আমি। সেই চিঠিতে আক্ষেপ করে লিখেছিলাম আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে শুধুমাত্র ভ্যাটের কারণেই। গণমাধ্যমের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে আমার সেই চিঠি। শিক্ষায় কর নিয়ে সব মহলে হৈচৈ পড়ে গেল। শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু করলাম ভ্যাট প্রত্যাহারের আন্দোলন।

উচ্চ শিক্ষা থেকে ভ্যাট তুলে নিতে টানা ৪ মাস রাজপথে অহিংস আন্দোলন করে গেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের লাখ লাখ শিক্ষার্থী। ১৪ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১ টায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর তুলে নেন। ২০১৫ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী তখন সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থী এই করের বোঝা থেকে রক্ষা পেয়েছে। পুরো জাতি পেল করহীন একটি উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা আর আমরা আন্দোলনকারীরা পেলাম আত্মতৃপ্তী। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে ১৪ সেপ্টেম্বর বিশেষ দিন। করমুক্ত শিক্ষার দিন। ১৪ সেপ্টেম্বরকে সরকার যেন ‘ভ্যাটমুক্ত শিক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন, সেজন্য সরকারকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানাচ্ছি আমি।

বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় কর বসিয়ে সরকার যেমন নিন্দিত হয়েছেন, তেমনি কর প্রত্যাহারের মাধ্যমে নন্দিত হয়েছেন সমহলে। সেদিনের সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আজ আরেকবার বিশেষ ধন্যবাদ দিচ্ছি আমি। অভিনন্দন জানাচ্ছি আন্দোলনে বিজয়ী সেদিনের শিক্ষার্থী সমাজকেও।

‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ শুধু কি কর তুলে নেয়ার আন্দোলনই ছিল? উচ্চ শিক্ষার সামগ্রিক যে স্বার্থকতা সেটি কতটুকু অর্জিত হয়েছে এই ৫ বছরে। অথচ শিক্ষা স্বাধীনতার অধিকার। আমৃত্যু লড়ে যেতে হবে এই অধিকার আদায়ে। শিক্ষার অধিকার আমাদের সংবিধান স্বীকৃত জন্মগত অধিকার হলেও বাস্তবতা পুরাই ভিন্ন। প্রায় অর্ধশত বছরের বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত একটি স্থিতিশীল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রসরমানতা অর্জন করতে পারেনি। আর এর মূলে রয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম দৈন্যতা ও সরকারের উদাসিনতা। এদেশের মানুষ পাকিস্তানের প্রদেশ হিসেবে ২৪ বছর এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে ৪৯ বছর অতিক্রম করলেও জনশক্তি ও নেতৃত্ব তৈরির উপযোগী একটি শিক্ষা ব্যবস্থাই গড়ে তুলতে পারেনি এখনো।

তবে ব্যাপক হারে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পার্থক্য তৈরি হয়েছে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের পর ২০১৪ সালের আগ পর্যন্ত শিক্ষার বহুমুখী বাণিজ্যকরণের প্রতিবাদে বড় ধরণের কোন আন্দোলন গড়ে উঠেনি। এ কারণে মানুষ ধরেই নিয়েছে শিক্ষার বাণিজ্যকরণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এটি চলতেই থাকবে। এই সুযোগটিই নিয়েছে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারও সুযোগটিই নিতে চেয়েছেন অন্তত ২ বার। কিন্তু দুর্বার ছাত্র আন্দোলনের তোপের মুখে পিছু হাঁটতে হয়েছে সরকারকে।

২০১৫ সালে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ৭.৫% ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন দেশের শিক্ষা অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্দোলন। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। আন্তজার্তিক গণমাধ্যমগুলোতে পৃথিবীর ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ শিক্ষা আন্দোলনের পরিচিতি পায় ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলন। এই আন্দোলন আগত-অনাগত সবার মনসতাত্বিক চিন্তার দ্বার খুলে দিয়েছে। অত্যন্ত বোবা সময়ে মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে। বাংলাদেশে যখন আন্দোলনের অর্থ মানেই রক্তপাত, জ্বালাও পোড়াও ভাংচুর ও প্রতিপক্ষের প্রাণনাশ, ঠিক সেই সময়ে সুস্থ ও সংস্কৃত ধারার প্রতিবাদী আন্দোলনের উদাহরণ সৃষ্টি করলো ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ আন্দোলন। এই উদাহরণ পরবর্তী সকল আন্দোলনের সূতিকাগার বলে আমি মনে করি।

আড়াই যুগেরও বেশি সময়ে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় বাণিজ্যিক দিকটা যে হারে গুরুত্ব পেয়েছে, ঠিক ততটাই পিছিয়েছে উচ্চ শিক্ষার মান। মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থায় হুমকির মুখে শিক্ষিত জনশক্তি। ফলে উচ্চ শিক্ষা বেকারত্ব সৃষ্টি করছে বিদ্যুৎ গতিতে। শিক্ষা কর ঠেকিয়ে আমরা সরকারের রাজস্ব বন্ধ করতে পেরেছি সত্য, কিন্তু শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ ঠেকাতে আমরা শতভাগ ব্যর্থ হয়েছি। তাই বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিনই বেড়ে চলছে। এই ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে আজ। শিক্ষাক্ষেত্রের বাণিজ্যিকরণ রোধে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই এবং সেটি দ্রুতই নিতে হবে।

 

 

লেখক: উদ্যোক্তা ও অন্যতম সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশান এবং শিক্ষার্থী (মার্স্টাস) আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান, জাতীয় পাঠাগার আন্দোলন। ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ভারেতের জন্য দু:খ হয়, আপসোস হয় আমাদের তরুণদের কথা ভেবেও!

আরিফ চৌধুরী শুভ :: গায়ের চামড়া কেটে যদি জুতো বানিয়ে দাও ভারতকে, ...