রুবিক্স কিউব

কাজী লাবণ্য

 

(১)

মরিচবাতীর আলোকচ্ছটায় বর্ণিল একটি বাড়ি। ফুলে ফুলে সজ্জিত ঘরে আমি বসে আছি একটি ফুলেল খাটের উপর। ফুলের গন্ধ আর সানাইয়ের সুরে বাতাস ভারী। বসে আছি বধূর সাজে। কিন্তু ভীষণ প্রসন্ন চিত্তে। নববধূরা মনে হয় এতটা প্রসন্নচিত্তে থাকে না। আমি আছি, কারণ আমি যার জন্য অপেক্ষা করছি সে আমার কোনরকম অপ্রসন্নতার কারন হতে পারেনা। আমার পেছনে একটি জানালা আবার সামনেও একটি। বাতাসে জানালার ভারি পর্দা দুলছে। আমি জানি দরোজার ওপাশে একজন দাঁড়িয়ে আছে, একটু পরেই যে প্রবেশ করবে। আমি তার শরীরে লাগানো সুগন্ধি নাকে পাচ্ছি…
কিন্তু, আচমকা জোড়ে বাতাস বইতে আরম্ভ করল, জানালার ভারী পর্দা ঝরা পাতার মত উড়তে লাগল। বাতাস আরো জোড়ে যেন ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিল। পর্দাগুলি আর কিছুতেই আটকে থাকতে চাইছে না। উড়ছে পতপত করে। একসময় আমার পরিধেয় সাজ পোষাক অলংকারাদি সব কিছু ঘুর্ণিহাওয়ার শিকার হয়ে পড়ল। অবস্থা এমন হল যেন আমিও উড়ে যাব। আমি স্থির বসে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, চেষ্টায় আমি পর্যুদস্ত হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু যার আসার কথা সে আসছে না। আমি অসহায় তাকিয়ে আছি দরজার দিকে। বাতাস আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে… আমি প্রাণপণ লড়ছি… বাতাস… লড়াই… বাতাস…সে…

উফ! বুঝতে সময় লাগল এটি স্বপ্ন, কী আজব স্বপ্ন! উঠে বাথরুমে গেলাম। সাধারণত ঘুম থেকে উঠে আমি বাথরুমে যাইনা। কারন আমাদের রুম থেকে বাথরুম কিছুটা দূরে। তাছাড়া একবার ঘুমালে আমি আর জাগিনা, একেবারে সকালে ক্লাশের টাইমে উঠে কোনরকমে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা ছাড়াই ক্লাশে চলে যাই। দুপুরে এসে একেবারে স্নান সেরে ডাইনিং এ গিয়ে ভাত খেয়ে নেই। বাথরুম থেকে ফিরে আমি চুপচাপ শুয়ে পড়লাম। এমন আজগুবি স্বপ্ন নিয়ে একটুও না ভেবে আবার ঘুমিয়ে পরলাম।

(২)
পরদিন থেকে ভার্সিটিতে ভ্যাকেশন শুরু হলে আমরা সবাই যে যার বাড়ি চলে গেলাম। ভার্সিটি ছুটি হলে আমি যতটা খুশি হই, রুমমেটরা ততটা না। কারন বাড়ি গেলে ওদের ফিয়াসের সাথে ওদের দেখা সাক্ষাত হয়না কাজেই ওদের মন বিষন্ন থাকে। ক্লাস বন্ধ আর হল খোলা থাকলে সেসময় ওরা হলেই থাকে। আমার ওসবের বালাই না থাকায় আমি যারপরনাই খুশি হই। তাছাড়া আরো সমস্যা আছে আমি ডাইনিঙের খাবার খেতে পারিনা, নিজের কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পারিনা, এসবের কারণে মাত্র একদিনের জন্য ছুটি হলেও আমি খুব খুশি হই এবং হল খোলা থাকলেও আমি বাড়ি দৌড়াই। অবশ্য আমার ঘনিষ্ট বন্ধু দেবযানী আমার সব কাজ করে দেয়। সকালের নাস্তার আয়োজন, রাতের মশারী টানানো এসব ওই করে। রাতে আমি বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ি,কিন্তু সকালে নিজেকে ঠিক মশারীর ভেতরেই সুরক্ষিত পাই, আর দেবযানীর প্রতি আমার বন্ধুত্ব আরো সুদৃঢ় হয়।সেসময় প্রত্যেক ছেলেমেয়েদের হাতে থাকত কথার যাদুকরের বই। আমরা বেড়ে উঠছিলাম জ্যোৎস্না দেখার চোখ নিয়ে, বৃষ্টি, কদমফুল, রবিঠাকুরের সঙ্গীত বুকে ধারন করে আর এসব আমরা পাচ্ছিলাম সেই মহান কারিগর হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে। বাড়ি এসেই একটা খারাপ খবর শুনলাম। মায়ের এক দুরসম্পর্কের দাদার ছেলে যে বিদেশে থাকত সেখানে সে আকস্মিক হার্ট এটাকে মারা গেছে। মায়ের দুরসম্পর্কের দাদার ছেলে কাজেই আমাদের বাড়িতে তেমন শোকের তাপ নেই। বাড়িতে ছুটি কাটাচ্ছি। অখন্ড অবসর। স্বভাবমত আমি স্বাস্থ্যবান ভল্যুমের বইয়ে মগ্ন। কিন্তু বইয়ের একটি অক্ষরও আমি পড়ছিনা, পড়তে পারছিনা। আমার ভেতরে কিসের হিসেব নিকেশ চলছে…  চলছে…
বিশাল বাড়ি আমাদের। যৌথ পরিবার। বাড়ির সদস্যের চেয়ে কাজের লোকের সংখ্যাই বেশি। বাড়ি গমগম করে আর আমি সকলের অগোচরে নিঃশব্দে এক বিচিত্র হিসেবের নামতা পড়ি।

আমি খুব সহজ সরল বা সোজাসাপটায় বলা চলে বোকা সোকা বইয়ের পোকা টাইপ একটি মেয়ে।আমাকে নিয়ে মায়ের কোন চিন্তা নেই। শান্ত লক্ষ্মী আর সব কথা মেনে নেয়া উদাসীন মেয়ে, তার উপর নজরে পড়ার মত সুন্দরী।আর আমার মা অসম্ভব বুদ্ধমতি প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন শরৎচন্দ্র, নীহাররঞ্জন, আশাপুর্ণা, গুলে খাওয়া মহিলা। জীবনে আমার কোনদিন ঘুমের সমস্যা হয়না, হলে থাকলে কিছুটা হলেও বাড়িতে তো প্রশ্নই উঠেনা। কিন্তু গতরাতে একদম ঘুমুতে পারিনি। সকালে যথারীতি মায়ের পবিত্রগ্রন্থ পাঠের সুরেলা সুর কানে এসেছে।

একটু পরে মা আমার কাছে এসে বিছানায় বসল, আমি মটকা মেরে পরে আছি। মা আমার গায়ে আলতো করে হাত রেখে ডাকল “বনু! মা ওঠ! ওঠতো”! কয়েকবার ডাকের পর আমি ভান ছেড়ে চোখ খুলে পরিপুর্ণ দৃষ্টিতে মার দিকে তাকালাম। মার চোখে মুখে আমি কি যেন খুঁজলাম কিন্তু সেখানে অপার মমতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলামনা। মা বলল- “চল মা, আমরা তোর মামা বাড়ি যাব। ওঠ, জলদি হাতমুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নে”।মনে হল তেজের সাথে ঝাপটা উত্তর দেই ‘যাব না’!

কিন্তু তা না বলে আমি উঠে রেডি হলাম। টেবিলে কেবল বসেইছি, নাস্তা খাইনি। আমি কদিন ধরেই খাবার কেবল নাড়ানাড়িই করছি, খাচ্ছিনা সেটা কি আর মায়ের নজরে আসেনি! নাকি মা খেয়াল করেনি! অন্য সময় হলে খাওয়া নিয়ে পীড়াপীড়ি বা গঞ্জনা শুনতে হত, কিন্তু আমার মা জানে কখন নিরব থাকতে হয়। তা ছাড়া মায়ের একরকম দূর সম্পর্কের দাদার পুত্রের ডেডবডি এসেছে যেতে হয় মা একাই যাবে, আমাকে টানছে কেন! কি জানি কোন বোধ থেকে আমার অভিজ্ঞ মা আমায় সাথে নিলেন!

সবুজ রঙের একটি জীপগাড়ি আর আমাদের বহুদিনের পুরনো ড্রাইভার বিকাশ কাকা। খুব ভাল মানুষ। আমার মায়ের তেজস্বী ও উদার প্রভাবে আমাদের চারপাশের মানুষগুলো সবাই খুব ভাল। অন্যসময় আমি মাকে ছুঁয়ে থাকি আজ মা আমায় ছুঁয়ে বসে আছে জীপ ছুটে যাচ্ছে মামা বাড়ি…

(৩)

সুদীপ্ত দাস দিপু। মায়ের দুরসম্পর্কের এক দাদার পুত্র। আমাদের সকলের দিপুদা। আমার নিজের তিন দাদার অসম্ভব প্রিয় দিপুদা। দিপুদা ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, ব্যাডমিন্টন সহ কি কি সব খেলায় খুব পারদর্শী। দেখতে ভীষণ হ্যান্ডসাম। সাধারণ জ্ঞানে সুপটু। দিপুদা ওর এক মাসির বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করে। আমাদের পাড়াতেই ওর মাসির বাড়ি। আমার দাদাদের সাথে প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসে। আমাদের বাড়িতে তার এন্ট্রি পাওয়ার কথা নয়। আমাদের রায় চৌধুরী বাড়ি, অভিজাত বংশ, সুসজ্জিত এবং  রক্ষণশীল নিপাট ভদ্র মানুষজন আর ওদিকে অনেক ভাইবোনের মধ্যে একজন সুদিপ্ত দাস দিপু যে মাসির বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করে। কেবল তার মেধা, জ্ঞান-বুদ্ধি, এবং সজ্জনতার কথা জেনে মা তাকে নিজের পুত্রদের সাথে অবাধ মেলামেশার সুযোগ দিয়েছিল। দাদারা লেখাপড়া খেলাধুলা নিয়ে জম্পেশ আড্ডা দেয়। সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতা করে। মায়ের নির্দেশে সবার জন্য চমৎকার সব জলখাবারের আয়োজন হয়। মা কোন কোনদিন দিপুদাকে রাতে খেয়ে যেতে বলে। তখন সবাই মিলে হয় ক্যারম প্রতিযোগিতা। আমি সবার থেকে বেশ ছোট আমায় কেউ পাত্তাই দেয়না। তাই বলে সবাই কি পাত্তা দেয়না! না, একজন খুব

বেশী পাত্তা দেয়! সে হচ্ছে স্নেহশীল দিপুদা।

দাদাদের সব প্রশ্নের উত্তর সেরে, আড্ডা শেষে দিপুদা আমায় ডাকত-‘বন্যা আয় তোকে অংক শিখিয়ে দেই’। এই বলে আমার পড়ার টেবিলে এসে আমায় মজার মজার অংক শেখাত। ক্লাশের তেলদেয়া বাঁশ, জলভরা ফুটো চৌবাচ্চা, ঐকিক, সুদকষা অংকের চেয়ে সেগুলি হত দারুণ মজার! আমার দুর্দান্ত লাগত! নানাধরনের পৃথিবী বিখ্যাত মানুষের গল্প, বিজ্ঞানের মজার কথা, আরো নানা মজার মজার গল্প, কাহিনী আমি চোখ বড় বড় করে সব শুনতাম। দিপুদাই প্রথম মোটা ভল্যুমের ‘গল্প আমার অল্প নয়’‘ক্ষীরের পুতুল’ নামক যাদুর বই আমার হাতে তুলে দেয়।এরপরে আরো বহু বই আমি পেয়েছি দিপুদার কাছ থেকে। কেবল বই নয়, আরো বহু কিছু আমি পেয়েছি এই উদার স্নেহশীল মানুষটির কাছ থেকে। ধীরে ধীরে একা একটি বালিকার বেড়ে উঠার সময়ের এক সাবলীল খোলা জানালা হয়ে উঠল দিপুদা। সে জানালা দিয়ে যেমন সুনীল আকাশ সহ প্রকৃতি দেখা যায় তেমনি সহস্র কৌতূহলী মনের হাজাররকম প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যায়। না এই প্রশ্নোত্তরের মধ্যে অন্যকিছু ভাবার কোন অবকাশ ছিল না। অন্তত আমার তরফ থেকে ছিলই না। সন্ধ্যাতারাই যে শুকতারা, কালপুরুষ দেখতে কেমন, গ্রহ, নক্ষত্রের কি চমৎকার সব নাম-  স্বাতী, চিত্রা, বিপাশা, অনুরাধা, শ্রবণা, শতভিষা ও রেবতী, এগুলো আমি তখনই শিখি…

দেয়ালের ক্যালেন্ডারের সাথে সাথে আমার টেবিলের বইপত্রও বদলাতে থাকে। শিক্ষার স্তর পার করে করে আমি চলে যাই ইউনিভার্সিটির বিশাল প্রাঙ্গণে। প্রথম দিকে আমাদের সিট পেতে সমস্যা হয়। সবাইকে কমনরুমে থাকতে হয়। সেখানেও জায়গা না হলে আমাদেরকে একটি রুম দেয়া হয় যেখানে ৮জন থাকতাম। পরে অবশ্য ৪ জন করে এক একটি রুমে ছিলাম। দেবযানী ছিল আমার পাশের বেডে। ও আমায় ভীষণ ভালবাসত। ভালবাসত বলেই আমাদের কাজগুলো ওই বেশীরভাগ করত। দেবযানী সহ বাকি দুজনেরও ভালোবাসার ‘মানুষ’ ছিল। আমাদের কয়েকজন গেটম্যান ভাই ছিল। তারা কেউ একজন স্লিপ নিয়ে এসে ডাক দিলেই আমি হাসতে হাসতে বলতাম “এই তোর শ্যামের বাঁশি বাজছে যা”…

চলবে……

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here