বে-রোজদার
আমিনুল ইসলাম সেলিম
ব্যবসাপাতি ভালো নেই একদম। আলসেমি করে করে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে লালবাতি জ্বালিয়ে ফেলেছে। পুঁজি পর্যন্ত গায়েব। ফলে হাতখরচ থেকে শুরু করে পেটখরচ পর্যন্ত বউকেই চালাতে হয়। বউ প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ভালো। মায়াবী। একটু মেজাজী। নাম? নূরেসা। কী করে যে সবুজ মিয়া লাইনে ফেলে মেয়েটিকে বিয়ে করে ফেললো, বন্ধুবান্ধব ও এলাকাবাসীর কাছে এ এক মস্ত রহস্যই। তবে সবুজ শিক্ষিত ছেলে। দেখতে ভালো আর দারুণ গুছিয়ে কথা বলে। সত্যবাদী এবং যথেষ্ট বুদ্ধিমান। সুতরাং নূরেসার কোনো দুঃখ নেই। ভালোবাসাবাসিতে দুজনের ভালোই চলে যায় দিনকাল। যেনো একজোড়া সুখী কবুতর।
ঈদের পরেই ঢাকায় চলে যাবে সবুজ। মামার কনস্ট্রাকশন ফার্ম আছে উত্তরায়। সেখানেই অফিসের কাজে সহযোগিতা করবে। পরিশ্রম কম। টাকাও খুব বেশি না। তবে যে পরিমাণ পাওয়া যাবে, তাতে নিজের খরচ চালিয়ে বউকে মাসে একটা ভালো মানের শাড়ি কিনে দিতে কষ্ট হবে না সবুজের।
আগামীকাল থেকে রোজা শুরু। বউয়ের কড়া হুকুম, রোজা ছাড়া যাবে না। সেজন্যই ঈদ পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে হবে। সবুজ জবাই করতে নেয়া মুরগীর মতো কুঁকড়ে যায় ভেতরে ভেতরে। অথচ অধীনস্ত কেরানির মতোই দ্রুত হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ে। বউ নিশ্চিন্ত হলে সে বাজারে যায়। একটা চুক্তি করা দরকার মমিনের সাথে। মমিন প্রায় সমবয়সী। বন্ধুর মতো। ছোটোখাটো অনেক বিপদ-আপদই সে সামলে দিয়েছে। এবারও সে-ই ভরসা।
রোজার এক মাস পেরিয়ে গেলে ঈদশেষে সবুজ ঢাকায় চলে যায়। বউ অত্যন্ত আবেগমাখা ভাষায় স্বামীকে বিদায় জানায়। বিষাদ এবং আনন্দ একসাথে মিলেমিশে কেমন অন্যরকম অনুভূতি জাগায় নূরেসার মনে। নূরেসা প্রথম রাতের স্পর্শের মতো শিহরণ টের পায়। সারাজীবনে ৩টির বেশি রোজা না রাখা সবুজকে পুরো মাস রোজা রাখাতে পেরে তার গর্ব হয়। বিয়ের পর এটাই প্রথম ঈদ। দুজনের ভালোবাসা ঈদটাকে কী রঙিন করে তুলেছে!
পরের দিন মমিন এসে যে কথা শোনালো, তাতে চোখ ভরে প্লাবনের মতো জল এসে গেলো নূরেসার। সে বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু অবিশ্বাস করারও উপায় থাকে না। কেনোনা, মমিনকে সে ভালোভাবেই জানে। তবু বারবার জেরা করে সে- আপনি কেনো আমাকে একটিবারও জানাতে পারলেন না, কেনো, বলেন তো? মমিন শুধু দুঃখ প্রকাশ করে বলে যে, তার কিছুই করার ছিলো না, কারণ সে নূরেসার নামে কসম করে নিষেধ করেছিলো।
লম্বা করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নূরেসা। পার্স থেকে বের করে মমিনের হোটেলে দুপুরে এক মাস খাওয়ার বিল পরিশোধ করে সবুজকে ফোন করে। সবুজ ফোন ধরে অনেক্ষণ কোনো কথা বলে না।
কিন্তু বউয়ের অনবরত জেরার মুখে গণপিটুনি খাওয়া চোরের মতো গলা টেনে টেনে সে আর্তি জানায়, ‘আমি পারি না বউ! কী করতাম বল! তোমারে দুপুরে রান্না করতে বলতে পারতাম? রোজার দিনে তোমারে কষ্ট দিতাম? পারতাম না তো! তোমারে ভালোবাসি না আমি! নূরেসা আচমকা ফোন কেটে দিয়ে ক্লান্ত বেড়ালের মতো পা ফেলে ফেলে বাড়িতে এসে ওঠে। তার চোখ ভেজে। কার জন্য? নিজের, না সবুজের? বুঝতে পারে না সে।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here