ঈদের আনন্দের কথা ভুলে গেছে মানুষ


শিপুফরাজী, চরফ্যাশন প্রতিনিধি :: চরফ্যাশনের মূল ভূ-খন্ড, শহর আর গ্রামে এখন ঈদের আনন্দ বইতে শুরু করলেও দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচরের চিত্র যেন ভিন্ন। এখানে কখন নদী ভাঙে, আর কখন তল্পিতল্পা গোটাতে হয় এই চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচরের মানুষের। বিপন্ন মানুষের যেন ঈদের আনন্দ নেই। প্রতিদিনের মত পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয়ার যুদ্ধ তাদের। অনেকে সন্তানদের কিনে দিতে পারেনি নতুন জামা-কাপড়।

ঈদের দিনও হয়তো তাদের ভালো খাবারের পরিবর্তে খেতে হবে ডাল-ভাত। জীবন আগে বাঁচাতে হবে সেই লড়াইয়ে ব্যস্ত সবাই। মনে নেই আনন্দ, এমন অবস্থায় তাদের ঈদের খুশী আসে কিভাবে। সারা দেশে ঈদের আমেজ লাগলেও নদী ভাঙন কবলিত দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচরের ১৭ হাজার পরিবারে নেই ঈদের আনন্দ। গত ২বছরের নদীর অব্যাহত ভাঙনে বসত-ভিটে হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্থরা এখন নিজেদের একটু মাথা গোজবার ঠাই খুঁজতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এদের অধিকাংশের ভাগ্যে এখনো জোটেনি ঈদের নতুন পোশাক।

তবে জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ভাঙন কবলিত মানুষের মাঝে ঈদের আগেই সহযোগিতার হাত বাড়ানো হবে। ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের দুঃখের কাহিনী। জসিম উদ্দিন মাঝি । পেশায় জেলে । স্ত্রী নাজমা এবং দু’ সন্তানসহ হাজিপুর গ্রামের সাইফুল হাজির বাড়ির আঙ্গীনায় ঝুপড়ি করে আশ্রয় নিয়েছে। ক’দিন আগেই তার ঘরটি মেঘনায় বিলীন হয়ে যায় । জসিম উদ্দিন মাঝি আবেগ জড়িত কন্ঠে বলেন, বসত ভিটা মেঘনায় প্যাটে, আংগো আবার কিসের ঈদ আনন্দ? প্যাটে খাওন না থাইক্যাও যদি বাড়ি ঘর থাকতো তাও ভাল ঠেকতো। এহন বাড়ি ঘর সব নদীতে আমারা আছি মাইনসের বাইত্তে।

এছাড়া স্কুল শিক্ষার্থী শিফাত, ফাহিমা ও জিলহজদের মতো প্রায় অর্ধশত শিশুর ভাগ্যেও এবার জোটেনি ঈদের নতুন পোশাক। তারাও তাদের পরিবারের অন্য সদস্যের সাথে ঘরবাড়ি সারাতে ব্যস্ত ঈদ তাদের মনেও নাড়া দিচ্ছে না। মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন এ প্রচীন দ্বীপটির শত শত মানুষ ঘরভিটা হারিয়ে এখন নিঃস্ব। তাদের মাথা গোজার ঠাঁই নেই। বহু পরিবার এখনও নদীর উপকূলে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। উপার্জনের জন্য সহায়-সম্বল হারিয়ে সেখানকার মানুষ এখন দিশেহারা। তাদের কষ্ট কেউ দেখছে না। সরেজমিন জানা যায়, গত দেড়মাস ধরে নদী ভাঙনের কবলে বসতবাড়ি হারিয়েছে অন্তত ৮/৯ শত পরিবারের

বসত-বাড়ি। সাথে নদীতে চলে গেছে স্কুল, মাদরাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও বিস্তর ফসলি জমি। বর্তমানে নিজেদের বাড়িঘর সরাতেই এখন ব্যস্ত এই এলাকার মানুষ আবার অনেকেই আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি সহ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। তাই আসন্ন ঈদুল আজার আনন্দ তাদের মনে আর কোন দাগ কাটছে না।

ঈদের দিনের কথা বলতেই এভাবে ক্ষোভ আর দু:খের কথা জানালেন গৃহবধু সেলিনা (৩৫)। ‘১২ গন্ডা জমি ছিলো, পুকুর ছিলো, হাস-মুরগী আর গরু-ছাপগল ছিলো। এখন আর কিছুই নেই। নদীতে ৬ ভাঙ্গা দিয়েছে, সব হারিয়ে এখন নি:স্ব। আমাদের আবার ঈদ আনন্দ কিসের? নদী তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এখন কোথায় আশ্রয় সেই চিন্তায় আছি। সেলিনা (৩৫) জানান, সরকারের দপ্তর থেকে ঈদ উপলক্ষে ঈদ বস্ত্র বিতরন হলেও আমরা পাইনী, এই যে ঈদ আসছে, চারদিকে হাসি আনন্দ আর উৎসব, কিন্তু আমাদের দু:খ কষ্টের কথা কেউ শোনেনা। সবকিছু মিলিয়ে এবার দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচরের মানুষের ঈদের আনন্দ নেই বললেই চলে।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মাদক মামলায় যুবকের যাবজ্জীবন

ডেস্ক রিপোর্ট ::ঠাকুরগাঁওয়ে মাদক মামলায় রফিকুল ইসলাম (৩০) নামে এক যুবকের যাবজ্জীবন ...