হীরেন পণ্ডিত

হীরেন পণ্ডিত :: বিশ্ব সভ্যতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। এই বিপ্লবের প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্যতা নিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে আমাদের দেশেও। এই আলোচনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি বাংলাদেশকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নেতৃত্ব দানের উপযোগী করে গড়ে তুলে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা নিরলস কাজ করছেন। আমরা জানি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হচ্ছে ফিউশন অব ফিজিক্যাল, ডিজিটাল এবং বায়োলজিকাল স্ফেয়ার। এখানে ফিজিক্যাল হচ্ছে হিউমেন, বায়োলজিকাল হচ্ছে প্রকৃতি এবং ডিজিটাল হচ্ছে টেকনোলজি।

এই তিনটিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে কী হচ্ছে? সমাজে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে? এর ফলে ইন্টেলেকচুয়ালাইজেশন হচ্ছে, হিউমেন মেশিন ইন্টারফেস হচ্ছে এবং রিয়েলটি এবং ভার্চুয়ালিটি এক হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি আমরা আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে হলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সি, ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সি, সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্সি, কনটেস্ট ইন্টেলিজেন্সির মতো বিষয়গুলো তাদের মাথায় প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে।

২০০৮ সাল থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির ঢেউ আমাদের দেশকেও স্পর্শ করেছে। এক যুগ আগে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের রূপকল্পকে বাস্তবে রূপায়িত করতে গৃহীত উদ্যোগের সুফল পাচ্ছেন প্রায়  সব মানুষ। নাগরিক সেবার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের নিত্যদিনের কাজগুলো হয়েছে আরো সহজ, জীবনকে দিয়েছে গতিময়তা। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষির অবদান শুধু জিডিপি বা গাণিতিক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষিই  শেকড়।  বেশিরভাগ মানুষের জীবন-জীবিকার এই সেক্টরটিকে বাদ রেখে তাই কোনভাবেই ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রয়োজন ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনার। আর সে কারণেই কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিস্তারে আইসিটির বহুমাত্রিক ব্যবহারে মনোযোগী হয়েছেন, উদ্ভাবন করেছেন অনেক লাগসই তথ্য বিস্তারের উপাদান।

কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে একটি শব্দ, তা হলো- ই-কৃষি। ই-কৃষিকে অনেক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এ সবগুলোকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ নির্ভরযোগ্যভাবে কৃষক, কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসায়ী, সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিজ্ঞানী, পরিকল্পনাবিদ, ভোক্তা ইত্যাদি গোষ্ঠীর কাছে দ্রুততার সাথে পৌঁছে দিতে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের (ইন্টারনেট, ইন্ট্রানেট, রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ইত্যাদি) ব্যবহারকেই ই-কৃষি বলা হয়ে থাকে। আসলে, ইলেক্ট্রনিক প্রবাহের মধ্য দিয়ে কৃষি তথ্য সরবরাহের প্রক্রিয়াকেই একবাক্যে ই-কৃষি বলা যায়।

কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ই-কৃষির অবদান স্বীকৃত হয়েছে ইনফরমেশন সোসাইটির বিশ্ব সম্মেলনে। কৃষি উৎপাদনের প্রতিটি স্তরেই ই-কৃষির অবদান রয়েছে। এই অবদানগুলোকে পরিমাণগত যেমন-বর্ধিত আয়, অধিক উৎপাদন ইত্যাদি এবং গুণগত যেমন-সামাজিক প্রভাব, উন্নত যোগাযোগ ইত্যাদি উভয়ভাবেই চিহ্নিত করা যায়। ই-কৃষির ব্যবহার উৎপাদনকারী কৃষক ভাই-বোনদের বিভিন্ন অনুসন্ধান ব্যয় কমিয়ে সঠিক বাজার চিহ্নিত করতে সহায়তা করে, অপচয় কমায় এবং সর্বোপরি পণ্য বিক্রিতে একটি দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।

আমাদের কৃষক ভাই-বোনেরা কৃষি তথ্য প্রাপ্তির জন্য অনেকগুলো মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে থাকেন। এক গবেষণায় দেখা যায়, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন, কৃষি উপকরণ ব্যবসায়ীসহ কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করা ছাড়াও পত্রিকার ওপর নির্ভর করে থাকেন। রেডিও ও কমিউনিটি রেডিওর ওপর নির্ভরতার এই হার মোবাইল ফোনে এবং টেলিভিশনের চেয়েও বেশি। সুতরাং এটি স্পষ্ট, তথ্যপ্রযুক্তির এই হাতিয়ারগুলোর ওপর আমাদের কৃষক ভাই-বোনেরা যথেষ্ট পরিমাণে নির্ভরশীল। সেজন্য প্রয়োজন কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক কৃষি বিষয়ক তথ্য বা কনটেন্টগুলোকে সহজ সাবলীল ভাষায় প্রচার করা।

আইসিটি উপকরণ ব্যবহারের সাথে বেড়ে চলেছে আইসিটির অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। সরকারের সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও পদক্ষেপের কারণে প্রসারিত হচ্ছে এ ক্ষেত্রটি। বিগত কয়েক বছরে বিস্ময়করভাবে বেড়েছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। বর্তমানে ১২ কোটির বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার আমাদের প্রথাগত সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনায় মাঠ কর্মীর পক্ষে বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে কার্যকর সেবা পৌঁছে দেয়া অসম্ভব। ফলে কৃষকের চাহিদামাফিক, ফলপ্রসূ তথ্য সেবা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ই-কৃষি সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর মাধ্যম। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ফলে কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই ই-কৃষির বিস্তারে বেশ কিছু সফলতা অর্জন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থাগুলোর মধ্যে কৃষি তথ্য সার্ভিস ই-কৃষির বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে।

পাশাপাশি আইসিটির বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি, যেমন—অনলাইন সেবা প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল মিটিং বা ট্রেনিং প্ল্যাটফর্ম জুম, মাইক্রোসফট মিটিং, গুগল মিট ইত্যাদি, মোবাইল অ্যাপস, সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, অগমেনটেড রিয়ালিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ডাটা এনালিটিকস, সিমুলেশন গেমস, রোবটিকস, ড্রোন, আইওটি ইত্যাদি ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী কৃষিক্ষেত্রে সাফল্যের অনেক উদাহরণ আছে এবং ভবিষ্যতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।

আইসিটির আধুনিক প্রযুক্তিগুলো কিভাবে কৃষিতে অবদান রাখছে সে বিষয়ে একটু নজর দেওয়া যাক। একজন কৃষক ঘুম থেকে উঠে তার স্মার্টফোন বা ট্যাব খুলে দেখল তার ফসলের জমিতে আর্দ্রতা কমে গেছে; সেচ দেওয়া প্রয়োজন বা তার জমিতে পোকা-মাকড় আক্রমণ করেছে; ওষুধ ছিটাতে হবে অথবা শস্যের পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে; সার দিতে হবে। এই তথ্যটি সে পেল তার ক্ষেতে স্থাপিত আইওটি ডিভাইস বা সেন্সরের মাধ্যমে। মৎস্য এবং প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রযোজ্য; একটি গরুর খামারের সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং তদনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজটিও আইওটি, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, অগমেনটেড রিয়ালিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই করা যায়।

এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করাকে প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার বলে। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, অস্ট্রেলিয়ায় এসব প্রযুক্তি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। আইওটি ডিভাইস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রোবট বা ড্রোনের মাধ্যমে সেচ, সার বা ওষুধ ছিটানোর কাজটি দূর হতে সমাধা করা যাচ্ছে। তদ্রূপ স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইত্যাদি প্রযুক্তির মাধ্যমে আগাম ফলন বা উৎপাদনের তথ্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। আর কৃষির উন্নয়ন বহুলাংশে নির্ভর করে তথ্য ও প্রযুক্তির সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়ন, পরিবর্তনশীল কৃষি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ব এখন তথ্য প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

কৃষি বিষয়ক যেকোনও পরামর্শ সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে কৃষি বাতায়ন ও কৃষক বন্ধু’ ই-কৃষি সেবার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৩৩৩১-এ ফোন করে কৃষকরা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল পদ্ধতি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই । সেজন্য কৃষি বাতায়ন করা হয়েছে। কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য যেন কৃষকরা সংগ্রহ করতে পারেন, সেজন্য কৃষকবন্ধু ফোনসেবা কর্মসূচি করা হয়েছে। কৃষকরা বিভিন্নভাবে উপকৃত হবেন। ডিজিটাল পদ্ধতি দিয়ে যেন কৃষকরা সুযোগ-সবিধা পান এবং উৎপাদন বাড়াতে কী করণীয় জানতে পারেন, সেজন্যই এ ব্যবস্থা।’

তিনি আরও বলেন, ‘৩৩৩১ নম্বরে যে প্রশ্নগুলো আসবে সেগুলো সংগ্রহ করতে হবে। কিছু প্রশ্ন বারবার আসবে। সেগুলো রেকর্ড করে রাখলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কৃষক উত্তর পেয়ে যাবেন। সেটা প্রবর্তন করার জন্য আমাদের আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টার পরামর্শ  নিতে হবে। এটা কঠিন কাজ হবে না। তাতে সময় বাঁচবে। আমাদের কর্মকর্তাদেরও কাজ করা সহজ হবে।’

ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে কৃষকরা যেন তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে। এখান থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাজার দর জানা যাবে। কেউ কৃষকদের ঠকাতে পারবে না, ফোনে তারা মূল্য জেনে নিতে পারবেন। শুধু কৃষিসেবা নয়, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতেও এই পদ্ধতি উপযোগী। কৃষিশিক্ষা নিয়ে কৃষি কাজে যাওয়া যাবে না, এই মনোভাব থাকা উচিত না।’ তিনি বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়া, ক্ষুধার্ত মুখে খাদ্য জোগানোর চেয়ে বড় কাজ কিছু হতে পারে না। সেজন্য আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করছি।’ সবাই মিলে জাতির জনকের স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

 

 

লেখক: রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি। 

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here