ইমনের ১০ হাজার টাকার অভাব !

ফারজানা খান নাদিরা :: কারো রয়েছে কোটি টাকার অভাব, কারো মাত্র ৩ মাসের বাসা ভাড়ার ১০ হাজার টাকার অভাব।

আমারাই বলি শিশু শ্রম বন্ধ করুন। সকল শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করুণ। আজ বলব- শিশু ইমনের অভাবের গল্প।

১৭ অক্টোবর ২০১৯ রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭.৩০ মি. গুলিস্থান মোড়ে কর্মঠ শিশু ইমনের সাথে দেখা হল। বাসায় আসার জন্য রিক্সার জন্য হাটতে ছিলাম। দুটো রিক্সা পাশাপাশি,ইমন রিক্সায় বসা। আমি ওকে আর বলিনি যে যাবে কি না? না বলাটাই স্বাভাবিক। ওর যে বয়স।
পাশের জনকে বললাম মামা, যাবেন??……রোডে।
মামা- না, আপা।
ও পাশ থকে বলে উঠল, আমি যাব।
কি বলে, তুমি!
হ,,,
আমি বললাম-আচ্ছা।
তা কত চাও?
ইমন বলল- ৬০ টাকা দিবেন।
আমি ইচ্ছা করেই ওকে বললাম ভাড়াতো ৪০ টাকা।যাবে তুমি।
ও বলল, ৫০ টাকা দিয়েন।
আমি বললাম ঠিক আছে, তোমাকে ৫০ টাকাই দিব। তবে ঠিক দেখে বুঝে চালিও।ডানে-বামে ও তোমার দিকে খেয়াল করে নিও, কেমন।
ও বলল ওঠেন আপা।

যথারীতি উঠে পড়লাম, একটু ভয় ভয় ও কাজ করছিল, কোথায় না লাগিয়ে দিয়ে এক্সিডেন্ট করে। যাইহোক আমি রীতিমত বিস্মিত, যে কত ভাল করে সে রিক্সাটা চালিয়ে আমাকে আমার গন্তব্য পৌছে দিল।

কিন্তু এমনটা হল শিশু ইমনের জন্য। মায়ের সংসারে ও সবার ছোট, পেটের দায়ে কাজ করতে নেমেছে বহু দিন আগেই। ওর জন্য পড়ালেখাতো দূর্লভ কিছু । কপালে জুটল না ওর বাবা বলাও। বাবা অন্যত্র একজনকে বিয়ে করে ফেলে চলে গেছেন। সেই থেকেই ইমনের মা নানান কাজ করে কষ্টের আয়ে সংসারের বোঝা বয়ে বেড়াতে না পেরে বাড়ি বাড়া বকেয়া করে।

৪ ভাই বোনের মধ্যে ইমনই ছোট(১০ বছর)। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে, ওর ভাষ্যানুযায়ী বড় ভাই ঘোরে ফেরে খায়, আর ঘরে ছোট বোনটা মাদ্রাসায় কোরাআন পড়ে। কারও পড়ালেখা করার ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও অভাব কেঁড়ে নিল সব। এখন বাসা ভাড়া দিতে পারছে না মা। ৩ মাসের বাসা ভাড়া ১০ হাজার টাকা বাকী পরার কারণে নরম হাতে রিক্সার হেন্ডেল ধরতে হল শিশু ইমনের।

ঢাকার কঠিন রাস্তায় তিন চাকার রিক্সার প্যাডেলে যোর পাচ্ছিল না। কিন্ত সবার সাথে তাল মিলিয়ে তাকে এই কঠিন কাজটি করতে হয়। যতক্ষন ওর রিক্সায় ছিলাম, মনে হচ্ছিল ওকে বসিয়ে আমিই চালাই। গত ৫ দিন ধরে গড়ে প্রতিদিন ৫০০ টাকা আয় করে মায়ের হাতে তুলে দেয়। ১০০০০ টাকা আয় করতে যে ওর অনেক দিন লেগে যাবে।

ইমনের বাসা রামপুরা মাইটিভি ভবনের পাশেই। ঢাকার শহরের অলিতে গলিতে হয়ত এমন হাজারও ইমন রয়েছে। কিন্ত চালক ইমনের রিক্সায় উঠে আমার খারাপ লাগার শেষ ছিল না। আসার সময় ওকে যারাই দেখছে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল আর কি কি বলতেও ছিল, একজন বলল- ইস এই বয়সে !! আমার যা করার ছিল ওর জন্য তা হয়ত করেছি। তা না হয় নাইবা লিখলাম।

সুখ-শান্তি, অভাব-অনটন নিয়েই এই সমাজের মানুষের জীবনের দিন থেকে কাল কেটে যায়।

 

 

 

 

লেখক: প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভুমিকা প্রকল্প, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা। nadira.uisc@gmail.com

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তাহমিনা কোরাইশী’র কবিতা ‘সম্পর্ক’

সম্পর্ক -তাহমিনা কোরাইশী একটি বীজ নিজ তাগিদেই মাটি ফুরে অবাক দৃষ্টিতে আঁখি ...